kalerkantho


আসক্ত ৫০ হাজার

মাদকের তালিকায় ঢুকছে সিসার নাম

এস এম আজাদ ও ফারজানা লাবনী   

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মাদকের তালিকায় ঢুকছে সিসার নাম

রাজধানীসহ দেশের বিভাগীয় শহরে অনেক রেস্তোরাঁয় এখন ‘হুঁকা’ ব্যবহার করে মাদক সেবন চলছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হচ্ছে ‘সিসা

লাউঞ্জ, কেউ কেউ বলছেন ‘সিসা বার’। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীতে সিসাসেবীর সংখ্যা এখন ৫০ হাজারেরও বেশি।

বারবার সিসা বার নিয়ে বিতর্কের পর নিয়ন্ত্রণে না এলেও বেড়েছে ব্যবসা। এখন সিসা বারের সংখ্যা দেশে দুই শতাধিক। এর মধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ১০৪টির তালিকা করেছে। সিসাসেবীদের মধ্যে ১৫ হাজার ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত। শুরুতে উচ্চবিত্ত ঘরের কিছু বিপথগামী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সিসা সেবনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে সর্বস্তরে। তারা সিসা সেবনকে নিজেদের আভিজাত্য ও স্মার্টনেস বলে মনে করছেন। সরেজমিন দেখা যায়, শীতের সময় সিসা বারগুলোতে এখন ভিড় আরো বেড়েছে।

হুঁকার আদলে এই মাদকের প্রচলন নিয়ে এরই মধ্যে ব্যাপক উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। কারণ সেখানে গিয়ে ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইন সেবনে অভ্যস্ত হয়েছে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় এমনিক স্কুল স্তরের শিক্ষার্থীরা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঊর্ধ্বতন সূত্র মতে, কয়েক বছর ধরেই ব্যবসায়ী নেতারা অভিযোগ করে আসছেন যে সিসা বারে গিয়ে তাঁদের সন্তানরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। অনেকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে অভিযোগও করেছেন। তবে রেস্তোরাঁগুলোতে রাখঢাক ছাড়াই সিসা বিক্রি করা হচ্ছে। হুঁকার মতো দেখতে যন্ত্রের সঙ্গে পাইপে মাদক মেশানো সিসা ব্যবহারে ৫০০-৭০০ থেকে দুই হাজার/আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত দাম ধরা হয়।

ডিএনসির এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চার বছর পর কিছু সুপারিশ নিয়ে এখন ভাবা হচ্ছে। এ কারণেই সিসাকে মাদকের আওতায় নিতে আইনের খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে। অভিযান বা নজরদারি চাইছে এনবিআর।’ ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, সিসায় ‘ট্রেটাহাইড্রোক্যানাবিনল’ নির্জাস ব্যবহার করা হয়। আমেরিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে ‘ট্রেটাহাইড্রোক্যানাবিনল’ ‘ক’ ক্যাটাগরির মাদক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করে। মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস এবং দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে। ধূমপান হিসেবেও সিসা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। একটি সিসার সেশনে (পর্যায়) বের হওয়া ধোঁয়ার পরিমাণ ১০০টি সিগারেটের সমান। এর মধ্যে উচ্চমাত্রার টক্সিন, কার্বন মনো-অক্সাইড, হেভি মেটালসহ ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান থাকে।

চার বছর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি তদন্ত কমিটি সিসা বারগুলো বন্ধ করা, মাদক বলে ঘোষণা করা; বার স্থাপনে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা এবং কম বয়সীদের এই বারে প্রবেশ নিষিদ্ধ করাসহ ১০টি সুপারিশ করেছিল। দেরিতে হলেও এবার সেসব সুপারিশের বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। সম্প্রতি ডিএনসি মাদকদ্রব্য আইনে সিসাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আইনের খসড়া প্রস্তাব দিয়েছে ডিএনসি। গত ১০ ডিসেম্বর সিসা বারগুলোতে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধ কী বিক্রি হচ্ছে তা দেখার জন্য অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনআির) মূল দপ্তর। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে এবং ভ্যাট (ভ্যালু এডেড ট্যাক্স) বা মূসক (মূল্য সংযোজন কর) গোয়েন্দা দপ্তরে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রধানত ডিএনসির সহযোগিতা নিয়ে সিসার রেস্তোরাঁগুলোতে অভিযান চালাতে হবে। এনবিআর ও ডিএনসির একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, অবৈধভাবে, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে সিসা বারগুলো চলছে বলে প্রমাণ মিলেছে। এ কারণে নজরদারির জন্য সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মাদকের আওতাভুক্ত করা হলে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অচিরেই অভিযানে নামব। কারা সিসা বিক্রি করছে, কোথা থেকে সংগ্রহ করছে, সিসার সঙ্গে কী ধরনের মাদক মেশানো হচ্ছে তা কঠোর নজরদারি করা হবে। অনিয়ম পাওয়া গেলে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। মাদক মেশানো সিসা ব্যবহারকারীদেরও শাস্তির আওতায় আনা হবে।’

