kalerkantho


স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রোহিঙ্গারা

বিতাড়িত রোগবালাই ফিরে আসার ভয়

তৌফিক মারুফ   

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিতাড়িত রোগবালাই ফিরে আসার ভয়

ফাইল ছবি

রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালানোর সময় ‘অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ’ শুধু নয়, কিছু রোগব্যাধিও সঙ্গে নিয়ে আসছে। এরই মধ্যে ডিপথেরিয়ায় কমপক্ষে ২৮ জন, এইডসে তিনজন ও হামে একাধিক আশ্রিত রোহিঙ্গা রোগীর মৃত্যুর খবর অনেককেই আতঙ্কিত করেছে, উদ্বেগ কাজ করছে সরকারের ভেতরেও। খোদ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশে বলছেন, দেশ থেকে বিদায় দেওয়া রোগগুলো রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে আবার না ফিরে আসে! সর্বশেষ গত রবিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সিএমএসডিতে ৯৮টি অ্যাম্বুল্যান্স বিতরণ অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মানবিক কারণে আমরা রোহিঙ্গাদের এ দেশে আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু তাদের মাধ্যমে এখন আমাদের দেশেও পোলিও, ডিপথেরিয়া, এইডসের মতো রোগ ছড়ানোর ভয় রয়েছে।’

বাংলাদেশ পোলিওমুক্ত। ডিপথেরিয়া নেই অনেক দিন। এইডস থাকলেও সংখ্যায় হাতে গোনা, দূর হয়েছিল হামের প্রকোপ। কলেরা নেই বললেই চলে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে যারা বাংলাদেশে চিকিৎসার আওতায় এসেছে তাদের কারো কারো মধ্যে ওপরে উল্লিখিত ব্যাধি পাওয়া যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা রোহিঙ্গাদের চিকিৎসার দিকে নজর দিয়েছি। পোলিও, কলেরা-হাম-রুবেলা থেকে রক্ষার জন্য টিকা দেওয়া শুরু করেছি। এ পর্যন্ত দুবার ৯ লাখ ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। তখন অবশ্য আমরা ডিপথেরিয়ার বিষয়টি ধরতে পারিনি। পরে যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ এগিয়ে এসেছে তখন থেকে আমরা ডিপথেরিয়ারও টিকা দেওয়া শুরু করেছি নিজস্ব জাতীয় সম্প্রসারিত টিকাদান কার্যক্রমের আওতায়। এ ছাড়া এইডসও ধরা পড়েছে অনেকের মধ্যে—এসব কারণে আমাদের মধ্যে শঙ্কা জেগেছে।’ তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রিত মানুষরা আশপাশের স্থানীয় মানুষদের মধ্যে বিচরণ করছে, হাটবাজারে যাওয়া-আসা করছে, ফলে তাদের মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি তো আছেই।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক মহলকে সতর্ক করেছি—তারা যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রোগ পরিস্থিতির তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের রোগের হিসাব মিলিয়ে না ফেলে।’

এদিকে রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের অন্যতম সমন্বয়কারী ডা. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোহিঙ্গারা শুধু ডিপথেরিয়া, এইডস, হাম, যক্ষ্মা নিয়ে আসেনি, অনেকেই আরো অনেক ধরনের রোগে ভুগছে। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় তাদের চিকিৎসায় সর্বাত্মক কাজ করছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, ডিপথেরিয়ায় আক্রান্তদের অনেকেরই উন্নত চিকিৎসার দরকার হলেও এখন পর্যন্ত উপযুক্ত তেমন চিকিৎসার ব্যবস্থা স্থানীয় মেডিক্যাল ক্যাম্পে নেই। এ জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে কিংবা ঢাকায় পাঠাতে পারলে ভালো হতো।

অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে ডিপথেরিয়ার সংক্রমণ রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তাদের সবাইকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত ৮৫ জন এইডসের রোগী শনাক্ত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মিয়ানমারে এইচআইভি সংক্রমণের হার বিবেচনায় বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক হাজারের বেশি এইচআইভি আক্রান্ত রোগী থাকার কথা। তিনি আরো বলেন, ‘অন্যান্য রোগের উপসর্গ পাচ্ছে আমাদের পর্যবেক্ষণ টিম। আর অপুষ্টির সমস্যা সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল শুরুর দিকে, এখন তা কাটিয়ে ওঠা গেছে। পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত এই জনগোষ্ঠীর নারী-শিশুসহ সব বয়সের মানুষ যেভাবে দিন-রাত পানিতে ভেসে, বনজঙ্গল ভেঙে ছুটে আসছে তাতে সহজেই তাদের শরীরে মশা-পোকামাকড় ও পানিবাহিত নানা রোগের ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতি সামাল দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে।

সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে ডিপথেরিয়া নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে উল্লেখ করে ইউনিসেফ সূত্র জানায়, ডিপথেরিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে ৭৪ শতাংশের বেশি রয়েছে ১৫ বছর বয়সের কম বয়সী শিশু। যার মধ্যে ৫৫ শতাংশ  ক্ষেত্রে মেয়েশিশু। আর ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃতদের মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি শিশু। ইউনিসেফ বর্তমানে ছয় সপ্তাহ থেকে ছয় বছর বয়সের শিশুদের ডিপথেরিয়া ও নিউমোনিয়ার টিকা দিচ্ছে। এ ছাড়া মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচার চালাচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য সূত্র অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যাদের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে তাদের মধ্যে ৩৭.৫ শতাংশ ডায়রিয়া, ৩১.৬ শতাংশ ঠাণ্ডাজনিত সর্দিকাশি, ১১.৭ শতাংশের চর্মরোগ, ৬.১ শতাংশের শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা পাওয়া যায়। এ ছাড়া ম্যালেরিয়া-ফাইলেরিয়ার মতো রোগও পাওয়া যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের মধ্যে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ২৯ মার্চ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে পোলিওমুক্ত হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। সেদিন বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, নেপাল, উত্তর কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার এই তালিকায় রয়েছে। এর আগে দেশকে পোলিওমুক্ত করার জন্য ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতিবছর বাংলাদেশে জাতীয় টিকা দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর এ দেশে সর্বশেষ পোলিও রোগী পাওয়া যায়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে বাংলাদেশকে তখন পোলিওমুক্ত ঘোষণা করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা জানান, পোলিও ভাইরাসজনিত একটি ছোঁয়াচে রোগ। স্নায়ুতন্ত্রে এ রোগের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রোগী পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে পোলিওর আশঙ্কা শুরুতে আমাদের মধ্যে খুব বেশি ছিল। তাই সবাইকেই টিকা দিয়েছি। অবশ্য এখন পর্যন্ত আমরা একটিও পোলিও রোগী পাইনি। এ ছাড়া বাংলাদেশে হাম, রুবেলা নিয়ন্ত্রণে জাতীয় কার্যক্রমের আওতায় টিকাদান কার্যক্রম চলছে।



মন্তব্য