kalerkantho


নামাপাড়া বস্তি

নেশাখোর ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য

ওমর ফারুক   

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নেশাখোর ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য

বস্তি নয়, এ মাদকের হাট; ছিনতাইকারীদেরও অভয়ারণ্য। ইয়াবা পাইকারি পাওয়া যায়, খুচরা পাওয়া যায়—সবই প্রকাশ্যে। বিক্রিতে নামানো হয়েছে শিশু-কিশোর ও নারীদেরও। সেবনও চলে প্রকাশ্যে। গত সপ্তাহে রবিবার থেকে মঙ্গলবার তিন দিন রাজধানীর দয়াগঞ্জ এলাকার নামাপাড়া বস্তি ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভাসমান ছিনতাইকারী বা মাদকসেবীরা মাত্র ১০ টাকা দিয়ে বস্তিঘরে এক রাত থাকতে পারে।

প্রায় অর্ধশত বছর আগে থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের দয়াগঞ্জ এলাকার কাছে রেললাইনের দুই পাশে সরকারি জমি দখল করে গড়ে তোলা হয় বস্তিটি। তিন-চার শ ঘর রয়েছে। একেক সময় একেক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এখন রাজত্ব ‘মাদক সম্রাজ্ঞী রহিমা’র। তার স্বামী হযরত মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তবে তারা বস্তিতে থাকে না। বস্তিবাসী জানায়, প্রতিদিন প্যাকেট প্যাকেট ইয়াবা নিয়ে এসে তাদের সহযোগীরা বস্তির কয়েকজন মাদক কারবারির কাছে দিয়ে যায়, যা পরে খুচরা ও পাইকারি বিক্রি হয়।

গত সোমবার গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন শিশুর নেশায় ঢলো ঢলো অবস্থা। ১২-১৩ বছরের এক শিশু এগিয়ে এসে এই প্রতিবেদকের কাছে জানতে চায়, কোনো মাদক দরকার কি না। গাঁজা চাইলে সে জানায়, আগে বস্তিতে গাঁজা-হেরোইন বিক্রি হতো। এখন আছে ‘বাবা’ (ইয়াবা)। দাম নিয়েও কথা হয়। ছোট ইয়াবার দাম ১২০ টাকা, বড়টার আড়াই শ। দাম কমানোর কথা বললে সে উত্তর দেয়, ‘এক রেইট’। খাইতে চাইলে বলে, আখড়ায় গিয়ে খেতে হবে। বস্তির ভেতর দিয়ে এগিয়ে রেললাইন লাগোয়া একটি ঘরের সামনে গেলে সে চাপিয়ে রাখা দরজা খুলে ঢুকে পড়ে এবং একটি ইয়াবা নিয়ে আসে। শিশুটি তার নাম উল্লেখ করে ‘হাছান’, দুই ভাই-বোন, বাবা নেই। মা বাসাবাড়িতে কাজ করে। বস্তির পাশেই স্কুল থাকলেও হাছান যায় না। সে বলে ‘প্রথমে সিগারেট টানতাম। এরপর গাঁজা। এখন বাবা (ইয়াবা) খাই’। ‘বাবা’ না হলে তার চলে না। রোজ তিন-চারটা ইয়াবা বিক্রি করতে পারে; পাইকারি বিক্রেতা যে কমিশন দেয় তা দিয়ে মাদক সেবন করে। এক প্রশ্নের জবাবে হাছান বলে, ‘আমরা ছিনতাই করি না। বস্তিতে চার-পাঁচজন আছে, ওরা করে।’ তাদের নাম হাছান বলতে চায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফজরের আজানের পর চাকু নিয়ে বেরিয়ে পড়ে এই ছিনতাইকারীরা। রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশাযাত্রীদের কাছ থেকে নেশার টাকা জোগাড় করে। তাদের বক্তব্য সত্যি বলে জানালেন ওই এলাকার এক পুলিশ কর্মকর্তাও। তাঁর মতে সরকারের বড় ধরনের ভূমিকা ছাড়া এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না। কারণ শতাধিক ইয়াবাসেবীকে রোধ করা কঠিন। তাঁর মতে সরকারিভাবে তাদের মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রেখে সুস্থ না করে তুললে আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না।

