kalerkantho


বিশেষ সাক্ষাৎকার

কোনো রায় কিন্তু সংবিধান সংশোধন করতে পারে না

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কোনো রায় কিন্তু সংবিধান সংশোধন করতে পারে না

আনিসুল হক, আইনমন্ত্রী

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। তিনি একজন প্রতিথযশা আইনজীবীও। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি রয়েছে তাঁর। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী। এ ছাড়া জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় প্রধান আইজীবী, ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান আইনজীবী এবং পিলখানা হত্যা মামলাসহ অসংখ্য মামলায় অন্যতম আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর আইন ও বিচার বিভাগে দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটেছে। বিচার বিভাগের চলমান ইস্যুসহ নানা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন আশরাফ-উল আলম ও রেজাউল করিমের সঙ্গে।

কালের কণ্ঠ : সংবিধানের ষোড়শ

 সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের রায় বাতিল চেয়ে রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এ নিয়ে আপনার বক্তব্য—

আনিসুল হক :  রাষ্ট্রপক্ষ এ নিয়ে রিভিউ দাখিল করেছে। রিভিউ দাখিল করার পর এটি একটি সাবজুডিশ (বিচারাধীন) বিষয় হয়ে গেছে। সে জন্য আমি ওইটা সম্পর্কে কোনো কমেন্ট করতে চাই না।

কালের কণ্ঠ : ষোড়শ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের আপিল খারিজ হওয়ার পর উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের, নাকি জাতীয় সংসদের হাতে?

আনিসুল হক : এ নিয়ে আপিল বিভাগে রিভিউ পিটিশন দাখিল হয়ে গেছে। আমি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। মন্তব্য করা সাবজুডিশ হবে। আমি এইটুকু বলতে পারি, কোনো রায় কিন্তু কনস্টিটিউশন (সংবিধান) সংশোধন করতে পারে না। কনস্টিটিউশন সংশোধন করার একমাত্র এখতিয়ার জাতীয় সংসদের। এটি কিন্তু কেউ নিয়ে যেতে পারে না। সেইটা কেউ নেয় না। এইটুকু ঠিক, ওনারা একটি রায় দিয়েছেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী আল্ট্রা ভায়ার্স টু দ্য কনস্টিটিউশন’। এই রায় এখন রিভিউ হচ্ছে। এই রায় এখন পর্যন্ত স্টে (স্থগিত) হয়নি। ওনারা যে বলেছেন সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ২, ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭ রি-স্টোর করে দিলাম, এটি পারে না। সংবিধান বলে যে এটি সম্ভব নয়।

কালের কণ্ঠ : দেশে এখন অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি আছেন, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ কবে হতে পারে?

আনিসুল হক : দেখেন, আমি একটি কথা বলি, আমাদের সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে বলা আছে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টি একমাত্র মহামান্য রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার। মহামান্য রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন রাষ্ট্রের এক নম্বর ব্যক্তি। তিনি কবে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন তা আমি জানি না। আর কত দিনের মধ্যে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে, সে ব্যাপারে সময়ের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এটি রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার। সত্যিই আমার এ বিষয়ে কিছু জানা নেই। তবে আমিও আশা করছি, এটি শিগগিরই করা হবে।

কালের কণ্ঠ : বর্তমানে প্রধান বিচারপতি নেই। এটি কোনো সংকট কি না?

আনিসুল হক : এটি কোনো সমস্যা না। প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে বা পদত্যাগ করলে কী হবে বা কে দায়িত্ব পালন করবেন, তা সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে। এ কারণে যখন সাবেক প্রধান বিচারপতি ছুটিতে গেলেন, তখন বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে রাষ্ট্রপতি দায়িত্বরত প্রধান বিচারপতি করেন। এখন রাষ্ট্রপতি সময় অনুযায়ী নিয়োগ দেবেন। কিন্তু কত দিনের মধ্যে তাঁকে নিয়োগ দিতে হবে, এর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি যখন মনে করবেন, তখন দেবেন। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টি যেহেতু একেবারেই রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার, তাই এ ব্যাপারে আইন মন্ত্রণালয়ের বলার কিছু নেই।

কালের কণ্ঠ : আপিল বিভাগে বিচারক সংকট। এখানে বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে কী ভাবছে সরকার?

