kalerkantho


জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা

কুয়েত আমিরের অনুদান, নথির কপি দাখিল

আদালত প্রতিবেদক   

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কুয়েত আমিরের অনুদান, নথির কপি দাখিল

ফাইল ছবি

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে ওই অর্থ সৌদি আরব থেকে নয়, অনুদান হিসেবে দিয়েছিলেন কুয়েতের আমির। কুয়েত দূতাবাস থেকে প্রাপ্ত এসংক্রান্ত নথির সত্যায়িত কপি আদালতে দাখিল করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতে মামলায় যুক্তিতর্ক শুনানির সপ্তম দিনে খালেদা জিয়ার প্যানেল আইনজীবী সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী কুয়েতের ওই নথি আদালতে উপস্থাপন করেন।

এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘কুয়েতের অ্যাম্বাসি কর্তৃক একটি নথি দেওয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে এই টাকা কুয়েতের আমির প্রদান করেছিলেন। এটা ছিল জিয়াউর রহমানের নামে ব্যক্তিগত ট্রাস্ট গঠনের জন্য। এটি কোনো সরকারি ট্রাস্ট বা তহবিলে দেওয়া হয়নি।’

বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান দলিলটি গ্রহণ করেন। যাচাই-বাছাইয়ের পর দলিলে টাকার অঙ্ক উল্লেখ না থাকার কারণ জানতে চান তিনি। জবাবে খালেদা জিয়ার আইনজীবী বলেন, মামলার প্রয়োজনে ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট তাঁর করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই নথিটি সত্যায়িত করে কুয়েত দূতাবাস কর্তৃপক্ষ দিয়েছে। চাইলে বিচারক এ বিষয়ে একটি অনুসন্ধানের আদেশ দিতে পারেন।

ওই সময় বিচারক জানতে চান, কুয়েতের আমিরের পাঠানো টাকা জিয়াউর রহমানের নামে গঠিত ট্রাস্টে এসেছিল নাকি অন্য কোনো অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশে এসেছিল।

জবাবে খালেদার আইনজীবী বলেন, ‘এ মুহূর্তে এটি বিচার্য নয়, বরং এটা কী প্রাইভেট ট্রাস্ট না পাবলিক ট্রাস্ট সেটা নির্ধারণ করাই সংগত।’ তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের পিএস ছিলেন জগলুল পাশা। ওই সময় পিএসের প্রধানমন্ত্রীর ফাইল দেখার কোনো অনুমোদন ছিল না। সে কারণে সাক্ষী জগলুল পাশা তাঁর সাক্ষ্যে বলেছেন, তিনি জিয়া অনফানেজ ট্রাস্ট-সংক্রান্ত মূল নথি দেখেননি এবং খুঁজে পাননি। বরং স্মৃতি থেকে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেছেন।

আইনজীবী আরো বলেন, এতিমখানার জন্য টাকার উৎস সম্পর্কে কোনো ডকুমেন্ট দিতে পারেননি দুদক কর্মকর্তা। বরং অভিযোগপত্রে ঢালাওভাবে বলা হয়েছে এই টাকা এতিমদের জন্য আনা হয়েছে এবং টাকা এনে অসৎ উদ্দেশে ব্যবহার করা হয়েছে।

বিচারক ওই সময় আবারও জানতে চান, কুয়েত আমিরের পাঠানো অর্থ কোনো অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশে এসেছে? জবাবে এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ব্যাংক অ্যাকাউন্টেই অর্থ বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়।

শুনানি চলাকালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতকে বলেন, ‘সৌদি আরব থেকে এতিমদের সহায়তার জন্য আসা তহবিল আত্মসাতের উদ্দেশ্যে তৎকালীন সময়ে নবগঠিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে স্থানান্তর করা হয়েছে। উনারা জেরা থেকে না বলে নতুন নতুন কথা বলছেন। এ সময়ে এসব বলার সুযোগ নেই।’

এর জবাবে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমি যা বলছি তা মামলার নথি ও ৩২ জন সাক্ষীর বক্তব্য থেকেই বলছি। প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল বলতে কিছু নেই। আমি আশা করব আমার শুনানিকালে উনি ডিস্টার্ব করবেন না। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কোনো টাকা তিনি এনেছেন বা উত্তোলন করেছেন—এ ধরনের কোনো স্বাক্ষর নেই। সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমে এ মামলার নথি তৈরি করা হয়েছে। সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী এ মামলা গ্রহণের সুযোগ ছিল না।’

এদিকে আদালতের কার্যক্রম শেষে খালেদার আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, খালেদার মামলার নথিগুলো ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। দুদক এ মামলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের যে তথ্যসংবলিত নথি উপস্থাপন করেছে, সেখানে কোনো মূল কপি নেই। ছায়ানথি সৃজন করে তা এ মামলার নথিতে শামিল করা হয়েছে। সাক্ষ্য আইনে তার কোনো মূল্য নেই। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাতজন সাক্ষী তাঁদের সাক্ষ্যে বলেছেন, মূল নথি খুঁজে পাওয়া যায়নি। যদি মূল নথি খুঁজে না পাওয়া যায় তবে ন্যায়সংগতভাবেই ধরে নেওয়া হবে, কোনো নথিই ছিল না অথবা নথিগুলো লুকানো হয়েছে তা খালেদার বিপক্ষে প্রমাণ করা যাবে না বলে।

বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের প্যারেড মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে মামলার বিচার চলছে। শুনানি শেষ না হওয়ায় আগামী ১০ ও ১১ জানুয়ারি পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে।

গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে আদালতে হাজির হন খালেদা জিয়া। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। যুক্তিতর্ক শুনানিতে খালেদার প্যানেল আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী তৃতীয় দিনের মতো তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এদিনও তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেননি। মধ্যাহ্ন বিরতির পর বিকেল ৩টা পর্যন্ত শুনানি শেষে কার্যক্রম মুলতবি ঘোষণার পর খালেদা জিয়া আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন।

এ মামলার যুক্তিতর্ক শুনানিতে এর আগে খালেদার প্যানেল আইনজীবী আবদুর রেজাক খান ও খন্দকার মাহবুব হোসেন বক্তব্য উপস্থাপন সম্পন্ন করেন।

গতকাল আদালত ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। 

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, সানাউল্লাহ মিয়া, মো. মাসুদ আহমেদ তালুকদার, নুরুজ্জামান তপনসহ শতাধিক আইনজীবী গতকাল শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করেছিল দুদক। ২০১০ সালের ৫ আগস্ট চার্জশিট দাখিল করা হয়।

 

 



মন্তব্য