kalerkantho


এমন স্কুল কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...

শামীম খান, মাগুরা   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এমন স্কুল কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...

স্কুলে ভর্তি চলে অনলাইনে। দায়িত্বটি নিজেরাই পালন করে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘সততার দোকান’। দোকানদার নেই। শিশু পণ্য কিনে নিজে থেকে সেখানে দাম রেখে দেয়। এ হচ্ছে তার সততার পরীক্ষা! এভাবে তাকে গণিতও শেখানো হচ্ছে। তাদের জন্য আরো আছে ‘মহানুভবতার দেয়াল’। এখানে বোর্ডে সচ্ছল শিক্ষার্থীরা ব্যবহারের উপযোগী নতুন-পুরনো পোশাক টাঙিয়ে রাখে, যা দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীরা ইচ্ছা করলেই বাড়ি নিয়ে ব্যবহার করতে পারে। প্রতিদিনই সকালের সমাবেশে দিনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের ওপর আলোচনা চলে। শ্রেষ্ঠ বক্তাকে দেওয়া হয় দিনের সেরা ছাত্রের খেতাব। শিক্ষার্থীটি ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ডে’র পদক গলায় ঝুলিয়ে সারা দিন স্কুল করে। এ ছাড়া প্রতিদিন সমাবেশে শেখানো হয় একটি করে ‘নীতিবাক্য’, যেন শিশুর মনোজগতে তা বড় প্রভাব ফেলে। তাদের যুক্ত করা হয়েছে সর্বশেষ তথ্য-প্রযুক্তি চর্চার সঙ্গেও। ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিদিন সকালে স্কুলে তাদের ডিজিটাল আইডি কার্ড নির্ধারিত মেশিনে ঢুকিয়ে হাজিরা নিশ্চিত করে। সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবকের মোবাইল ফোনে একটি এসএমএস চলে যায়। ফলে উপস্থিতি বেশির ভাগ দিনই শতভাগ থাকে। এ রকম মোট ২৩টি উদ্ভাবনী ও ব্যবহারিক শিক্ষা পদ্ধতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু করে দেশে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

এরই মধ্যে ডিজিটাল স্কুল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। গত ৯ সেপ্টেম্বর এ নিয়ে কালের কণ্ঠে বিশেষ প্রতিবেদন ছাপা হয়। প্রতিষ্ঠানটিকে এই উচ্চতায় নিয়ে এসেছেন বিদ্যালয়ের দূরদর্শী প্রধান শিক্ষক ইয়াসমিন আক্তার। অভিভাবকরা যাতে তাঁদের আড্ডা বা অপেক্ষার সময়টির সর্বোচ্চ ইতিবাচক ব্যবহার করতে পারেন, সে জন্যও রয়েছে ‘আনন্দ পাঠাগার’। স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকতেই সামনে পড়ে লাইব্রেরিটি। মা বা বাবারা শিশুবিষয়ক গল্পের বইসহ বিভিন্ন বই পড়েন এই পাঠাগারে। বাড়িতে নিয়েও সন্তানদের তারা পড়ে শোনাতে পারেন। উদ্যোগটি মেধা বিকাশে ব্যাপকভাবে সহায়ক বলে উল্লেখ করলেন আনন্দ পাঠাগারে অপেক্ষারত স্কুলের দুই শিক্ষার্থীর মা সায়েদা পারভিন ও জান্নাতুল ফেরদৌস।

প্রধান শিক্ষক জানান, বিদ্যালয়ে আছে ‘এই দিনে’ নামে দৈনন্দিন পাঠক্রমের তথ্য বোর্ড, যেখানে দিনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ধরে তথ্য দেওয়া হয়। আরো আছে সিসিটিভি ক্যামেরায় শ্রেণি পাঠদান পর্যবেক্ষণ, গুণীজন গ্যালারি, আলোকিত আচরণ সংগ্রহশালা, বিখ্যাত ব্যক্তি ও স্থাপনার নামে শ্রেণিকক্ষ ও শাখার নামকরণ, শিশুদের দিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা, দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা। এ ছাড়া আছে কুইজ ক্লাব, ল্যাংগুয়েজ ক্লাব, ডিবেটিং ক্লাব, উপকরণ কর্নার, গণিত ল্যাব, প্রতীকী চিড়িয়াখানা। টিফিনের টাকা সঞ্চয় বক্সও রাখা আছে, শিশুরা চাইলেই এখানে অর্থ ফেলতে পারে, যা দিয়ে কল্যাণকর কাজ করা হয়। বিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটও খোলা হয়েছে।