আনিসুল হক : এটি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব। তবে আমি মনে করি, প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পরপরই আপিল বিভাগে বিচারপতির যে স্বল্পতা রয়েছে তা পূরণ করা হবে।

কালের কণ্ঠ : বিচার বিভাগ এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে বলে আপনি কি মনে করেন?

আনিসুল হক : আমি মনে করি, বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং এটিও মনে করি যে এই সরকারের আমলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যেভাবে রক্ষা করা হয়েছে, আগের সরকারগুলোর আমলে, অর্থাৎ ১৯৭৫-এর পরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সেইভাবে ছিল না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থায় বিশ্বাসী। একটি উন্নয়নশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি, আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার এবং আইনের দৃষ্টিতে সমতা নিশ্চিত করেছে। বর্তমান সরকার জনগণের বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করছে।

কালের কণ্ঠ : কোনো কোনো পক্ষ বলছে, বিচার বিভাগের কাঁধে বন্দুক রেখে বর্তমান সরকার সব কিছুই করতে চায়।

আনিসুল হক : বিচার বিভাগের কাঁধে বন্দুক কেমন করে ধরতে হয়, ওনাদের সময় কী হয়েছে সেগুলো দেখলেই বোঝা যায় তাঁদের কথা কতটা সত্য। ওনারা কী করেছেন? বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। পরিবারসহ তাঁকে হত্যা করার পর ওনারা ইনডেমনিটি আইন করে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করেছেন। যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, তাদের ওনারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বানিয়েছেন। আবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসন করেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার কোনো মামলা তাঁরা নিতে দেননি। ওনারা বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ওনারা রক্ষা করেছেন আর আমরা ক্ষতি করেছি। ওনাদের মুখে এসব কথা সাজে না।

কালের কণ্ঠ : সম্প্রতি অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা করা হয়েছে। একটি পক্ষ অভিযোগ তুলেছে, সেখানে পুরো নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতেই রাখা হয়েছে।

আনিসুল হক : সরকারের হাতে কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে এই শৃঙ্খলাবিধি করা হয়েছে। সংবিধানবিধি করার জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, সে অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এই শৃঙ্খলাবিধি করেছেন, সেটি সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে আলোচনা করেই। সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ কিন্তু অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে একটি ঐকমত্যে পৌঁছে এই শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। বিচারপতি এস কে সিনহা এই বিধিমালা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছিলেন। এই শৃঙ্খলাবিধি নিয়ে অনেক নাটক হয়েছিল। আমি বলব, বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। একজন ব্যক্তির এটিকে রাজনৈতিকীকরণ করার চেষ্টার কারণে এটা বিলম্বিত হয়েছিল। সেটা যখনই রিমুভড হয়ে গেছে, আমরা কিন্তু বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের ঐকমত্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে গেজেট করতে পেরেছি। কিছু প্রতিকূলতা আছে। এই প্রতিকূলতাগুলো কিন্তু আমরা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। একটু সময় হলে আমি মনে করি অনেক প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পারব। নতুন বিধিমালায় এমনও বলা আছে, বিচারকদের নিয়ন্ত্রণে সুপ্রিম কোর্ট ও রাষ্ট্রপতির মতামতের ক্ষেত্রে যদি কোনো মতভেদ দেখা দেয় তাহলে সেটা আবারও পরীক্ষা করা হবে। এর পরও বিরোধ থাকলে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ প্রাধান্য পাবে। এটি শৃঙ্খলাবিধির ২৯(২) উপবিধিতে বলা আছে। তাহলে সুপ্রিম কোর্টই তো বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের সব ক্ষমতার অধিকারী। অযথা বিষয়টিকে ঘোলা করা হচ্ছে। মাসদার হোসেন মামলার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়েছে। বিচারকদের অসদাচরণের বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে বিধিমালায়। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ ছাড়া শাস্তি দেওয়া যাবে না কোনো বিচারককে। কাজেই বিচারকদের স্বার্থপরিপন্থী কিছু ইচ্ছে করলেই করা সম্ভব নয় কারো পক্ষে।

কালের কণ্ঠ : সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘হাইকোর্ট বিভাগের অধস্তন সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালের উপর উক্ত বিভাগের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা থাকিবে।’ এই বিধান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না?

