kalerkantho


সরেজমিন তেঁতুলিয়া

‘এরঙ ঠাণ্ডা মোর জীবনত দেখু নাই বা’

মো. লুৎফর রহমান, পঞ্চগড়   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘এরঙ ঠাণ্ডা মোর জীবনত দেখু নাই বা’

‘এরঙ ঠাণ্ডা মোর জীবনত দেখু নাই বা। হাত-পা কোঁকড়া লাগে অচ্চে।’ কথাগুলো পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার ভজনপুর এলাকার জুমার উদ্দিনের (৭০)। কয়েক দিনের টানা উত্তুরে হিমেল বাতাসে কাবু হয়ে পড়া বৃদ্ধ গতকাল সোমবার এভাবেই ব্যক্ত করেন তাঁর অনুভূতি।

রাস্তার পাশে আগুনের কুণ্ডলী ঘিরে কয়েকজনের জটলা। তাদের একজন ভ্যানচালক রফিকুল ইসলাম বললেন, ‘ঠাণ্ডাতে ভ্যান লিয়ে হানে বাহিরত

 যাবা পারু না। ঘরেতে রহিবা লাগেছে। হামরা দিন আনে দিন খাই। এলা বাহিরত যাবা পারু না, কামাইও বন্ধ।’ ট্রাকচালক বিল্লাল হোসেন জানান, ঘন কুয়াশার কারণে সড়ক-মহাসড়কে দিনের বেলায়ও গাড়ি চালাতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছা সম্ভব হচ্ছে না।

তেঁতুলিয়ায় গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। গত ৫০ বছরেও এত কম তাপমাত্রা দেখেনি এই জনপদের মানুষ। শৈত্যপ্রবাহ স্থবির করে দিয়েছে এখানকার জনজীবন। অথচ এই জনপদের বেশির ভাগ মানুষ নদী থেকে পাথর উত্তোলন, পাথর ভাঙাসহ বিভিন্ন মজুরির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। পৌষের এই তীব্র শীতে তারা হয়ে পড়েছে ঘরবন্দি। কাজে যেতে পারছে না। বন্ধ হয়ে পড়েছে আয়ের পথ। শীত নিবারণের প্রয়োজনীয় বস্ত্রের অভাবে খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে শীতার্ত এসব মানুষ। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কোনো ত্রাণ পৌঁছেনি ওদের কাছে। এ অবস্থায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে শ্রমজীবী মানুষের।

তেঁতুলিয়ার পাথর শ্রমিক মনতাজ আলী এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় শীতে ঠকঠক করে কাঁপছিলেন। বললেন, ‘গত কয়েক দিনের ঠাণ্ডাতে কাজে যেতে পরছি না। একদিকে শীতের কাপড় নাই, অন্যদিকে আয়-রোজগার নাই। কঠিন সমস্যায় আছি আমরা।’

এদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ক্রমাগত বাড়ছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালগুলোতে ভিড় জমাচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল বারি জানান, শীতজনিত রোগে আক্রান্তদের বেশির ভাগই শিশু ও বৃদ্ধ। তবে শীতের কারণে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও তা সামাল দিতে খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। আক্রান্তদের বেশির ভাগই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।

তীব্র শীতের কারণে উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে এসেছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো যথারীতি খোলা রয়েছে। ক্লাসও হচ্ছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পারভীন আক্তার জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শীতের প্রভাব তেমনভাবে পড়েনি। শিক্ষার্থীরা শীত উপেক্ষা করেই বিদ্যালয়ে আসছে।

শৈত্যপ্রবাহের পাশাপাশি ঘন কুয়াশার কারণে দিনের বেলায়ও যানবাহনগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। রাত ৮টার পরই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে গ্রামের পথঘাট ও হাটবাজার। রাতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতো ঝরছে কুয়াশা। কুয়াশার কারণে শনি ও রবিবার তেঁতুলিয়ায় সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। গতকাল সকাল ৯টার পর সূর্যের দেখা মেলে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রাও কিছুটা বাড়তে থাকে। দুপুর ১২টায় তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আবার বিকেলের দিকে কমতে থাকে তাপমাত্রা। বাড়তে থাকে ঠাণ্ডার প্রকোপ।

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের আবহাওয়া সহকারী রহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আজ (সোমবার) সকালে তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। যদিও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। বিকেল ৩টায় এখানে তাপমাত্রা ছিল ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।’

তেঁতুলিয়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এরই মধ্যে দরিদ্র ও শ্রমজীবী শীতার্তদের মাঝে আড়াই হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। বেসরকারিভাবে ও ব্যক্তি উদ্যোগে আরো প্রায় চার হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই সামান্য।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শাহীন জানান, তেঁতুলিয়া হিমালয়ের খুব কাছের জনপদ। সে কারণে প্রতিবছরই এখানে শীতের তীব্রতা একটু বেশি থাকে। এখানকার মানুষ এমন পরিবেশে অভ্যস্ত। তবে এবার তাপমাত্রা অতিরিক্ত কমে যাওয়ায় বিশেষত শ্রমজীবী মানুষ কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। কারণ তারা কাজে যেতে পারছে না। আবার শীতবস্ত্রও নেই। এ অবস্থায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দ্রুত এখানে শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা করা দরকার।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানিউল ফেরদৌস বলেন, ‘আমরা সরকারিভাবে যেসব শীতবস্ত্র পেয়েছি তা দরিদ্র শীতার্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আরো শীতবস্ত্রের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। আশা করি, দু-এক দিনের মধ্যেই তা পেয়ে যাব।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামছুল হক জানান, শীতের এই তীব্রতায় বোরো ফসলের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে তেঁতুলিয়ার বেশির ভাগ বীজতলা পলিথিনের মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকায় শীতের কোনো প্রভাব তাতে পড়বে না।

এদিকে শৈত্যপ্রবাহ ও ভারতের দার্জিলিং শহরে তুষারপাত হওয়ায় বাংলাবান্ধা হয়ে ভারতগামী পর্যটকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে বলে জানিয়েছে বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন পুলিশ।

 



মন্তব্য