kalerkantho


সৌদির সড়কে ঝরল ৭ বাংলাদেশির প্রাণ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সৌদির সড়কে ঝরল ৭ বাংলাদেশির প্রাণ

এইতো সেদিন কথা হলো প্রিয় সন্তানের সঙ্গে। কিন্তু আজ সব অতীত। সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আমিন মিয়ার স্বজনদের আহাজারি। ছবি : কালের কণ্ঠ

সৌদি আরবের জিজান প্রদেশে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় সাত বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। গত শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টার দিকে (বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা) ২০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক একটি পিকআপ ট্রাকে করে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় পেছন থেকে একটি বড় গাড়ির ধাক্কায় ওই দুর্ঘটনা ঘটে। সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব (প্রেস) মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম গতকাল রবিবার দুপুরে এ কথা জানান।

জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের বরাত দিয়ে মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম আরো জানান, জেদ্দা থেকে ৮০০ কিলোমিটার দূরে জিজান প্রদেশে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনাস্থলটির অবস্থান ইয়েমেন সীমান্তের কাছে। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে তাত্ক্ষণিক এক কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছে।

প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস গতকাল দুপুরে ১০ বাংলাদেশি নিহত হওয়ার তথ্য জানালেও বিকেলে জেদ্দায় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল এফ এম বোরহানউদ্দিন সাত বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ১৩ জন বাংলাদেশি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর।

দুর্ঘটনায় নিহত সাতজনের নাম জানা গেছে বিভিন্ন সূত্রে। তাঁরা হলেন টাঙ্গাইলের শফিকুল ইসলাম (৩৫) ও আমিন মিয়া (৩২), সিরাজগঞ্জের দুলাল, নারায়ণগঞ্জের মতিউর রহমান, নরসিংদীর আমির হোসেন ও হৃদয় এবং কিশোরগঞ্জের জসিম। নিহত বাংলাদেশিরা আল-ফাহাদ কম্পানিতে কাজ করতেন।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আরেকজনের মৃত্যু : এদিকে সৌদি আরবের আলহাসা কাতার রোডে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বাদল (৩৬) নামের আরেক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়।

টাঙ্গাইলে দুই পরিবারে আহাজারি

আমাদের টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার ডুবাইল গ্রামের আমিন মিয়া এবং কালিহাতী উপজেলার কস্তুরিপাড়া এলাকার হামেদ আলীর ছেলে শফিকুল ইসলামের মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছার পর দুই পরিবারে শুরু হয় শোকের মাতম। আমিন মিয়ার বৃদ্ধ বাবা আব্দুর রহিম মিয়াকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে। তাঁর মায়ের আহাজারিতে এলাকার অন্য অনেকের চোখও ভিজে যায়। স্বামী শোকে আমিনের স্ত্রী হ্যাপী বেগম নির্বাক হয়ে গেছেন।  প্রতিবেশীরা জানায়, রহিম মিয়া ঋণ করে তাঁর দুই ছেলে আমিন ও ফিরোজ মিয়াকে সৌদি আরব পাঠিয়েছিলেন। বড় ছেলে আমিন মাত্র দুই মাস আগে সৌদি আরব যান। তাঁদের বাড়িঘরের অবস্থাও ভালো নয়। আমিন মিয়া বিয়ে করেছেন তিন বছর আগে। কিন্তু কোনো সন্তান নেই। আমিন মিয়ার মতো শফিকুল ইসলামের বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। তাঁর মা বারবার কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমার কী হবে?’

নরসিংদীতে নির্বাক আমিরের স্বজনরা

নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আমির হোসেন নরসিংদী সদর উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের বাউশিয়া গ্রামের মৃত আবুল হোসেনের ছেলে। অন্যদিকে হৃদয় নামে নরসিংদীর আরেকজন নিহত হওয়ার খবর জানা গেলেও তাঁর ঠিকানা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বাউশিয়া এলাকায় আমির হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, শোকে অনেকটা নির্বাক হয়ে আছে আমিরের স্বজনরা। মুখে কোনো শব্দ না থাকলেও চোখে ঝরছে অঝোর ধারা। পরিবারের একমাত্র চালিকাশক্তি আমির হোসেনকে হারিয়ে তাঁর পরিবার এখন দিশাহারা। সরকারের মাধ্যমে দ্রুত মৃতদেহ ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা। নিহত আমির হোসেনের স্ত্রী শাহেনা আক্তার বলেন, ‘তিনি কইছিল আগামী মাসে আইব। কিন্তু হঠাৎ কইরা কী হইল! আল্লাহ আমার লগে এইডা কী করল! দুইডা পোলা-মাইয়া লইয়া এহন আমি কী করমু?’ ছেলে রবি উল্লাহ বলেন, ‘আমার আব্বারে শেষবারের মতন হইলেও দেখতে চাই। আপনেরা আমার বাবার লাশটা আনার ব্যবস্থা করেন।’

সিরাজগঞ্জে দুলালের বাড়িতে মাতম

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সৌদি আরবে দুর্ঘটনায় সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার বালুকুল গ্রামের দুলাল হোসেনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই মাতম চলছে পরিবারে। এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। টেক্সটাইল শ্রমিক দুলাল ১১ মাস আগে ঋণ করে চার লাখ টাকা দিয়ে পাড়ি জমান সৌদি আরব। বাবা আকবর হোসেন (৭৫) নিজেও অসুস্থ। শনিবার গভীর রাতে খবর আসে পরিবারের কাছে। আকবর হোসেন জানান, দুই সন্তান ও তাঁর স্ত্রীর গর্ভে তিন মাসের সন্তান রেখে সৌদি আরবে যান দুলাল। দুলালের ছোট ভাই বাবু বলেন, ‘পরিবারের অসচ্ছলতা ঘোচাতেই ঋণ করে ভাইকে বিদেশে পাঠানো হয়। এখন এত ঋণের বোঝা নিয়ে আমরা চলব কিভাবে?’ দুলালের স্ত্রী স্বপ্না বেগম বলেন, ‘এখন একটাই প্রত্যাশা, সরকার যদি আমার স্বামীর মরদেহ দেশে আনতে সহায়তা করে তাহলে হয়তো শেষবারের মতো সন্তানের মুখটা দেখতে পেতেন তারা বাবা।’



মন্তব্য