আনিসুল হক : আমি আপনাদের বলি, ‘সুপারিনটেনডেন্স পাওয়ার’-এর মানে কী? তারা সুপারভিশন করবে। হাইকোর্টের বিচারপতিরা এই সুপারভিশন চালাবেন। এখানে হাইকোর্টের বিচারপতিরা যাবেন, আপিল বিভাগের বিচারপতিরা যেতে পারবেন না; এটিই হচ্ছে স্পষ্ট। এই সুপারিনটেনডেন্সের পরে রিপোর্ট বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির কাছে দেবেন। তাই এটির সঙ্গে এই শৃঙ্খলাবিধির কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান নেই। শৃঙ্খলাবিধিটা কী? এটি হলো, এখানে কিছু নিয়ম-কানুন দেওয়া আছে শৃঙ্খলার জন্য; সেই সব বিধি যদি কেউ লঙ্ঘন করে তাহলে কিভাবে তাকে শাস্তির আওতায় নেওয়া হবে এবং কে কী করবেন এই শাস্তির ব্যাপারে, তা বলা আছে। 

কালের কণ্ঠ : বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে টানাপড়েনের বিষয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে কী বলবেন?

আনিসুল হক : বিচারিক কাজে বিচারক ও বিচারপতিদের ওপর কোনোভাবেই নির্বাহী বিভাগ কোনো হস্তক্ষেপ করে না। এটা আমরা করি না। এটা বাংলাদেশের কালচারে আগে যা ছিল, এখন তার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। সে জন্যই আমি মনে করি সংবিধানের ১১৬(ক) অনুচ্ছেদ, নির্বাহী বিভাগ বলেন, অন্যান্য বিভাগ বলেন, আমরা সম্পূর্ণভাবে মেনে চলছি। এ ছাড়া বিচার বিভাগের সঙ্গে সরকারের কোনো দূরত্ব নেই।

কালের কণ্ঠ : ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে জাতীয় সংসদে বেশ হৈচৈ হয়েছিল। এটি নিয়ে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল কি না?

আনিসুল হক : ষোড়শ সংশোধনীর রায় হওয়ার পর আবেগের কিছু প্রকাশ সংসদের ভেতরে হয়েছিল। সেটা যখন প্রকাশিত হয়েছে, নিশ্চয়ই কিছু কথা হয়তো কাউকে আঘাত করতে পারে। আমি বলতে চাই, ওই কথায় এটা বোঝায় না যে বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগ মুখোমুখি। সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে বলা হয়েছে, মূল সংবিধানে এই বিধান ছিল। মূল সংবিধানের এই বিধানের কমা-দাঁড়ি কোনোটার পরিবর্তন না করে সেটাকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ১৯৭৭-৭৮ সালে মার্শাল ল ফরমান জারি করে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, সেটাকে পরিবর্তন করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে একটা সিদ্ধ আইনি তর্ক আছে যে অরিজিনাল কনস্টিটিউশন ইজ অ্যাভাব জুডিশিয়াল রিভিউ। এটা একটা আর্গুমেন্ট। আমি সেই কথাটাই সংসদে বলেছিলাম। যেহেতু আমি আইনের মধ্যে ছিলাম, সেহেতু এটা আদালত অবমাননা হয়নি। তা ছাড়া সংসদের ভেতরে যা বলা হয়, তা আদালত অবমাননার বিচারের এখতিয়ারের মধ্যে আনা যায় না এবং সে বিষয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যায় না। এটি পার্লামেন্টে হতেই পারে।

কালের কণ্ঠ : কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে সরকার অসন্তুষ্ট হয়ে প্রভাব খাটিয়ে প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে।