প্রধান শিক্ষক কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারের ভিশন-২০২১ বাস্তবায়ন ও ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের’ অংশ হিসেবে তিনি স্কুলে ২৩টি উদ্ভাবনী শিক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, এভাবে নিজেদের তৈরি করতে পারলে শিশুরা সামাজিক মূল্যবোধ শিখবে, শারীরিক ও মানসিক মেধার বিকাশ ঘটিয়ে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। স্কুলের শিক্ষার্থী আফজাল হোসেন, তন্ময় চক্রবর্তী, আবুল কালাম, সুমাইয়া ইয়াসমিন, দীপ্ত চক্রবর্তী—সবাই খুশি এমন স্কুল পেয়ে।

ইয়াসমিন আক্তার জানান, ২০১১ সালে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০১৪ সালে এলাকাবাসী ও প্রশাসনের সহযোগিতায় এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করেন। বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৭০২ জন ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। ১৫ জন শিক্ষক উদ্ভাবনী ও বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষা দান করছেন। পাশপাশি শিশুদের অভিভাবক ও বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সদস্যরা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছেন। বিদ্যালয়টি ২০১৫ সালে খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পায়। গত বছর বিভাগীয় কমিশনার ক্রেস্টও পায় প্রতিষ্ঠানটি। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিবছরই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় পাসের হার শতভাগ থাকে।

কেন এসব উদ্যোগ? ইয়াসমিন আক্তার মনে করেন, যে শিক্ষা মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম ও মানবিকতার জন্ম দেয় না, তা কেবলই প্রথাগত শিক্ষা। দরকার এমন শিক্ষা, যা মানুষের সেবায় শিশুদের আত্মনিবেদিত হতে উদ্বুদ্ধ করবে, পাশাপাশি বিজ্ঞানমনস্ক করেও তাদের গড়ে তুলবে। তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, অভিভাবক প্রত্যেকে আমাকে সব সময় সহযোগিতা করছেন। এসব কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সরবরাহ এসেছে তাঁদের কাছ থেকেই। আমরা চাই স্কুল হবে মানুষ গড়ার অনন্য সূতিকাগার। আমাদের স্কুলের শিশুরা আগামী দিনে যেখানেই যাক তার আচরণ ও মেধা যেন সর্বত্র প্রশংসিত হয়, সেই ব্রত নিয়ে স্কুলের শিক্ষকরা কাজ করে যাচ্ছেন।’

এলাকাবাসীরও বড় অবদান রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির এ পর্যায়ে আসতে। বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি মুরশেদুল আলম বলেন, ‘আমরা নিয়মিতভাবে স্কুলে এসে শিক্ষা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করি। শিশুরা কেমন শিখছে, তা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগও অভিভাবকদের রয়েছে।’ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সহসভাপতি মুন্সী মামুনুর রহমান বলেন, ‘ডিজিটাল সার্ভিস পয়েন্টের মাধ্যমে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের ভর্তি অনলাইনে করাসহ অন্যান্য কার্যক্রম নিজেরাই পরিচালনা করে থাকে। তাদের সেভাবেই কম্পিউটারে দক্ষ করে গড়ে তোলা হয়।’

শালিখা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার অরুণ চন্দ্র ঢালী বলেন, যুগান্তকারী স্কুলটিকে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে আসছেন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রুহুল আমীন জানান, জেলার অন্য তিন উপজেলার মডেল স্কুলগুলোতে এ ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। স্কুলের শিক্ষক দীপংকর কুমার বিশ্বাস ও মিঠু রানী ব্যানার্জী জানান, শিক্ষার্থীদের তিন কেজি পর্যন্ত ওজনের ব্যাগ বহনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।



মন্তব্য