kalerkantho


বাড়বে প্রকৃতির ‘পাগলামি’ প্রস্তুতি চাই এখনই

আরিফুর রহমান   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাড়বে প্রকৃতির ‘পাগলামি’ প্রস্তুতি চাই এখনই

সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ৫০ বছর আগের রেকর্ড ভেঙে গেছে। ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল সোমবার পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় আগের সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন করে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতে কাঁপছে রাজধানী ঢাকাসহ পুরো দেশ। ঢাকায় তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে।

আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণের মধ্য দিয়ে যেখানে বছরের ইতি ঘটেছে; নতুন বছরের প্রথম মাস শুরু হলো প্রকৃতির বিরূপ আচরণের মধ্য দিয়ে। এখন উত্তরাঞ্চলজুড়ে যেভাবে কুয়াশা পড়ছে, তাতে বোরোর বীজতলা, সরিষা, মাষকলাই, আলুসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এভাবে যদি আর এক সপ্তাহ কুয়াশা পড়তে থাকে, তাহলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে, যেটি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুল আজিজও স্বীকার করলেন, ‘কুয়াশা যদি দীর্ঘমেয়াদি থাকে, তাহলে বীজতলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আলুরও ক্ষতি হবে। সরিষারও ক্ষতি হবে।’ তবে অন্যান্য শীতকালীন সবজিতে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে জানান আব্দুল আজিজ। প্রকৃতির আচরণ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনাচরণ, সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসছে।

শীতের তীব্রতা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কমার লক্ষণ দেখছে না আবহাওয়া অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শীতের তীব্রতা আরো এক সপ্তাহজুড়ে থাকবে। তবে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার যে রেকর্ড হয়েছে, তা আর নিচে নামার সম্ভাবনা কম। বরং তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়বে। তবে সেটা ৪ কিংবা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।’ ইউরোপের মতো বাংলাদেশেও তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামার সম্ভাবনা আছে কি না—এমন প্রশ্নে শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনো এমন হয়নি। এবারও তাপমাত্রা মাইনাসে নামার সম্ভাবনা নেই।’

প্রকৃতির এই অদ্ভুত আচরণ দেখা যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষ যেখানে শীতে কাঁপছে, এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানে গত ৮০ বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে গতকাল। দেশটির সিনিয়র আবহাওয়া কর্মকর্তা জ্যাকব ক্রনজি জানিয়েছেন, ‘গত ৮০ বছরের মধ্যে সোমবার দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।’ রোদের

প্রখরতার কারণে ব্যাহত হয়েছে দেশটিতে চলমান টেনিস ম্যাচ ও অ্যাশেজ সিরিজের শেষ ম্যাচের খেলা। প্রকৃতির বিরূপ আচরণের আরেক চিত্র দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়। বোমা সাইক্লোনে বিপর্যস্ত ওই দুই

দেশ। যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র তুষারঝড়ে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ২৫ জন।

