kalerkantho


প্রকৃতির পাঠশালা নিভৃত পল্লীতে

মোশাররফ হোসেন, সাতক্ষীরা   

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রকৃতির পাঠশালা নিভৃত পল্লীতে

বৃক্ষপ্রেমী ইয়ারবের গাছের পাঠশালায় গেলে পরিচিত হওয়া যায় দুর্লভ গাছের সঙ্গে। ছবি : কালের কণ্ঠ

অগ্রসর কৃষকদের এক গ্রাম তুজুলপুর—বললে ভুল হবে না। ক্লাব তৈরি করে সঞ্চয় ব্যাংকই তারা বানায়নি, গড়ে তুলেছে ‘কৃষি হাসপাতাল’ ও বীজ ব্যাংক। ব্যাংক থেকে বীজ ধার নেয় চাষিরা, ফসল ঘরে ওঠার পর সমপরিমাণ বীজ ফেরত দিলেই হয় সংগ্রহশালায়। আর হাসপাতাল থেকে কৃষকরা পায় মাঠে ফসল সুস্থ রাখার কৌশল। এর মধ্যেই দেশজুড়ে পরিচিতি পাওয়া ইয়ারবের ‘গাছের পাঠশালা’র পাশাপাশি যেন হাত ধরাধরি করেই চলছে ওপরের উদ্যোগ দুটি। বৃক্ষপ্রেমিক ইয়ারব হোসেনের কর্মযজ্ঞ নিয়ে গত ২৫ আগস্ট কালের কণ্ঠ বিশেষ প্রতিবেদন ছাপে। যখন বৃক্ষ কেটে, পরিবেশ নষ্ট করে জীববৈচিত্র্যও খুন করা হচ্ছে বিশ্বজোড়া, দেশের নিভৃত এক অঞ্চলে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার তুজুলপুর গ্রামে দুঃসাহসিক কাজ করে চলেছেন ইয়ারব হোসেন। গাছের সঙ্গে বন্ধুত্ব, শত্রুতা নয়—এই ধারণা থেকে ঔষধি, ফলদ ও বনজ গাছের এ বিশাল সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন ইয়ারব। মাত্র দেড় বছরে ইয়ারবের সংগ্রহ ছয় শ ছাড়িয়ে গেছে।

ইয়ারব কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ছেলে-মেয়ে বা ছাত্র-ছাত্রীদের নানা জাতের গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে প্রতিদিনই মানুষ ছুটে যাচ্ছে তাঁর ‘গাছের পাঠশালা’য়। এলাকার অনেকে বেড়াতেও আসছে। প্রকৃতিপ্রেমিক ইয়ারব কালের কণ্ঠ’র প্রতি কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করে বলেন, গণমাধ্যমের সুবাদেও গাছের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বাড়ছে।

তুজুলপুর কৃষক ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ২৫ আগস্ট ইয়ারবের গাছের পাঠশালা নিয়ে কালের কণ্ঠে সচিত্র সংবাদ ছাপা হয়। এর পর থেকে পরিচিতি বাড়ছে আমাদের কৃষক ক্লাবেরও।’ তিনি জানান, ক্লাবের সদস্য ইয়ারব ‘গাছের পাঠশালা’ নিজেই শুরু করেন। এর পাশাপাশিই বীজ ব্যাংক ও কৃষি হাসপাতাল, যা ক্লাবের মাধ্যমে চলে। গোলাম রহমান জানান, ‘গাছের পাঠশালা’ দেখতে এসে কৃষক ক্লাবের কার্যক্রমও জানতে পারছে মানুষ। জেলাজুড়ে এর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ায় বীজ সংগ্রহ করতেও অনেকে ব্যাংকে ভিড় করছে। চলতি সরিষা মৌসুমে শতাধিক কৃষককে ‘বীজের বিনিময়’ শর্তে সরিষা বীজ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। ফসল ঘরে ওঠার পর সমপরিমাণ বীজ ক্লাবকে দিতে হবে—এ হচ্ছে বীজ ঋণের শর্ত!

গোলাম রহমান জানান, তাঁদের সংগঠন কৃষক সমাজের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। ক্লাবের সদস্য ১০০ জন, সবাই কৃষক। প্রত্যেকে সপ্তাহে ২০ টাকা করে জমা দেন। সঞ্চিত টাকা থেকে বিনা সুদে কৃষিকাজ, কৃষি সরঞ্জামাদি ও বৃক্ষ ক্রয়ের জন্য ধার দেওয়া হয়। কৃষকদের জন্য রয়েছে সঞ্চয়ের অর্থ থেকে বার্ষিক বনভোজনেরও সুবিধা। ক্লাবটি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোক্তাদের পুরস্কারও দিয়ে থাকে। ‘আমরা পুরস্কার পাওয়ার আশায় নয়, কৃষকের স্বার্থেই এগুলো করছি’ কালের কণ্ঠকে বলছিলেন গোলাম রহমান।