দয়াগঞ্জে ছিনতাইকারীর হাতে শিশু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার সাব-ইন্সপেক্টর মো. রেদোয়ান খান বলেন, ‘ছিনতাইকারী রাজীবকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে দেখা গেছে এই বস্তিটিতে বহিরাগত অনেক লোক বসবাস করে।’ জানা যায়, বস্তির অন্তত অর্ধশত শিশু-কিশোর ইয়াবা সেবনের সঙ্গে যুক্ত। আছে তরুণ থেকে বয়স্করাও।

বাস্তির এক বাসিন্দার সহযোগিতা নিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে জুরাইন থেকে দয়াগঞ্জের দিকে বস্তি ঘেঁষে যাওয়া নতুন রাস্তার ফুটপাতে পাওয়া যায় এক ছিনতাইকারীকে। সে রোদে বসে ঢুলছিল, সম মাদক সেবনের পর। গল্পের ছলে জানা যায়, তার বাসা মিরপুর এলাকায়। শান্তিতে ‘বাবা’ টানতে পারে বলে প্রায়ই সে এই বস্তিতে আসে। ১০ টাকা দিয়ে বস্তি ঘরে রাতেও থাকা যায়। ছিনতাইয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে সে অস্বীকার করে। ইয়াবার টাকা কোথা থেকে পায় জানতে চাইলে সে এ প্রতিবেদকের দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকে। প্রতিবেদককে সহায়তাকারী বস্তির ওই বাসিন্দা জানান, তিনি রিকশা চালান। ৩৫ বছর ধরে এ বস্তিতে আছেন। এখন দুই শিশুসন্তান নিয়ে চিন্তিত। বস্তির বেশির ভাগ শিশুই মাদকাসক্ত বলে বুঝতে পারছেন না কত দিন সন্তানদের আগলে রাখতে পারবেন। তিনি জানান, পুলিশ মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের ধরলেও কয়দিন পরে তারা ফিরে আসে।

তাঁর কথার সত্যতা পাওয়া যায় গেণ্ডারিয়া থানার ওসি কাজী মিজানুর রহমানের কথায়। ‘আমরা অভিযান চালিয়ে ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের ধরে নিয়ে আসি। কিন্তু কিভাবে যেন ওরা জামিন নিয়ে বেরিয়ে এসে আবারও অপরাধে যুক্ত হয়।’ বলেন তিনি।

নাজমুল মিয়া ভাঙারি দোকান নিয়ে বসেছেন রেললাইনের ধারে। বয়স্ক এ ব্যক্তি জানান, ভোরে সদরঘাটে নামা লোকজন যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, শনির আখড়া যাওয়ার জন্য দয়াগঞ্জের সড়ক ব্যবহার করে। তাদের অনেকেই ছিনতাইয়ের শিকার হয়। পুলিশ দেখেও দেখে না। বস্তির বাসিন্দা ওই রিকশাচালক বলছিলেন, পুলিশ প্রায়ই অভিযান চালানোর সময় মাদক কারবারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলে যায়। ধরলেও থানায় না নিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দেয়। ফলে এ বস্তির অপরাধ দিন দিন বাড়ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের কাছে খবর রয়েছে কনস্টেবল থেকে প্রমোশন পাওয়া এএসআইরা বেশি দায়ী। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গেণ্ডারিয়া থানার ওসি কাজী মিজানুর রহমানের বক্তব্য হচ্ছে, ‘নামাপাড়া বস্তিটি গেণ্ডারিয়া, শ্যামপুর ও যাত্রাবাড়ী থানা এলাকার বর্ডার। সব থানার পুলিশই সেখানে দায়িত্ব পালন করতে যায়। নির্দিষ্ট করে না বললে কারা টাকা নেয় সেটা বলা যাবে না।’

এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এই বস্তিটিতে শতাধিক মাদকাসক্ত রয়েছে। এসব মাদকসেবী ছিনতাইকারীদের নিয়ে বেশ সমস্যায়ই পড়তে হচ্ছে পুলিশকে। তাদের ধরে নেওয়ার পর প্রকাশ্যে মল-মূত্র ত্যাগ করে। সাক্ষীর অভাবে তাদের আটকেও রাখা যায় না, জামিন হয়ে যায়। এই পুলিশ কর্মকর্তার মতে এ সমস্যা পুলিশ দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। সরকারের তরফ থেকে একটি বড় ধরনের নিরাময় কেন্দ্র খুলে তাদের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে না তোলা পর্যন্ত তারা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, ‘হয় মেরে ফেলতে হবে অথবা চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করতে হবে’। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যখনই কিছু হয় তখন পুলিশের কাঁধে এসে পড়ে সব। কেউ মূল জায়গায় হাত দিতে চায় না। বেসরকারি যেসব মাদক নিরাময়কেন্দ্র রয়েছে সেগুলোতে যে পরিমাণ টাকা খরচ লাগে সেই টাকা দিয়ে এসব বস্তিতে থাকা মাদকসেবীদের চিকিৎসা করা সম্ভব নয়।’

বস্তির এক বাসিন্দার সহযোগিতায় পাওয়া যায় বয়স্ক এক ইয়াবা বিক্রেতাকে। সে হাছানের মতো কিশোরদের হাতে ইয়াবা বিক্রির জন্য তুলে দেয়। নাম-পরিচয় না প্রকাশ করার শর্তে বলে, ‘এখানে মাদক বিক্রি হয় সেটা অনেকেই জানে। কাস্টমার দেখলেই আমরা বুঝতে পারি। অনেকে মোবাইল ফোনেও যোগাযোগ করে ইয়াবা নিতে আসে। রবিনের কয়েকজন লোক রয়েছে তারা কোথা থেকে জানি শত শত ইয়াবা নিয়ে আসে। আমার মতো আরো কয়েকজনকে প্রায় প্রতিদিনই ৩০-৪০টা ইয়াবাসহ একটি প্যাকেট দিয়ে যায়।’ এক প্রশ্নের জবাবে সে বলে, পুলিশকে ঘুষ না দিয়ে কোনো কাজ করা যায় না। পুলিশের সোর্স এই মাসোহারা নেয়। সে আরো বলে, দুবার ধরা পড়েছি। ‘আমাদের ছাড়িয়ে আনার লোক রয়েছে। রহিমা আপা ছাড়িয়ে আনে’। খোঁজ নিয়ে জানা গেল এই রহিমা বেগম মাদক সম্রাজ্ঞী হিসেবে পরিচিত। একসময় বস্তিতে বড় হলেও এখন অনেক টাকার মালিক। তার সঙ্গে রয়েছে প্রভাবশালীদের সখ্য। তাকে গ্রেপ্তার করেও আটকে রাখা যায় না। যাত্রাবাড়ীর পুলিশ সোর্স আসলাম শিকদার হত্যা মামলায় গত বছর সেপ্টেম্বরে ডিবি পুলিশ রহিমাকে গ্রেপ্তার করে। বেরিয়ে আবারও যুক্ত হয়েছে মাদক কারবারে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে এখন হন্যে হয়ে খুঁজছে। তবে সহযোগী বাচ্চু ও মাহিনুর বেগম কিছুদিন আগে ধরা পড়েছে। রহিমার বিষয়ে জানতে চাইলে গেণ্ডারিয়া থানার ওসি কাজী মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রহিমাকে গ্রেপ্তারের জন্য খোঁজা হচ্ছে, পাওয়া যাচ্ছে না।’

রাজধানীতে থাকা অন্যান্য বস্তিতে সাধারণত কেউ সরকারি জমি দখল করে ঘর বানিয়ে ভাড়া দিয়ে আয় করে। কিন্তু এ বস্তিটিতে কেউ ঘর ভাড়া দেয় না। জানতে চাইলে ত্রিশোর্ধ্ব বস্তির বাসিন্দা আনছার আলী কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁর জন্ম হয়েছে এই বস্তিতে। জন্মের পর থেকে দেখে এসেছেন কাউকে বাড়ি ভাড়া দিতে হয় না। বস্তির প্রবীণ বাসিন্দা রহিমা বেগম জানান, ৪০ বছর আগে তাঁরা সরকারি জায়গায় বাড়ি বানিয়েছেন। সেই থেকে তিনি বাড়ির মালিক। তিনি কাউকে ঘরভাড়া দেন না। তাঁর কাছ থেকেও কেউ ভাড়া নেয় না।


মন্তব্য