kalerkantho


নানা কৌশলে পরিবহন

মাদক শনাক্তের মেশিন নেই কোনো সংস্থার

এস এম আজাদ   

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মাদক শনাক্তের মেশিন নেই কোনো সংস্থার

গাড়ির সিটের নিচে, ইঞ্জিনের কাছে, দরজার ভেতরে, মোটরসাইকেলের ট্যাংকে; আবার কখনো মাছের ঝুড়িতে, তুলা, সবজি, কাঁঠাল এমনকি এলইডি টিভির ভেতরে—কৌশলের যেন শেষ নেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এভাবেই নতুন নতুন কৌশলে পরিবহন করা হচ্ছে ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকদ্রব্য। মাঝেমধ্যে পুলিশ, র্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অভিযানে কিছু ধরা পড়ছে। কিন্তু অনেক চালানই ধরা পড়ছে না।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর শান্তিনগরের চামেলীবাগে মোটরসাইকেলের ট্যাংকের ভেতর থেকে ৫৭ হাজার ৮৯৫টি ইয়াবাসহ স্বপন মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-২। স্বপন এই কৌশলে তার মোটারসাইকেলে করেই টেকনাফ থেকে ইয়াবা নিয়ে আসত।

একই দিন সন্ধ্যায় ধানমণ্ডির ৫ নম্বরে সুবাস্তু ইতেহাদ স্কয়ার টাওয়ারের সামনে পাজেরো জিপের ভেতর থেকে তিন হাজার ৮৭০ বোতল ফেনসিডিলসহ হূদয় আলম ও হাসুনুর রহমান নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-১০। তারা যশোরের বেনাপোল থেকে গাড়িতে করেই ফেনসিডিলগুলো নিয়ে আসে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদক কারবারিরা এমন সব কৌশল বের করে যে তা ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। গোপন সংবাদে মাদকদ্রব্য পরিবহনের খবর থাকলেও শনাক্ত করা কঠিন হয়। উন্নত দেশে মাদকদ্রব্য শনাক্ত করার মেশিন ড্রাগ ডিটেক্টর থাকলেও বাংলাদেশের কোনো সংস্থার কাছেই তা নেই। তাই অভিযানকারীরাও কেবল কৌশল পাল্টে তল্লাশি চালান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসির মহাপরিচালক (ডিজি) মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদক কারবারিরা প্রশাসনের চেয়ে অনেক চতুর। তারা অনেক উপায়ে মাদকদ্রব্য নিয়ে যাচ্ছে। ইয়াবা এত ছোট যে ছোট প্যাকেটে শরীরেও বহন করা যায়। এসব ধরার প্রযুক্তিগত কোনো সামর্থ্য আমাদের নেই। এ কারণে বন্দরসহ ট্রানজিট পয়েন্টে ড্রাগ ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশির পরিকল্পনা করেছি। এটি আমরা আনতে পারলে লুকানোগুলোও ধরা যাবে।’

হাইওয়ে পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাদক কারবারিরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পাল্টে মাদকদ্রব্য পরিবহন করছে। গত বছরের শুরু থেকে আমরা বিশেষভাবে তল্লাশি শুরু করেছি। তাদের অনেক কৌশলই ধরা পড়েছে। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

ডিএনসির পরিচালক (অপারেশনস ও গোয়েন্দা) সৈয়দ তৌফিকউদ্দিন আহমেদও বলেন, ‘কক্সবাজার থেকে ইয়াবা ঢাকায় আসছে। আবার কয়েকটি সীমান্ত এলাকা থেকে ফেনসিডিল ও গাঁজা আসছে। এগুলো দেশের অন্যান্য এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ছে। মহাসড়কে আমাদের নজরদারি আছে।’ সম্প্রতি নরসিংদীতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকে ছয়-সাত মণ গাঁজার চালান জব্দ করা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের প্রায় দুই হাজার ১০০ কিলোমিটার মহাসড়কে বিভিন্ন যানবাহনে মাদকদ্রব্য পরিবহন চলছে। সবচেয়ে বেশি হচ্ছে আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কই ইয়াবার প্রধান রুট। এসব সড়কে যাত্রীবাহী বাস থেকে শুরু করে মাছের ট্রাকেও ইয়াবা পরিবহন করা হচ্ছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তিগত গাড়িতে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে লাখ লাখ ইয়াবার চালান সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে গাড়ির সিটের নিচে, দরজার ফাঁকে, ইঞ্জিন ও ট্যাংকের ফাঁকে এবং পেছনের কাভারের (বুট) ভেতরে বিশেষ স্থান তৈরি করছে মাদক কারবারিরা। কখনো ব্যাগে ও শরীরে বহন করা হয় ইয়াবার ছোট চালানগুলো। ফেনসিডিলের চালানগুলো ট্রাকে বা পিকআপ ভ্যানে, কখনো ব্যক্তিগত গাড়ির ভেতরে মালপত্রের ফাঁকে লুকিয়ে বহন করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-যশোর, ঢাকা-কুমিল্লা, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কই ফেনসিডিল পরিবহনের প্রধান রুট। তবে সবচেয়ে বেশি পরিবহন করা হচ্ছে সস্তা মাদকদ্রব্য গাঁজা। ঢাকা-কুমিল্লা, ঢাকা-সিলেট এবং উত্তরাঞ্চলের রুটে গাঁজার বড় ধরনের চালান পরিবহন করা হচ্ছে। তবে আঞ্চলিক মহাসড়কেও দু-চার কেজি করে গাঁজা নিয়ে যায় কারবারিরা। বড় চালানগুলো ট্রাকে তুলা, কাপড়, নারকেলের ছোবড়া, প্লাস্টিক সামগ্রী, নির্মাণ সামগ্রী এবং শুঁটকির বস্তার ভেতরে করে নেওয়া হচ্ছে।

হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের এএসপি শফিকুল ইসলাম জানান, গত বছরের ২৫ জুলাই ফেনী থেকে দুই মাদক কারবারি একটি কাঁঠাল নিয়ে ঢাকায় আসছিল। কুমিল্লার ময়নামতি মহাসড়কে গেলে টহলরত হাইওয়ে পুলিশের সন্দেহ হলে তারা কাঁঠালসহ দুই ব্যক্তিকে আটক করে। পরে কাঁঠালটির খোসা ছাড়িয়ে দেখা গেছে ভেতরে কোনো কোষ নেই। পাওয়া গেছে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এর আগেও হাইওয়ে পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশিকালে এলইডি টেলিভিশনের ভেতরে ইয়াবার চালান পাওয়া গেছে। প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন গাড়িতে এখন প্রতিদিন ঢাকায় ইয়াবা আনা হচ্ছে। মহাসড়কে প্রতিদিন অভিযান চলাকালে হাজার হাজার ইয়াবা ধরাও পড়ছে।

হাইওয়ে পুলিশের এক হিসাবে দেখা গেছে, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত মহাসড়কে অভিযানে মাদকদ্রব্যসংক্রান্ত মামলা হয়েছে ১৯৯টি। ওই সময় মাদকদ্রব্য পরিবহনকারী ২৪১ জনকে গ্রেপ্তার এবং ২২টি যানবাহন জব্দ করা করা হয়েছে। তিন মাসে এক লাখ ২৯ হাজার ৬৩৯ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে হাইওয়ে পুলিশ। গাঁজা উদ্ধার করা হয় ২৩ মণ ১৭ কেজি (৯৩৭ কেজি)। ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়েছে দুই হাজার ৬৭৪ বোতল; চেলাই মদ ৫৩৯ লিটার; বিদেশি মদ ২৫৪ বোতল; বিয়ার এক হাজার ১৩৭ ক্যান; হেরোইন ১৬৫ গ্রাম এবং নেশাজাতীয় ইনজেকশন এক হাজার ৭০০ পিস।

এসব অভিযানে জব্দ করা হয়েছে একটি পাজেরো জিপ, পাঁচটি প্রাইভেট কার, দুটি মাইক্রোবাস, একটি বাস, একটি কাভার্ড ভ্যান, ছয়টি পিকআপ, একটি অটোরিকশা (মাহেন্দ্র), দুটি মোটরসাইকেল, দুটি ইজিবাইক এবং একটি সিএনজি অটোরিকশা।

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশন ও স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স) আনিসুজ্জামান জানান, অবৈধ যানবাহনেই বেশি পরিবহন করা হয় মাদকের চালান। জব্দকৃত ব্যক্তিগত গাড়িগুলো চোরাই বা নিবন্ধনহীন। আর গণপরিবহনে যাত্রীবেশে ব্যাগে লুকিয়েও মাদকদ্রব্য পরিবহন করা হচ্ছে।

র্যাব-১০-এর উপ-অধিনায়ক মেজর আহমেদ হোসেন মহিউদ্দিন জানান, গত বৃহস্পতিবার প্রায় চার হাজার বোতল ফেনসিডিলসহ জব্দ করা পাজেরো জিপটিও চোরাই।

গত বছরের ২৯ মার্চ সাত মণ গাঁজা জব্দ করার কথা জানিয়ে ডিএনসির নরসিংদীর সহকারী পরিচালক (এডি) মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত থেকে গাঁজার বড় চালান আসছে। মাদক কারবারিরা ট্রাকে তুলা বা কাপড়ের মধ্যে বড় বস্তা ঢুকিয়ে নিয়ে আসে। কিছু চালান ঢাকায় ঢুকছে। কিছু চলে যাচ্ছে সিলেট এবং উত্তরাঞ্চলে।

ডিএনসি ও পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, আগে ফেনসিডিলের বড় চালান গাড়িতে সরবরাহ করা হলেও এখন কম পরিমাণে নেওয়া হচ্ছে। ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ঢুকছে ফেনসিডিল। জয়পুরহাট, নীলফামারী, লালমনিরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা এলাকা থেকে বেশি ফেনসিডিল ছড়িয়ে পড়ছে দেশে। আর ইয়াবার চালান আসছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে। আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কই ছিল দেশে ইয়াবা সরবরাহের একমাত্র রুট। তবে এখন চট্টগ্রামের সমুদ্রপথে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, বরিশাল ও খুলনায় চলে যাচ্ছে ইয়াবা। সেখান থেকে মহাসড়ক ও নৌপথে ছড়াচ্ছে অন্যান্য জেলায়।



মন্তব্য