kalerkantho


২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

তারেক বাবর পিন্টুসহ ৪৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তারেক বাবর পিন্টুসহ ৪৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ

একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ৪৯ জনের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। ওই ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের দুটি মামলায় গতকাল সোমবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান এই আবেদন জানান।

রাজধানীর পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দীন রোডে সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিনের আদালতে এ মামলার বিচার চলছে।

রাষ্ট্র ও আসামিদের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হয় গত সপ্তাহে। আর গতকাল আইনি বিষয়ে যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।

আজ মঙ্গলবার থেকে আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হবে। পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবীরা শুনানি শুরু করবেন বলে বলা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের আদেশে।

দুটি মামলায় ২৫তম দিনে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান দাবি করেন, মামলার সব আসামির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অপরাধ স্বতন্ত্র, নিঃস্বার্থ, দালিলিক ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষীদের সাক্ষ্যে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন তাঁরা।

সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ‘ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিচার প্রার্থী মানুষের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে আইনের বিধানের আলোকে আসামিদের প্রত্যেককে সর্বোচ্চ সাজা প্রার্থনা করছি।’ উল্লেখ্য, এই মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

ওই দুই মামলায় মোট আসামি ৫২ জন। তবে জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও শরীফ সাইদুল আলম বিপুলের অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

বাকি ৪৯ আসামির মধ্যে তারেক রহমান, বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, মেজর জেনারেল (এলপিআর) এ টি এম আমিন, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারসহ ১৮ জন পলাতক। তবে বিএনপি নেতা লুত্ফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টুসহ ২৩ জন কারাগারে আছেন।

এ মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদাবক্স চৌধুরী, লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক এবং মামলার সাবেক তিন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির সাবেক এসপি রুহুল আমিন, সাবেক এএসপি আতিকুর রহমান, আবদুর রশিদসহ মোট আটজন জামিনে রয়েছেন।

গতকাল শুনানিকালে বঙ্গবন্ধু হত্যা, ভারতের রাজীব গান্ধী হত্যা, ঝালকাঠি আদালতের বিচারক জগন্নাথ পাড়ে ও সোহেল আহমেদ হত্যা মামলা এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী হত্যাচেষ্টা মামলার দৃষ্টান্তু তুলে ধরে প্রধান কৌঁসুলি এই মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চান। তিনি বলেন, ওই মামলাগুলোর সিদ্ধান্তের আলোকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে থেকে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণ করেছে।

সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ওই গ্রেনেড হামলার লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যা করা। এতে করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বশূন্য হতো। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নেতৃত্বশূন্য করে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার অসৎ উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হয়।

ওই গ্রেনেড হামলা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক, বিভিন্ন সরকারি ও প্রশাসনিক সহযোগিতার তথ্য-প্রমাণও গতকাল পেশ করে রাষ্ট্রপক্ষ। এতে তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয় বনানীর হাওয়া ভবন, আবদুস সালাম পিন্টুর তখনকার সরকারি বাসভবনসহ ষড়যন্ত্রমূলক সভার স্থানসমূহের তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ওই হামলার আরো অভিপ্রায় ছিল—স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী শক্তি বিএনপি-জামায়াত জোটকে স্থায়ী করার চেষ্টা। তা ছাড়া জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামীর (হুজি) কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে পরিচালনা করাও ছিল ওই হামলার আরেকটি লক্ষ্য।

সৈয়দ রেজাউর রহমান আরো বলেন, কাশ্মীর, পাকিস্তান ও মিয়ানমারভিত্তিক ভিনদেশি জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদীন, লস্কর-ই-তৈয়বা, তেহরিক-ই-জিহাদী ইসলাম, রোহিঙ্গা সলিটারিটি অরগাইজেশনের (আরএসও) জঙ্গি কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্ন করা এবং অসৎ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্যাদি মজুদ ও পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করারও অভিপ্রায় ছিল ওই হামলা।

রাষ্ট্রপক্ষ বলে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী, প্রভাবশালী শীর্ষস্থানীয় নেতা, প্রশাসনের প্রভাবশালী শীর্ষ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা পরস্পর যোগসাজশে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ঘটিয়েছেন।

এ মামলায় গত ২৩ অক্টোবর থেকে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। প্রধান কৌঁসুলিকে যুক্তিতর্ক পেশে আরো সহায়তা করেছেন আইনজীবী আকরাম উদ্দিন শ্যামল ও ফারহানা রেজা। এ ছাড়াও ছিলেন ঢাকা জেলা পিপি খন্দকার আবদুল মান্নান, বিশেষ পিপি মোশাররফ হোসেন কাজল, মো. আবু আবদুল্লাহ ভূঞা, আবুল কালাম আজাদ, মো. আমিনুর রহমান, আবুল হাসনাত, শেখ সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, কাজী ইলিয়াসুর রহমান, আশরাফ হোসেন তিতাস প্রমুখ।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। ওই হামলায় আইনজীবী-সাংবাদিকের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়।

এই ঘটনায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলা দিতে গেলে পুলিশ তখন সেই মামলা নেয়নি। এর আগে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করে। তখনকার সরকার মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে। নোয়াখালীর গ্রাম থেকে জজ মিয়া নামের এক যুবককে ধরে নিয়ে এসে আদালতে মিথ্যা জবানবন্দি আদায় করে।

পরে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে মামলাটির নতুন করে তদন্ত শুরু করে। এর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে অধিকতর তদন্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়। এতে বিএনপি নেতা তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, লুত্ফুজ্জামান বাবরসহ আরো অনেকের নাম আসে।



মন্তব্য