kalerkantho


নাগরিক স্বীকৃতি দিয়েও ২৪১৫ রোহিঙ্গাকে নিচ্ছে না মিয়ানমার

মেহেদী হাসান   

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নাগরিক স্বীকৃতি দিয়েও ২৪১৫ রোহিঙ্গাকে নিচ্ছে না মিয়ানমার

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্প্রতি সই হওয়া প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় পরিচয় যাচাই সাপেক্ষে ফিরিয়ে নেওয়া হবে ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের। গত সোয়া এক বছরে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার বিষয়টি নিষ্পত্তির পর দুই দেশ আগে থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কাজ করবে বলে চুক্তিতে বলা হয়েছে।

অথচ ২০১১ সালের অক্টোবরের আগে বাংলাদেশে ঢোকা কয়েক লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে দুই হাজার ৪১৫ জনের পরিচয় যাচাই করে নিজের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করেও তাদের নেয়নি মিয়ানমার। মূলত মিয়ানমারের কূটকৌশলে আড়ালে পড়েছে বেশ আগে থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে দুই হাজার ৪১৫ জনকে ২০১১ সালেই মিয়ানমার তার নিজের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করেছিল। ২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট ঢাকায় পররাষ্ট্রসচিবদের নেতৃত্বে বৈঠকে মিয়ানমার তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দুই মাসের মধ্যে শুরুর আশ্বাসও দিয়েছিল। এমনকি গত ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে নতুন করে অভিযান শুরুর পর বাংলাদেশমুখী ঢলের পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও বলেছিলেন, সবাইকে নয়, বরং এর আগে যাচাই করা সেই দুই হাজার ৪১৫ জনকেই তারা ফেরত নেবেন। কিন্তু গত ২৩ নভেম্বর দুুই দেশের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে এবং গত ১৯ ডিসেম্বর ঢাকায় দুই দেশের মধ্যে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের কার্যপরিধি ঠিক করা হয়েছে, সেখানেও ওই দুই হাজার ৪১৫ জনের প্রত্যাবাসন বিষয়ে কোনো কিছু বলা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই হাজার ৪১৫ জনের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি এখন আড়ালে পড়ে গেছে। তাদের বিষয়ে এখন আর কোনো আলোচনা চলছে না। সমস্যা হলো, ওই দুই হাজার ৪১৫ জনের অনেকেরই জন্ম বাংলাদেশে। তাদের ফেরত যাওয়ার বিষয়ে আইনি জটিলতাও আছে।’

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারের সদিচ্ছা নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করেছে কূটনৈতিক সূত্রগুলো। তারা জানায়, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে না নিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে যাতে রাখাইন রাজ্যের বাকি রোহিঙ্গারাও বাংলাদেশে চলে আসে। মিয়ানমার ২০০৫ সাল থেকে একতরফাভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ রেখেছে।

কূটনৈতিক ওই সূত্র বলছে, বাংলাদেশ যখন শরণার্থী শিবিরের বাইরে অবৈধভাবে অবস্থান করা কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে, তখন মিয়ানমার ওই দুই হাজার ৪১৫ জনকে ফেরত নিয়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু এরপর আর তা বাস্তবায়ন করেনি। বরং তাদের সৃষ্টি করা পরিস্থিতিতে আরো অন্তত সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ যখন রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কাজ করছে, তখন রাখাইন রাজ্যের মধ্যাঞ্চলে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে রাখাইনদের উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। এ বছর রোহিঙ্গা সংকট আরো প্রকট হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে জেনেভার মানবিক সংকটবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘দ্য অ্যাসেসমেন্ট ক্যাপাসিটিস প্রজেক্ট’। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বলছে, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো অনুকূল পরিস্থিতি রাখাইনে সৃষ্টি হয়নি। এখনো রোহিঙ্গারা রাখাইন থেকে বাংলাদেশে আসছে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবেশী দেশগুলোতেও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে যে রীতি অনুসরণ করা হয় সেটি হলো যে আগে আসবে সেই আগে ফিরবে যাতে তার দুর্ভোগ কম হয়। অবৈধভাবে থাইল্যান্ডে পাড়ি জমানো বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার অতীতে বিভিন্ন সময় আসা রোহিঙ্গাদের বাদ দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরানোর কথা বলে জটিলতা সৃষ্টি করছে।

এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবিষয়ক বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠক আগামী ১৫ জানুয়ারি নেপিডোতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেই বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ সই হওয়ার কথা। কবে কোন সীমান্ত দিয়ে কতজন করে যাবে এবং মিয়ানমারে তাদের গ্রহণ করার ব্যবস্থা বিষয়ে বিস্তারিত থাকবে প্রস্তাবিত ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্টে’।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চার মাসেরও কম সময়ে বাংলাদেশ প্রায় সাড়ে ৯ লাখ রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন করেছে। ২০১৬ সালের আগস্টের পর থেকে আশ্রয় নেওয়া প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে প্রথমপর্যায়ে এক লাখের তালিকা মিয়ানমারে পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের তথ্য সংগ্রহের জন্য মিয়ানমার বাংলাদেশে ফরম পাঠিয়েছে। আগামী সপ্তাহে ওই ফরমের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের তথ্য নেওয়া শুরু হবে। মিয়ানমার আগামী ২২ জানুয়ারি ৪৫০ জন রোহিঙ্গা হিন্দুকে ফিরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায়। তবে বাংলাদেশ ধর্মীয় পরিচয়ে প্রত্যাবাসন শুরুর পক্ষে নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রথম দিন ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে হিন্দুরাও থাকবে।



মন্তব্য