কয়েকজন সিসাসেবীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্কুল-কলেজ, কোচিং বা বাসা-বাড়ির কাছাকাছি রেস্তোরাঁয় কিশোর-কিশোরী একা, বন্ধু-বান্ধবী বা পরিচিতজনদের নিয়ে ফাস্ট ফুড বা মজাদার দামি খাবার খেতে গেলে ওই কিশোর-কিশোরীদের টার্গেট করা হয়। এ ক্ষেত্রে রেস্তোরাঁয় খাবার সরবরাহকারীরা, ‘একবার টান নিয়ে দেখেন কেমন লাগে, একবার নিয়ে দেখেন ভালো লাগবে বা অনেকেই ত নেয় আপনি নেবেন না! নিলে স্মার্ট লাগবে!’ এই জাতীয় কথা বলে আকর্ষণ তৈরি করে সিসা ধরিয়ে দেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরীকে না জানিয়ে প্রথম অবস্থায় গোপনে সিসার সঙ্গে ইয়াবা, গাঁজা বা ভয়াবহ মাদক মিশিয়ে দেওয়া হয়। এতে বারবার খাওয়ার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। পরবর্তী সময় আসক্ত হয়ে পড়লে কিশোর-কিশোরী জেনেশুনে মাদক মেশানো সিসা উচ্চ মূল্যে সেবন করে। সিসা সেবনের স্থানটিতে মদের বারের মতো গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। এ কারণে সেখানে অনেকে ইয়াবা সেবনের সুযোগ পাচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বারবার সিসা বার নিয়ে বিতর্কের পর নিয়ন্ত্রণ না এলেও বেড়েছে ব্যবসা। এখন সিসা বারের সংখ্যা দুই শতাধিক। এর মধ্যে ডিএনসি ১০৪টির তালিকা করেছে। তালিকায় আছে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের অ্যারাবিয়ান নাইটস, ফুড কিং, ধানমণ্ডির সেভেন টুয়েলভ লাউঞ্জ, ডমিনেন্স পিজা, কিউ কিউ টি অ্যান্ড লাউঞ্জ, এইচ টু ও লাউঞ্জ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, ঝাল লাউঞ্জ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, গুলশানের এক্সিট লাউঞ্জ, জোন জিরো লাউঞ্জ, মাউন্ট আল্ট্রা লাউঞ্জ, জাবেদ কাড লাউঞ্জ, ক্লাব অ্যারাবিয়ান, হাবুল-বাবুল, বনানীর মিলাউন্স, ডকসিন, কফি হাউস, বেইজিং লাউঞ্জ, মিট লাউঞ্জ, সিক্সথ ফ্লোর, বেইলি রোডের থার্টি থ্রি ও খিলক্ষেতের হোটেল রিজেন্সি অন্যতম। এসব লাউঞ্জের ছোট ছোট কেবিনে আধো-আলোতে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। হালকা মিউজিক তৈরি করে এক স্বপ্নময় মাদকতাপূর্ণ পরিবেশ।

সূত্র জানায়, সন্দেহ তৈরি হওয়ার পর ২০১৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব মাইনউদ্দিন খন্দকারকে সভাপতি করে আট সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি সিসা বারের পরিস্থিতি দেখে ১০টি সুপারিশ করে, যার একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। মূল সুপারিশ ছিল, সিসাকে মাদকদ্রব্য হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা এবং ২৫ বছরের কম বয়সী বাংলাদেশি কোনো তরুণ-তরুণীকে সিসা বারে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা। যত্রতত্র যেন সিসা বার স্থাপিত হতে না পারে সে জন্য লাইসেন্স প্রথা প্রবর্তনের কথাও বলা হয়। বিদেশি ভ্রমণকারীদের সুবিধার্থে পাঁচতারা হোটেল ছাড়া আর কোথাও এই বার স্থাপনের অনুমতি না দিতেও সুপারিশ করা হয়। বিদ্যমান সিসা বারগুলো অবিলম্বে বন্ধ করে দিতে সুপারিশ করেছিল তদন্ত কমিটি।

ডিএনসির মহাপরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেসব রেস্তোরাঁয় প্রলোভনমূলক কথা বলে সিসা খেতে ডাকে, সেসব রেস্তোরাঁয় সিসার সঙ্গে মাদক মিশিয়ে বিক্রি করছে। বর্তমান আইনে সিসা মাদক হিসেবে চিহ্নিত না হলেও নতুন মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে সিসার ভয়াবহতা বিবেচনায় এনে মাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আমরা সংশোধনীতে দিয়েছি। আইনটি চূড়ান্ত হলে সিসা বিক্রি ও ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।’



মন্তব্য