‘কুলফি শাক শরীরে রক্ত তৈরি করে, ফোলা রোগ উপশম করে। গাদোমনি শাক রক্ত আমাশয় দূর করে। বউটুনি শাকে রয়েছে আয়রন। কলার থোড় হাই প্রেসার রোধে কাজ করে। গিমি শাক ক্রিমি রোগের প্রতিষেধক। বেলে শাক কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। ডুমুর ডায়াবেটিসের প্রতিষেধক। মালঞ্চ শাক ক্ষত সারতে কাজ করে। কচুর পাতা চোখের জন্য ভালো আর পিপুল সর্দি-কাশি দূর করে।’ কালের কণ্ঠকে কথাগুলো যিনি বলছিলেন, তিনি শেফালী বেগম নামের একজন গৃহবধূ। ইয়ারব বিলুপ্তপ্রায় গাছ সংরক্ষণ শুধু নয়, ঔষধি গাছের ব্যবহার করিয়ে মানুষকে রোগমুক্তিরও উপায় বাতলে দিচ্ছেন। মানুষকে জড়ো করে তিনি গল্পের ছলে বলেন কোন গাছের কী গুণ। তুজুলপুর এলাকার গৃহবধূ শেফালী বেগম, আদুরী বিবি, সালেহা খাতুন, হেনা পারভীনসহ অনেকেই জানান, ঝোপ-জঙ্গল থেকে লতা-পাতা তুলে পাড়ায় পাড়ায় গল্পের আসর বসিয়ে উপকারিতা বলে যান ইয়ারব হোসেন। ফলে লতা-পাতার গুণাগুণও এলাকাবাসীর মুখস্থ হয়ে গেছে। এলাকাবাসী জানায়, ছোটখাটো রোগব্যাধিতে তারা এসব ব্যবহার করে উপকার পেয়ে থাকে। ইয়ারবের পাঠশালায় রয়েছে তিন শতাধিক ঔষধি গাছ।

ইয়ারবের বৃক্ষ আন্দোলন শুরু ঔষধি ও ফলদ বৃক্ষের চারা লাগিয়ে। একপর্যায়ে মনে হলো, কৃষকদের উত্পাদিত ফসলের বীজ ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে বহুজাতিক কম্পানির হাতে। কৃষকের বীজ কৃষকের ঘরেই রাখার জন্য কিছু করা যায় না? ইয়ারব বীজ ব্যাংক গড়লেন কৃষক ক্লাবের হয়ে। আর হাসপাতাল গড়া হয় ফসল সুরক্ষায়। ইয়ারব বলেন, হাসপাতাল থেকে কৃষকরা জানতে পারেন কীটনাশকমুক্ত ফসল উত্পাদনের কৌশল। কৃষকদের চিনিয়ে দেওয়া হয় ফসলের জন্য উপকারী ও ক্ষতিকারক পোকা। বীজ ঘরে রাখার জন্য উন্নত বীজ উত্পাদন পদ্ধতিও কৃষকের শেখানো হয়। ইয়ারব বলেন, তাঁদের বীজের সংগ্রহ খুবই সমৃদ্ধ।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কৃষি হাসপাতালে আছে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত লাঙল, জোয়াল, নিড়ানি, পোকা ধরার ফাঁদসহ সনাতনি নানা উপকরণ। পাঠশালায় ছোট ছোট বোর্ডে লেখা রয়েছে প্রত্যেক গাছের নামসহ উপকারিতা। বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য পাঠশালার এক পাশে উত্পাদন করা হয় বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ বৃক্ষের চারা। সুন্দরবনের বৃক্ষ পরিচিতির জন্য রয়েছে সুন্দরবন কর্নার। ইয়ারব বলেন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ের আওতায় গাছপালা সম্পর্কে পড়ানো হয় ঠিকই, কিন্তু ব্যবহারিক জ্ঞানচর্চার তেমন সুযোগ থাকে না। তাঁর গাছের পাঠশালা কিছুটা হলেও এই অভাব পূরণ করছে।

ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে ইয়ারব হোসেন বলেন, তিনি একটি সার্টিফিকেট কোর্স চালুর ধারণা নিয়ে এগোচ্ছেন। আগ্রহীদের তিনি গাছ ও লতাপাতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন, তারপর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে মিলবে সনদ। ইয়ারব জানান, ২০১৭ সালে এই পাঠশালার উদ্যোগে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীকে কদবেল, আমলকী, পেয়ারাসহ বিভিন্ন ঔষধি গাছের চারা উপহার দেওয়া হয়। গাছের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার শপথ করানো হয় শিশু শিক্ষার্থীদের।

কৃষক ক্লাবের সদস্য ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের (বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ) প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ইয়ারব হোসেনও। তিনি বলেন, ‘তাঁদের সার্বিক সহযোগিতাই আমাকে উত্সাহ জোগায়’।



মন্তব্য