kalerkantho


ডিআইজি মিজানের নারী কেলেঙ্কারিতে বিব্রত পুলিশ

অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ডিআইজি মিজানের নারী কেলেঙ্কারিতে বিব্রত পুলিশ

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (উপমহাপরিদর্শক বা ডিআইজি) মিজানুর রহমানের একাধিক নারী কেলেঙ্কারিতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দ্বিতীয় বিয়ে গোপন করতে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্ত্রী মরিয়ম আক্তার ইকোকে সাজানো মামলায় গ্রেপ্তার করান। সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ইকোকে প্রতারক সাজিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করান এবং প্রভাব খাটিয়ে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। এমনকি চার মাস গোপনে সংসার করেও অস্বীকার করছেন মিজান।

ইকোর অভিযোগ, ডিআইজি মিজান তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে বিয়ে করেন। বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখতে বলা হলেও তিনি ফেসবুকে প্রকাশ করেন। এর পরই তাঁর ওপর নির্যাতন শুরু হয়। ইকো ছাড়াও একাধিক নারীর সঙ্গে ডিআইজি মিজানের অনৈতিক সম্পর্ক আছে। এর মধ্যে একজন সংবাদ পাঠিকাও রয়েছেন।

সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) সাবেক কমিশনার ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অব্স) মিজানের নারী কেলেঙ্কারির খবর নিয়ে গতকাল সোমবার পুলিশ সপ্তাহে দিনভর গুঞ্জন চলে। তবে পুলিশের সবচেয়ে বড় এই অনুষ্ঠানে ডিআইজি মিজানকে কোথাও দেখা যায়নি।

পুলিশের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, মিজানের বিরুদ্ধে অভিযোগটি ব্যক্তিগত এবং স্পর্শকাতর হওয়ায় পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিভাগ খোঁজখবর নিচ্ছে। তবে প্রভাব খাটিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং নারীকে হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁকে বড় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

বিষয়টি নিয়ে গতকাল সাংবাদিকরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছেও জানাতে চেয়েছেন। বিকেলে রাজধানীর নাখালপাড়া হোসেন আলী স্কুলে প্রধান অতিথি হিসেবে শীতবস্ত্র বিতরণ শেষে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যত বড় কর্মকর্তাই হন না কেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তিনি যদি এমন গর্হিত কাজ করেন তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে হয়রানিসহ নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ অস্বীকার করছেন ডিআইজি মিজান। তিনি গণমাধ্যমে পাঠানো এক লিখিত বক্তব্যে দাবি করেন, ইকো একজন প্রতারক। তিনি বিয়ের নকল কাবিননামা তৈরি করে প্রতারণা করেন। ইকো ও তাঁর মা প্রথমে অভিযোগ করলেও পরে অভিযোগ প্রত্যাহার করেছেন বলেও দাবি করেন মিজান।

ইকো ও তাঁর মা কুইন তালুকদার সাংবাদিকদের বলেছেন, পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের কাছে তাঁদের বাসা। সেখান থেকে কৌশলে গত বছরের জুলাই মাসে ইকোকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা মিজান। পরে বেইলি রোডের মিজানের বাসায় নিয়ে তিন দিন আটকে রাখা হয়েছিল তাঁকে। আটকে রাখার পর বগুড়া থেকে তাঁর মাকে ১৭ জুলাই ডেকে আনা হয় এবং ৫০ লাখ টাকা কাবিননামায় মিজানকে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়। পরে লালমাটিয়ার একটি ভাড়া বাড়িতে তাঁকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে রাখেন এর আগে বিবাহিত মিজান।

ইকো ও তাঁর মা আরো অভিযোগ করেন, কয়েক মাস কোনো সমস্যা না হলেও ফেসবুকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে একটি ছবি তোলার পর খেপে যান মিজান। বাড়ি ভাঙচুরের একটি ‘মিথ্যা মামলা’য় ইকোকে গত ১২ ডিসেম্বর কারাগারে পাঠানো হয়। সেই মামলায় জামিন পাওয়ার পর মিথ্যা কাবিননামা তৈরির অভিযোগে আরেকটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দুটি মামলায় জামিনে বেরিয়ে আসার পর ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন ইকো। গত সপ্তাহে তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এখন তাঁকে নতুন করে মামলায় জড়ানোর চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন ইকো ও তাঁর মা।

অভিযোগ থেকে জানা গেছে, কর্মসংস্থান ব্যাংকের কর্মকর্তা থাকাকালে ইকোকে গত বছরের জুলাই মাসে বিয়ে করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গোপন রাখার শর্ত দিয়েছিলেন মিজান। ইকো তা প্রকাশ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে মিজান গত ১২ ডিসেম্বর পুলিশ পাঠিয়ে ইকোকে গ্রেপ্তার করান। ডিআইজি মিজান বগুড়া, রমনা ও মোহাম্মদপুর থানার পুলিশকে ব্যবহার করে ইকো ও তাঁর পরিবারকে হয়রানি করেছেন। লালমাটিয়ার বাসায় তল্লাশির নামে তছনছ করে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ইকোর লেখাপড়া ও চাকরিসংক্রান্ত সব কাগজপত্র নিয়ে যায় পুলিশ।

ইকো ও তাঁর মা কুইন তালুকদার তাঁদের দাবির পক্ষে বেশ কিছু প্রমাণ সাংবাদিকদের সরবরাহ করেছেন। এর মধ্যে বিয়ের সময় কাজিকে দেওয়া ফিয়ের রসিদ, নিকাহনামার সার্টিফায়েড কপি চেয়ে পাঠানো দরখাস্ত, বিয়ের পর দোয়া প্রার্থনা করে ইকোর ফেসবুকে দেওয়া একটি ছবিসহ আরো বেশ কিছু ছবি, মেসেঞ্জারে ইকোর সঙ্গে মিজানের কথোপকথনের কিছু ছবি (স্ক্রিন শট), মিজানের স্বাক্ষর করা ঢাকা মহানগর পুলিশের মনোগ্রামযুক্ত একটি কাগজে লেখা ‘তোমার কোনো ক্ষতি হলে আমি সকল দায়িত্ব নেব’ চিরকুট রয়েছে। ঘটনায় বিচার চেয়ে ইকোর মা কুইন তালুকদার প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে  চিঠি দিয়েছেন।

গতকাল পুলিশ সপ্তাহের শুরুর দিন এ বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক গুঞ্জন দেখা যায়। ডিএমপির কয়েকজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, এসব অভিযোগের ব্যাপারে তাঁরা আগে থেকেই কিছুটা শুনেছেন। তবে বিস্তারিত জানতেন না। গণমাধ্যমে আসার পর তাঁরা বিব্রত। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া।

তবে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ব্যক্তিগত অপরাধের দায় পুলিশ বাহিনী আগে কখনোই নেয়নি, মিজানুর রহমানের ক্ষেত্রেও নেবে না।’ তবে এটি কোনো ষড়যন্ত্র কি না তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

এদিকে ইকোর ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের পাশাপাশি ডিআইজি মিজানের আরো নারী কেলেঙ্কারির গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এক সংবাদ পাঠিকাসহ কয়েক নারীর সঙ্গে তাঁর অনৈতিক সম্পর্ক আছে বলে দাবি করেন ইকো ও তাঁর মা। মিজানের ফাঁদে পড়ে অনেক নারীর সংসার ভেঙেছে বলেও দাবি তাঁদের। এর প্রমাণ হিসেবে ফোনালাপের রেকর্ডও সাংবাদিকদের সরবরাহ করেন তাঁরা।



মন্তব্য