kalerkantho


পুলিশ সপ্তাহ উদ্বোধন, দরবারে দাবি শুনলেন প্রধানমন্ত্রী

পুলিশের চিকিৎসায় মেডিক্যাল কোর গঠনের পরামর্শ

সরোয়ার আলম   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পুলিশের চিকিৎসায় মেডিক্যাল কোর গঠনের পরামর্শ

পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধন করে গতকাল সোমবার দ্বিতীয়বারের মতো মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বিশেষ দরবার করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পুলিশের কনস্টেবল থেকে শুরু করে পুলিশ সুপারদেরও দাবিদাওয়া শুনেছেন তিনি। পুলিশের চিকিৎসাসেবা আরো উন্নত করতে অন্য বাহিনীর মতো মেডিক্যাল কোর গঠনের পরামর্শ দিয়ে অন্য দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে পূরণ করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এ নিয়ে টানা ১০ বার পুলিশ সপ্তাহ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি পুলিশ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা পরিবর্তনের জন্য তাদের সেবক হওয়ার আহ্বান জানান।

এবারের পুলিশ সপ্তাহে ১৮২ জন পুলিশ সদস্যকে পদক দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো কোনো পুলিশ সুপার তাঁদের পাঠানো তালিকা থেকে পদকের জন্য নাম বাছাই না করার অভিযোগ করেছেন কালের কণ্ঠ’র কাছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, পুলিশ সপ্তাহ উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ অডিটরিয়ামে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বিশেষ দরবার করেন। দরবারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), অতিরিক্ত আইজিপি, সব কটি মহানগরের পুলিশ কমিশনার, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর ও কনস্টেবলরা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে মঞ্চে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রসচিব ও আইজিপি।

দরবারের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে আইজিপি বলেন, ‘আমার চাকরির মেয়াদ প্রায় শেষ  পর্যায়ে। আপনার (প্রধানমন্ত্রী) জন্যই আমি পুলিশ কমিশনার ও আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছি। আমি চেষ্টা করেছি ভালো কিছু করার। পুলিশ আজ বিশ্বে প্রশংসিত।’

এরপর পুলিশ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বেশ কিছু দাবি তুলে ধরেন। ডিএমপির কনস্টেবল নাসরিন আফরোজ বলেন, দুষ্কৃতকারীদের হাতে নিহত পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি স্বাভাবিক মৃত্যুর পর রেশন নিয়ে নানা জটিলতা দেখা দেয়। জটিলতা নিরসনের পাশাপাশি নিহতদের পরিবার যাতে আজীবন রেশন পায় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে আর্থিক কিছু বিষয় আছে। মৃত্যুর পর যাতে রেশন পাওয়া যায় সে জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরামর্শ দেওয়া হবে। বিষয়টি বিশেষ বিবেচনা করা হবে।’

শেরপুর জেলার একজন সাব-ইন্সপেক্টর বলেন, মোটরসাইকেল থাকলে পুলিশের কাজের অনেক সুবিধা হয়। তাই সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্টদের জন্য স্বল্প সুদে মোটরসাইকেল কেনার ব্যবস্থা করা দরকার। তা ছাড়া মোটরসাইকেল কিনতে ব্যাংক লোন, দায়িত্ব পালনের সময়কার জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ যাতে সরকার বহন করে সেদিকেও বিশেষ নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এর উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া প্রসঙ্গে ডিএমপির বনানী থানার ওসি বি এম ফরমান আলী বলেন, নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩ সংশোধন করতে হবে। তাতে ভুক্তভোগীদের দুর্দশা লাঘব হবে। জামিনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং কেউ মিথ্যা মামলা বা সাক্ষী দিলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

এই দাবির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই আইনটির সংশোধন করতে হলে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। বিষয়টি আমরা বিবেচনা করব।’

ডিএমপির সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার নাদিয়া ফারজানা বলেন, ‘পুলিশের চিকিৎসাসেবা উন্নত করতে হাসপাতালের পাশাপাশি চিকিৎসক সংকট দূর করতে হবে। আমাদের হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সংকট আছে। তা ছাড়া পিএসসির মাধ্যমে সরাসরি পুলিশ হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক নিয়োগ দিতে পারলে খুবই ভালো হয়।’

এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবার চিকিৎসাসেবা দিতে সরকার নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। পুলিশের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। অন্যান্য বাহিনীর মতো পুলিশও মেডিক্যাল কোর গঠন করতে পারে। এটি গঠন করলেই চিকিৎসাসেবার মান আরো বৃদ্ধি পাবে। চিকিৎসক সংকট দূর হয়ে যাবে।’

ডিএমপির অ্যাডিশনাল পুলিশ সুপার মোহাম্মদ গোলাম বলেন, বর্তমানে দুই হাজার ৬৭৫টি পদে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোক নিয়োগ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে কেউ জঙ্গিসহ অন্যান্য অপরাধী হতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি এই পদগুলো রাজস্ব খাতে নেওয়ার দাবি জানান।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আউটসোর্সিং একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয়। পুলিশ ভেরিফিকেশন করে। আপনারা ভালো করে ভেরিফিকেশন করলেই আশঙ্কা দূর হয়ে যাবে।’

পুলিশ সদস্যদের দাবি শোনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাঘের এক ঘা আর পুলিশের ১০ ঘা—এই প্রচলিত ধারণা পরিবর্তন করতে হবে। জনগণের কাছে যেতে হবে সবাইকে। তবে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন করতে হবে। পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে জনগণের বান্ধব হতে হবে। জনগণের দুঃখ বুঝতে হবে। এমন কিছু করা যাবে না যাতে পুলিশের বদনাম হয়। সবাইকে এদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’

পুলিশের পদক নিয়ে প্রশ্ন : ২০১৭ সালে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এবার পুলিশের ১৮২ জন সদস্যকে বাংলাদেশ পুলিশ পদক-বিপিএম, বিপিএম-সেবা, রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক-পিপিএম ও পিপিএম-সেবা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ জন বিপিএম, ৭১ জন পিপিএম, ২৮ জন বিপিএম-সেবা এবং ৫৩ জন পিপিএম-সেবা পদক পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মরণোত্তর বিপিএম পদক পেয়েছেন সিলেটে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত র্যাবের গোয়েন্দা প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ, পুলিশ পরিদর্শক চৌধুরী মো. আবু কয়ছর ও পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম।

তবে চারজন পুলিশ সুপার কালের কণ্ঠ’র কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, গত এক বছরে একাধিক জঙ্গিবিরোধী অভিযানে তাঁদের জেলায় মাঠপর্যায়ের অনেক পুলিশ সদস্য ভালো কাজ করেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়েছেন। অথচ তাঁদের কোনো পদক দেওয়া হয়নি। তালিকা পাঠানোর পর তাঁদের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ওই পুলিশ সুপাররা। তা ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রামসহ তিনটি মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তাও এমন অভিযোগ করেছেন।

পুলিশ সপ্তাহের আজকের কর্মসূচি : পুলিশ সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনে আজ সকাল পৌনে ১০টায় আইসিসি সম্মেলন কেন্দ্রে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। দুপুর আড়াইটায় রাজারবাগে অনুষ্ঠিত হবে পুলিশের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ অডিটরিয়ামে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় একই স্থানে প্রথমবারের মতো ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অর্থ, গণপূর্ত, আইন, পরিকল্পনা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবদের সঙ্গে বৈঠক হবে।

 

 



মন্তব্য