kalerkantho


রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন উদ্যোগের মধ্যে ফের ‘আরসার হামলা’

রাখাইনে ছয় সেনা আহত হওয়ার দাবি

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন উদ্যোগের মধ্যে ফের ‘আরসার হামলা’

আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগের মধ্যেই মিয়ানমার বলেছে, গত শুক্রবার রাতে রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা হয়েছে। মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ও সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল অং মিনের দাবি, রোহিঙ্গা জঙ্গিগোষ্ঠী আরকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ২৪ আগস্টের মতো গত শুক্রবারও হামলা চালায়। এতে ছয় সেনা সদস্য আহত হয়।

সিনিয়র জেনারেল অং মিনের ফেসবুক পেজের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি জানায়, সেনাবাহিনীর ট্রাক লক্ষ্য করে বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটায় ২০ জনেরও বেশি জঙ্গি। রাখাইন রাজ্যের তংপিয়ো টাউনশিপ থেকে ট্রাকটি অন্যত্র যাচ্ছিল।

মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের কর্মকর্তা সান গতকাল শনিবার টেলিফোনে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আহত ছয় সেনাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। মিয়ানমার সরকার রাখাইন রাজ্যে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও বিদেশিদের যেতে দেয় না। এর আগে গত ২৪ আগস্ট কফি আনান কমিশন রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকারের কাছে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাখাইনে আরসার হামলার শিকার হওয়ার দাবি করেছিল মিয়ানমারের বাহিনী। এরপর কথিত জঙ্গি মোকাবেলার নামে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে মিয়ানমারের বাহিনীর নির্বিচার হামলা ও হত্যাযজ্ঞে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়। প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় ছয় লাখ ৫৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা।

এবারও মিয়ানমার সরকার যখন রাখাইন রাজ্যে আইডিপি ক্যাম্প (অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবির) বন্ধ করে দিয়ে রোহিঙ্গাদের কাজের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, সে মুহূর্তে দেশটির সামরিক বাহিনী নতুন করে হামলার শিকার হওয়ার কথা বলছে।

কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সভাপতি এবং মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী উইন মিয়াত আয়ে রেডিও ফ্রি এশিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, রাখাইন রাজ্যে আইডিপি ক্যাম্প বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে দেশটির সরকার। তারা রোহিঙ্গাদের কাজের সুযোগ দেবে।

রাখাইন রাজ্যে আইডিপি শিবিরগুলো বন্ধ করার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ওপর বিদ্যমান বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া এবং নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করার সুপারিশ করেছিল কফি আনান কমিশন।

এদিকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডাব্লিউজি) প্রথম বৈঠক হবে আগামী ১৫ জানুয়ারি নেপিডোতে। সেই বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করার জন্য ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ সই হওয়ার কথা রয়েছে। কবে কোন সীমান্ত দিয়ে কতজন করে যাবে এবং মিয়ানমার তাদের গ্রহণ করার কী ব্যবস্থা নেবে সেসব বিষয় বিস্তারিত থাকবে ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্টে। মিয়ানমারের পাঠানো ফরম ব্যবহার করে প্রত্যাবাসনে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের তথ্য সংগ্রহের কাজ এ সপ্তাহেই শুরু হওয়ার কথা। আগামী ২২ জানুয়ারির মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরু করার লক্ষ্যে কাজ করছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার।

রাখাইন রাজ্য কর্তৃপক্ষ গত এপ্রিল মাসেই কামান মুসলমান, রাখাইন জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের তিনটি শিবির বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। এবার ওই তিনটি শিবিরসহ অন্য শিবিরগুলোও বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে মিয়ানমারের মন্ত্রী উইন মিয়াত আয়ে বলেন, ওই শিবিরগুলো ২০১২ সাল থেকে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে অং সান সু চির ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) মিয়ানমারে ক্ষমতায় আসার পরই ওই শিবিরগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল। কারণ শিবিরের বাসিন্দাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। আনান কমিশনও শিবিরগুলো বন্ধ করতে বলেছে।

মিয়ানমারের মন্ত্রী বলেন, গত বছর আগস্ট মাসে উত্তর রাখাইন রাজ্যে হামলার ঘটনায় শিবিরগুলো বন্ধ করার সরকারি পরিকল্পনা স্থগিত করতে হয়। সরকার আবার সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী আইডিপি শিবিরগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। তিনি বলেন, শিবিরের বাসিন্দাদের জন্য এমন জায়গা খোঁজা হচ্ছে যেখানে তাদের কাজের সুযোগ থাকবে।

উইন মিয়াত আয়ে বলেন, ‘আমরা মত্স্য খাত ও শিল্প জোনগুলোতে চাকরি সৃষ্টি করব। তাদের জন্য অবাধে চলাফেরার সুযোগ করাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাছে জাতীয় পরিচয় যাচাইকরণ কার্ড থাকলে তারা মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।’

রাখাইন রাজ্যে বৌদ্ধ রাখাইন ও মুসলমান রোহিঙ্গাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা না থাকায় আইডিপি শিবিরগুলো বন্ধ করা নিয়ে সমস্যা হবে কি না—রেডিও ফ্রি এশিয়ার এমন প্রশ্নের জবাবে মিয়ানমারের মন্ত্রী বলেন, ‘পারস্পরিক আস্থা থাকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন একটি সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছি তখন আমাদের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে। স্থিতিশীলতা থাকলে উন্নয়ন হবে। উন্নয়ন হলে আরো বেশি স্থিতিশীলতা আসবে।’ তিনি বলেন, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য শিক্ষা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। লোকজন শিক্ষিত না হলে তারা উগ্রবাদী হয়ে উঠতে পারে এবং অন্যরা সহজেই তাদের ব্যবহার করতে পারে।

রোহিঙ্গাদের জন্য তিন দেশের যৌথ মিশন : কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়া যৌথ মিশন পরিচালনা করতে রাজি হয়েছে। মালয়েশিয়ার দ্য স্টার পত্রিকার অনলাইনে গতকাল শনিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিশামউদ্দিন হুসেইন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ সালমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ মোহাম্মদ জায়েদ আল-নাহিয়ানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন।

হিশামউদ্দিন হুসেইন বলেন, কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি ফিল্ড হাসপাতাল আছে। তবে সেটি মালয়েশিয়ার ফিল্ড হাসপাতালের মতো বড় নয়। সৌদি আরব রোহিঙ্গাদের জন্য ওষুধসামগ্রী দেবে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর এ মাসেই কক্সবাজার সফর করার কথা রয়েছে। তখন তিন দেশ যৌথ উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের সহায়তা দেবে।



মন্তব্য