kalerkantho


খালেদাসহ শীর্ষ নেতারা মামলায় জেরবার

কয়েকটি মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে

এম বদি-উজ-জামান   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



খালেদাসহ শীর্ষ নেতারা মামলায় জেরবার

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে। এ মামলায় দুদকের আইনজীবী যুক্তি উপস্থাপনের পর খালেদার আইনজীবীরা যুক্তি উপস্থাপন করছেন। দু-এক মাসের মধ্যেই এ মামলায় যুক্তি উপস্থাপন শেষ হবে বলে আশা করছেন দুদকের আইনজীবী। এরপর রায় ঘোষিত হবে অথবা রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হবে।

এরপর শুরু হবে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন। এ দুটি মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষিত হবে। দুটি মামলারই বিচারকাজ শেষ পর্যায়ে বলে জানিয়েছেন দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিঞাও বলছেন, একটি মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ দুটি মামলায় রায় ঘোষণার ওপর নির্ভর করছে বিএনপির রাজনীতির ভবিষ্যৎস। মামলায় খালেদা জিয়া খালাস পেলে রাজনীতির গতিবিধি হবে এক রকম; আর সাজা হলে গতিবিধি হবে আরেক রকম।

শুধু খালেদা জিয়াই নয়, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, তারেক রহমান, কুমিল্লার সাবেক সংসদ সদস্য মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামালসহ বিএনপির বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার মামলায় বিচারকাজ শেষ পর্যায়ে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।

এ ছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধেও ৩৪টি মামলায় অভিযোগ গঠন হয়েছে। দ্রুত বিচার আইনের এবং নাশকতার অভিযোগের পাঁচটি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ২০১৮ সাল হবে বিএনপির রাজনীতির জন্য ‘টার্নিং ইয়ার’।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অন্তত একটি মামলায় রায় হবে নিম্ন আদালতে। নির্দোষ প্রমাণিত হলে কিংবা সাজা হলে উভয় ক্ষেত্রেই মামলার ফলাফল থেকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করবে বিএনপি। তাই ২০১৮ সাল বিএনপির রাজনীতির জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ বছর।’

এই আইন বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, ‘মামলায় যদি খালেদা জিয়া নির্দোষ প্রমাণিত হন তবে সেটা বিএনপির জন্য বড় নৈতিক জয় হবে। আর এটাকে পুঁজি করে তারা রাজনীতি করার চেষ্টা করবে। আবার সাজা হলে সে ক্ষেত্রে খালেদা জিয়াকে কারাগারে যেতে হবে। আর কারাগারে গেলে তারা জনগণকে একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করবে যে সরকারের অন্যায়-অত্যাচারের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এ থেকে বিএনপি রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করবে।’

নির্বাচনে সাজাপ্রাপ্ত নেতারা বরং সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন উল্লেখ করে ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘আমাদের দেশে কারাবন্দি রাজনৈতিক নেতাদের ব্যাপারে জনগণের সহানুভূতি ও সমবেদনা দেখানোর একটা লম্বা ইতিহাস রয়েছে।’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক রমনা মডেল থানায় ২০০৮ সালের ৩ জুলাই মামলা করে। এতে খালেদা জিয়া এবং তাঁর দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ সাতজনকে আসামি করা হয়। ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট এ মামলার অভিযোগপত্র দেয় দুদক। মামলাটি ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন। আরাফাত রহমান কোকো এরই মধ্যে মারা গেছেন। ফলে মামলায় আসামির সংখ্যা এখন ছয়।

অন্য আসামিরা হলেন : মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান। কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান মামলার শুরু থেকেই পলাতক।

এ মামলায় গত ১৯ ডিসেম্বর দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল যুক্তি উপস্থাপন করেন। পরদিন থেকে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা যুক্তি উপস্থাপন করছেন। এরই মধ্যে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও আবদুর রেজাক খান যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেছেন। সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলীর চলা যুক্তি উপস্থাপন শেষে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার যুক্তি উপস্থাপন করবেন। আগামী ৩ ও ৪ জানুয়ারি যুক্তি উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

এরপর অন্য আসামিদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হবে। যুক্তি উপস্থাপন শেষে আদালত রায় ঘোষণার দিন ধার্য করতে পারেন অথবা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখতে পারেন।

বিচারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হলে সে ক্ষেত্রে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় যুক্তি উপস্থাপন শুরু হবে। আর এ দুটি মামলা একই আদালতে বিচারাধীন থাকায় একই দিনে রায় ঘোষণা করা হতে পারে বলে মনে করেন কেউ কেউ। এ মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড হতে পারে।

দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে সক্ষম হয়েছি। আশা করছি, আদালত আসামিদের সাজা দেবেন।’

তবে খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিঞা বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্যই মিথ্যা অভিযোগে মামলা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হবেন বেগম খালেদা জিয়া।’

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা : ক্ষমতার অপব্যবহার করে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে কেনা জমির দাম কম দেখিয়ে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাৎস করার অভিযোগে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় এই মামলা করে দুদক। ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি খালেদাসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডাব্লিউটিএর কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।

অনেক নেতার বিরুদ্ধে অনেক মামলা : খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে শুধু এ দুটি মামলা নয়, তাঁর বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে আরো ৩৫টি মামলা রয়েছে।

এ ছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে ৮৪টি মামলা আছে। এর মধ্যে ৩৪টি মামলায় অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আর পাঁচটি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে। গত ২৩ অক্টোবর থেকে রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলায় যুক্তি উপস্থাপন শুরু করে। রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ পর্যায়ে। তাদের পরে আসামিপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন করবে। এরপর রায় ঘোষণা হবে।

তারেক রহমান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলারও আসামি; যে মামলার বিচারকাজ শেষ পর্যায়ে। এ ছাড়া মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগের একটি মামলায় এরই মধ্যে হাইকোর্ট তাঁকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ মামলায় তিনি পলাতক।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বিরুদ্ধে করা ১৮টি মামলার মধ্যে সম্পদ বিবরণীসংক্রান্ত দুদকের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।

বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে আটটি মামলার মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগের মামলায়।

সাবেক মেয়র ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ৯৪টি মামলা। এর মধ্যে সম্পদ বিবরণী, মিরপুরে সাংবাদিকদের জমি বরাদ্দসংক্রান্ত দুদকের মামলাসহ তিনটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে পাঁচটি দুর্নীতির মামলা, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনের বিরুদ্ধে ১৪টি, আবদুল আউয়াল মিন্টুর ১৬টি, আবদুল্লাহ আল নোমানের ১১টি, রুহুল কবীর রিজভীর ৫৬টি, বরকতউল্লা বুলুর ১১২টি, জয়নুল আবদিন ফারুকের ২০টি, আমানউল্লাহ আমানের ২১২টি, মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের ১২২টি, অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিঞার তিনটি, কক্সবাজারের সালাউদ্দিন আহমদের ৩০টি, হাবিব উন নবী খান সোহেলের ২৯০টি, সাইফুল ইসলাম নিরবের ২১৮টি, এম এ কাইয়ূমের বিরুদ্ধে জাপানি নাগরিক হত্যাসহ ১৫৫টি, ব্যারিস্টার কায়সার কামালের পাঁচটি, সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর ২১৫টি এবং মামুন হাসানের বিরুদ্ধে ২০২টি মামলা বিচারাধীন।

এর মধ্যে প্রায় সবার বিরুদ্ধেই একাধিক মামলায় অভিযোগ গঠন হয়েছে। ঢাকার বাইরে প্রতিটি জেলায় সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা বিচারাধীন।


মন্তব্য