kalerkantho


ঢাকায় ফের মশার আগ্রাসন

বাজেট বাড়ে, ওষুধের দেখা মেলে না

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাজেট বাড়ে, ওষুধের দেখা মেলে না

রাজধানীর বনশ্রী এলাকার বি-ব্লকের ৭ নম্বর সড়কের ৪০/৩ নম্বর বাসায় বসবাস করেন গৃহিণী রীতা রানী দাস। গত ২ ডিসেম্বর তিনি প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে ভর্তি হন। পরীক্ষায় ধরা পড়ে ডেঙ্গু। রীতা দাসের সঙ্গে কথা বলে কালের কণ্ঠ জানতে পারে, বাসায় এত মশা যে কোনো প্রতিরোধব্যবস্থাই কাজ করছে না। তাঁর ভবনের আরেক বাসিন্দা শরিফুল ইসলামেরও অভিযোগ অভিন্ন। গত বছর একবার চিকুনগুনিয়ায় ভোগার পর কিছুদিন আগে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। বনশ্রী শুধু নয়, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে মশাবাহিত রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ভয়ে অনেকে দিনের বেলায় মশারি টানাচ্ছে। সমস্যাটি দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর হলেও কর্তৃপক্ষের তরফে সুখবর নেই। কয়েক মাস আগে চিকুনগুনিয়ার ব্যাপক আগ্রাসনের পর অনেক উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও মাঠপর্যায়ে তাদের তৎপরতা দৃশ্যমান নেই। রাজধানীবাসীর অভিযোগ, মশার ওষুধ ক্রয়, মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও স্প্রে, সংশ্লিষ্ট মনিটরিং কমিটিসহ সব পর্যায়ে অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে। এর ফলে দুই করপোরেশনের বরাদ্দ দেওয়া অর্থ ব্যয় করেও আশানুরূপ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) খান মোহাম্মদ বিলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মশক নিধনের জন্য এবারের বাজেটে আমাদের অর্থ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এ কাজে কিছুটা সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যে পরিমাণ এলাকা বেড়েছে বা মশার উৎপত্তিস্থল যে হারে বাড়ছে আমাদের লজিস্টিক সাপোর্ট সেভাবে বাড়ানো যাচ্ছে না। মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য জনবল একেবারে কম। যাঁরা আছেন অনেকেই বৃদ্ধ হয়ে গেছেন।

তাঁদের পক্ষে পুরোপুরি কাজটি করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া ২০১৬ সালের অর্গানোগ্রামে ১৫০ জন নিয়োগের সুপারিশ থাকলেও তা বাতিল হয়ে গেছে। প্রশাসনিক জটিলতার জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতেও নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘১ জানুয়ারি থেকে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। আমাদের যে পরিমাণ জনবল ও অন্যান্য সাপোর্ট রয়েছে তা নিয়েই সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। আর এ কাজে স্বচ্ছতা আনার জন্য স্থানীয় কাউন্সিলরদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ডিএসসিসির বাজেট ছিল ১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সংশোধিত বাজেটে বাড়িয়ে ১১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা করা হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেট ছিল ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তবে চলতি অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১০ কোটি টাকা এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৪  কোটি টাকা বাজেট ছিল। বাজেট ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাড়িয়ে ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা করা হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে তা কিছু কমিয়ে ২০ কোটি টাকা করা হয়। এ ছাড়া দুই করপোরেশনে আলাদাভাবে কচুরিপানা ও আগাছা পরিষ্কার, ফগারসহ অন্যান্য মেশিন সরবরাহের জন্য পৃথক অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।

গত বছরের মাঝামাঝি ঢাকা মহানগরে মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর ২৩টি এলাকাকে চিকুনগুনিয়ার জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এ জরিপে ছিল—ধানমণ্ডি ৩২, ধানমণ্ডি ৯/এ, উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টর, মধ্য বাড্ডা, গুলশান-১, লালমাটিয়া, পল্লবী, মগবাজার, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, রামপুরা, তেজগাঁও, বনানী, নয়াটোলা, কুড়িল, পীরেরবাগ, রায়েরবাজার, শ্যামলী, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর, মনিপুরিপাড়া, মোহাম্মদপুর, মহাখালী, মিরপুর-১ ও কড়াইল বস্তি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, মশক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কাজ হলো—যেসব স্থানে মশা জন্ম নেয় সেগুলো ধ্বংস করা। এ কাজে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত অর্থের বাজেটও রয়েছে। কিন্তু এ কাজ সঠিকভাবে করা হচ্ছে না বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে।

মশা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত জলাশয় ও নর্দমা পরিষ্কার করার কথা রয়েছে। ঢাকার দুই করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে সপ্তাহে চার দিন দুই শিফটে ৩২ জন ফগার মেশিন নিয়ে কর্মরত থাকার কথা। ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তরের সাত শর বেশি শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। কিন্তু মশক নিধন শ্রমিকরা সঠিকভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। মশার ওষুধ ক্রয়, মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও মাঠপর্যায়ে স্প্রে করা পর্যন্ত তেমন কোনো মনিটরিং থাকে না কর্তৃপক্ষের। ওষুধের মান যাচাইয়ের জন্য সিটি করপোরেশনের ১১ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি রয়েছে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে কাজের সঠিক তদারকির জন্য প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (দ্বিতীয় গ্রেড) থাকলেও তাঁরা মাঠে কখনো যান না। এ ছাড়া কীটনাশক আমদানি, উৎপাদন, সংরক্ষণ, ক্রয়-বিক্রয়ে সরকারের ‘দ্য পেস্টিসাইড রুলস ১৯৮৫’ মেনে চলার নিয়ম থাকলেও বেশির ভাগ সময় কর্তৃপক্ষ তা মানছে না।

গৃহিণী রিতা রানী দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিয়মিত বাসায় ওষুধ স্প্রে করি। রাতে মশারিও টানাই।। এর পরও রক্ষা পেলাম না। ডেঙ্গু হওয়ার পর এমন পর্যায়ে গেছে পাঁচ ব্যাগ রক্ত নিতে হয়। শারীরিক ও আর্থিক দুইভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আর কী করলে মশার হাত থেকে বাঁচতে পারব আমার জানা নেই।’ একই ভবনের আরেক বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, গত ৪ ডিসেম্বর থেকে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৌচাকের ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হই।  আট দিন থেকে বাসায় ফিরেছি। এখনো ভালোভাবে দাঁড়াতে পারি না। শরীরে ব্যথা অনুভূত হয়। এ ছাড়া শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে।’ তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘কয়েক মাস আগেই চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ সময় ভুগেছি। একটি রাজধানী শহরে মশা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো ভাবনা আছে বলে আমার মনে হয় না।’

মশার উৎপাতের অভিযোগ করেন বনানী ১৫ নম্বর রোডের ২২ নম্বর বাসার তত্ত্বাবধায়ক মো. রাশেদ। তিনি বলেন, সারা বছরই মশার উৎপাত থাকে। তবে সম্প্রতি অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বাসার ভেতরে ও বাইরে সব জায়গায় উৎপাত অনেক বেড়ে যায়। সিটি করপোরেশনের লোকজন মাঝেমধ্যে ওষুধ ছিটানোর পরও মশা খুব একটা কমে না।’ এ ধরনের অভিযোগ রাজধানীর অনেক বাসিন্দার কাছ থেকে পাওয়া যায়। এ অবস্থায় কেউ কেউ ব্যক্তিভাবে সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রমে জড়িত কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মশার ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থাও করছেন বলে জানা যায়।



মন্তব্য