আনিসুল হক : এটি সম্পূর্ণ মিথ্য কথা। তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়নি। তিনি একজন সাবালক ব্যক্তি, তাঁকে তো পদত্যাগে বাধ্য করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আমরা কেন তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করব। এমন কিছু হয়নি যে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে। ব্যাপারটা হচ্ছে দেখেন, এটি তো দিনের আলোর মতো পরিষ্কার ব্যাপার, এটা তারা মানতে পারে না। দেখেন, ব্যাপারটা হচ্ছে, আমি যতদূর জানলাম, সেটি হচ্ছে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির দুর্নীতির তথ্য তাঁর সহযোগী আপিল বিভাগের বিচারপতিদের দেখানোর পর তাঁরা তাঁকে কনফ্রন্ট করেন। আমরা দেখে এটি বের করেছি যে তাঁর বিরুদ্ধে যেসব দুর্নীতির অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, তা প্রাইমাফেসি সত্য। আপিল বিভাগের বিচারকরা তাঁকে বলেছেন, হয় অভিযোগের জবাব দাও নতুবা সরে যাও। সরে গিয়ে এগুলোর বিচারের মুখোমুখি হও। আর তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত এটি না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তোমার সঙ্গে বিচারকাজে বসব না। তিনি মনে করেছেন যে সরে যাবেন। এটি তো আর আমরা জোর করিনি। তাঁর ব্রাদাররা (বিচারপতিরা) এটি বলেছেন। এটি তাঁকে যখন বলা হয়েছে, তিনি অনেক রকম নাটক করেছেন। নাটক করে তিনি চলে গেছেন। তারপর তিনি পদত্যাগ করেছেন।

এর আগে আপনারা জানেন, সুপ্রিম কোর্ট প্রধান বিচারপতির দুর্নীতির বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করেন। সেখানে বলা আছে, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ পাঁচজন বিচারপতি পড়েছেন। এ বিষয়ে বলা আছে, ‘আপিল বিভাগের উল্লেখিত ৫ জন বিচারপতি মহোদয় এক বৈঠকে মিলিত হইয়া উক্ত ১১টি অভিযোগ বিশদভাবে পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ওই সকল গুরুতর অভিযোগসমূহ মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা মহোদয়কে অবহিত করা হইবে। তিনি যদি ওই সকল অভিযোগের ব্যাপারে কোন সন্তোষজনক জবাব বা সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হন তাহা হইলে তাহার সঙ্গে বিচারালয়ে বসিয়া বিচারকার্য পরিচালনা করা সম্ভব হইবে না। ওই সিদ্ধান্তের পর ওই দিনই বেলা ১১.৩০ ঘটিকায় মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা মহোদয়ের অনুমতি লইয়া উল্লেখিত ৫ জন বিচারপতি মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয়ের বাসভবনে তাহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া অভিযোগসমূহ লইয়া বিশদভাবে আলোচনা করেন। উক্ত দীর্ঘ আলোচনার পরও তাহার নিকট হইতে কোন প্রকার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বা সদুত্তর না পাইয়া আপিল বিভাগের উল্লেখিত মাননীয় ৫ জন বিচারপতি তাহাকে সুস্পষ্ট করে জানাইয়া দেন যে, এমতাবস্থায় উক্ত অভিযোগসমূহের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তাহার সঙ্গে একই বেঞ্চে বসিয়া তাহাদের পক্ষে বিচারকার্য পরিচালনা করা সম্ভব হইবে না।’ তারপর তিনি (এস কে সিনহা) নানা নাটক করে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করলেন।

কালের কণ্ঠ : বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে অভিযোগ তার বিচার করতে আপনাদের কী করণীয় রয়েছে?

আনিসুল হক : শোনেন, আইন চলবে আইনের নিজস্ব গতিতে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে, সেগুলো দেখার এখতিয়ার দুদকের। আমি আবারও বলব, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কোনো ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে নয়। দুদক আইন অনুযায়ী অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান করা যাবে। এর সত্যতা পাওয়া গেলে মামলা হবে। এরপর তদন্ত হবে। এরপর প্রশ্ন আসবে সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে এই আইনি প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা হবে। এ আইনে যা বলা আছে তাই করা হবে। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে তার প্রায় সবই দুদক আইনের আওতায়। তাই আপনারা বুঝতেই পারেন কে এর অনুসন্ধান বা তদন্ত করবে।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু দুদক বলেছে, কেউ প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে সেটি খতিয়ে দেখা হবে।

আনিসুল হক : তাহলে আমি বলব যে দুদক যে কথা বলেছে, এই যে পদ্মা ব্রিজ সম্পর্কে যে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করল, সেটি কিন্তু তারা সুয়োমোটো (স্বপ্রণোদিত) হয়ে করেছিল। কেউ অভিযোগ করেনি। এ রকম নজির আমি দেখাতে পারব। এটি অভিযোগ করা না করার ব্যাপার নয়। আমি এটুকু বলব, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। (পরবর্তী অংশ আগামীকাল)



মন্তব্য