গতকাল আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপমহাদেশীয় উচ্চ চাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারা দেশে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং সে কুয়াশা দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছে, গতকাল ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চট্টগ্রামে ছিল ১০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ৪৩টি কেন্দ্রের মধ্যে বেশির ভাগ কেন্দ্রেই তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচেই রয়েছে। নীলফামারীর ডিমলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া রাজারহাটে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বদলগাছিতে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার এমন খামখেয়ালি আচরণ দিন দিন বাড়ছে। আগে লম্বা সময়ের পর বড় বড় দুর্যোগ দেখা দিত। এখন সেটা কমে এসেছে। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশেও বিদায়ী বছরজুড়েই ছিল প্রকৃতির বিরূপ আচরণ। হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় আগাম বন্যা, এরপর পাঁচ জেলায় ভয়াবহ পাহাড়ধস। এরপর দেশের ৩২ জেলায় দীর্ঘস্থায়ী বন্যা। সব শেষ অগ্রহায়ণে অসময়ে বিরল বৃষ্টি। এর পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় মোরা, ভূমিকম্প, রেকর্ড বৃষ্টিপাত, বজ্রপাতের পাশাপাশি হেমন্তে ২৫ বছরের মধ্যে তাপমাত্রা রেকর্ড—এমন দুর্যোগের মধ্য দিয়ে পার হয়েছে ২০১৭ সাল। শুধু গত বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছে ৫৭০ জন। কিন্তু এসব দুর্যোগ মোকাবেলায় কতটুকু প্রস্তুত সরকার এ নিয়ে বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ মহলে ভাবনা রয়েছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাতের মতে, দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের যে ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, তা নেই। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ আরো বাড়তে পারে। তাই এখন থেকেই প্রতিকার নিয়ে ভাবতে হবে। যেমন—বোরো ফসলের সময়কাল কমাতে পারলে কৃষকের কিছুটা উপকার হতে পারে। আইনুন নিশাত বলেন, ‘১৫ এপ্রিলের মধ্যে মাঠ থেকে বোরো ধান কেটে ফেলতে হবে। চৈত্র মাসের ফসল কাটা কিছুতেই যাতে বৈশাখ পর্যন্ত না যায়, সে পদ্ধতি বের করতে হবে। আমন ধানের বেলায় পানি নিষ্কাশন ও বন্যা ব্যবস্থাপনা দুটিই জোরদার করতে হবে। আগে আমাদের ফসল রোপণ ও ওঠানোর একটা সময় ছিল। একটা সিস্টেমের মধ্য দিয়ে ফসল রোপণ ও ওঠানো হতো। এখন আর সেই সিস্টেম কাজে আসছে না। দিন দিন তা ভেঙে যাচ্ছে। ২০০৯ সালে প্রণীত জলবায়ু পরিবর্তন অ্যাকশন প্ল্যানে সব কিছুই বলা আছে। সেগুলোর বাস্তবায়ন করতে হবে।’ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্যের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতার যে প্রভাব সেটা লক্ষ করা যাবে আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান দেখে। বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য উত্পাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি আবহাওয়ানির্ভর। ঘন ঘন ঘটতে যাওয়া দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারকে নতুন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের পরামর্শ দেন তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবদুল আজিজ জানালেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় তাঁরা নতুন নতুন উদ্ভাবনী ধারণা তৈরি করছেন। সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এবার হাওরাঞ্চলে আমরা বিআর ২৯ ধানের জাত দিইনি। আমরা দিয়েছি বিআর ২৮ জাতের ধান; যাতে করে কম সময়ে ফসল উঠে আসে। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলে চাষিদের জন্য শুকনো বীজতলার ব্যবস্থা করেছি আমরা।’

জাতিসংঘের সবুজ জলবায়ু তহবিলের স্বাধীন কারিগরি প্যানেলের সদস্য আহসান উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে যখন কোনো দুর্যোগ ঘটে যায়, তার পরই আমাদের সরকার ও মন্ত্রণালয় নড়েচড়ে বসে। তাদের তত্পরতা শুরু করে। দুর্যোগের আগে কোনো তত্পরতা দেখা যায় না। দেশের কোথায় কোথায় ডিসেম্বর জানুয়ারিতে শীত পড়ে, শৈত্যপ্রবাহ হয়, তা কে না জানে। সবাই জানে। কোন কোন জেলায় শীত বেশি পড়ে, শৈত্যপ্রবাহ তা সবাই জানে। কিন্তু কোনো গরিবদের জন্য কোনো উদ্যোগ নেয় না। মন্ত্রণালয়েরও কোনো উদ্যোগ নেই।’ আহসান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এবারের শীতে যারা মারা গেল, তাদের দায়ভার কে নেবে? আগাম প্রস্তুতি যদি থাকত, তাহলে তাদের প্রাণ দিতে হতো না। আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে গত ৫০ বছরের তথ্য আছে। তারা জানে ডিসেম্বর জানুয়ারিতে তাপমাত্রা কমতে থাকে। এ বছর তাপমাত্রা বেশি কমেছে। শীত বেশি পড়ছে। কিন্তু সরকারের কোনো প্রস্তুতিই ছিল না।’



মন্তব্য