kalerkantho


অসময়কে পেছনে ফেলতে শাজাহানের দৌড়

অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অসময়কে পেছনে ফেলতে শাজাহানের দৌড়

তলস্তয়ের ‘কতটুকু জমি চাই’ গল্পের লোভী পাহোম এক প্রহর সামনে রেখে দৌড় শুরু করেছিলেন, যত দূর যাওয়া যাবে, সব জমি তাঁর হবে। লোভের এই দৌড় তাঁর শেষ হয় মৃত্যুতে। বিশ্বসাহিত্যে পাহোম যেমন লোভের প্রতীক, মির্জা শাজাহান নামের একজন মানুষ দৌড়াচ্ছেন ‘অসময়’কে পেছনে ফেলার একান্ত প্রতিযোগিতায়। মানবকল্যাণে, কখনো বিচারের দাবিতে, কখনো বা অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তাঁকে দেখা যায় রাস্তায়। যেন পেছনে ফেলতে চান সব অন্যায়-অবিচারকে। কলেজছাত্রী রূপা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে প্রতি বুধবার তিনি ১০ কিলোমিটার দৌড়াচ্ছেন; বিচার না হওয়া পর্যন্ত দৌড়ে যাবেন, যত দিন বেঁচে থাকেন। এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দ্বিতীয়টি কি আছে?

কালের কণ্ঠে তাঁর এই অভিনব লড়াই নিয়ে ‘দৌড়ে চলেছেন’ শিরেনামে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে গত ১৬ অক্টোবর। এরপর তিনি আরো বেশি উৎসাহী হয়ে ওঠে নতুন নতুন চিন্তা যোগ করছেন তাঁর লড়াইয়ের অংশ হিসেবে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে ধূমপানবিরোধী ও সুস্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতনতামূলক বক্তব্য শুরু করেছেন।

গত বছরের ২৫ আগস্ট চলন্ত বাসে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয় কলেজছাত্রী জাকিয়া সুলতানা রূপাকে। ৬৫ বছর বয়সী শাজাহান ভাবলেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তিনি এমনিতেই নিয়মিত দৌড়ান, তাঁর দুই শক্ত-সবল পা-কে তিনি করছেন প্রতিবাদের অস্ত্র। গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি বুধবার সকাল ১০টায় টাঙ্গাইলের জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণ থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়াচ্ছেন তিনি। রূপা হত্যার উপযুক্ত বিচার না হলে  আমৃত্যু তিনি এ দাবিতে দৌড়াতে থাকবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কখনো অসুস্থতার কারণে যদি দৌড়াতে না পারেন তখন ১০ কিলোমিটার সাইকেল চালাবেন। সেটাও যদি না পারেন, তাহলে প্রতি বুধবার এই ১০ কিলোমিটার হুইলচেয়ার চালিয়ে তাঁর আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন। এর মধ্যে টাঙ্গাইল শহরে প্রতিবাদকারী দৌড়বিদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন ৬৫ বছর বয়সী মির্জা শাজাহান। জেলার বাসাইল উপজেলার একঢালা গ্রামের শাজাহান এখন থাকেন জেলা শহরে।

শাজাহান কালের কণ্ঠ’কে জানান, ২০০৪ সালে শরীর ও স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে তিনি হাঁটাহাঁটি ও দৌড়ানো শুরু করেন। কয়েক মাসের মধ্যে দৌড়ানো তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। এ বয়সেও তিনি এক ঘণ্টা ১৫ মিনিটে একটানা ১৩ কিলোমিটার দৌড়াতে পারেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ঠিক করেন, এ দৌড়ই হবে তাঁর প্রতিবাদের ভাষা। টাঙ্গাইল শহরের বিভিন্ন সড়কে বাইসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় মির্জা শাজাহানের সাইকেলের সামনে লেখা থাকে ‘বুট বাদাম কলা খাই, ৬৫-তে দৌড়াই’। আর পরনের গেঞ্জির সামনে লেখা থাকে—‘ধূমপান করি না’।

গত ৭ জুলাই কুমিল্লা বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি ডোবায় যাত্রীবাহী বাস পড়ে যায়। সেখানে বহু মানুষ দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। কিন্তু পুলিশ সদস্য পারভেজ মিয়া নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিশুসহ ৪০ জনকে উদ্ধার করেন। পারভেজ মিয়াকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ও সম্মাননা দেওয়ার দাবিতে টাঙ্গাইলে হাফ মেরাথন (২১ কিমি) দৌড়ের আয়োজন করেন শাজাহান মিয়া। গত ১৫ ডিসেম্বর সকাল ৮টায় শহরের এসপি লেক থেকে দৌড় শুরু করেন তিনি। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আসলাম খান এ দৌড় উদ্বোধন করেন। এ সময় জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লায়ন খানমও উপস্থিত ছিলেন। আসলাম খান মির্জা শাজাহানের সঙ্গে দুই কিলোমিটার দৌড়ে অংশ নেন। লায়ন খানমও কিছুদূর পর্যন্ত দৌড়ান।  মির্জা শাজাহানের কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গে ৩০ জন যুবক এদিন দৌড়ান।

মির্জা শাজাহান কালের কণ্ঠ’কে বলেন, ‘কোনো অন্যায়, অপরাধের প্রতিবাদ করতে বয়সটা জরুরি না। যদি মনে সাহস থাকে এবং প্রতিবাদ করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে যেকোনো বয়সেই প্রতিবাদ করা যায়। আর প্রতিবাদের ভাষাও নিজের মতো করে তৈরি করা যায়। আমি দৌড়কে প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছি। কালের কণ্ঠে আমাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর সত্যি বলতে আমি অনেক সাড়া পেয়েছি এবং আমার উৎসাহ অনেক বেড়ে গেছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দৌড়ানোটা অব্যাহত রাখতে চাই। সেই সঙ্গে বিভিন্ন মানবিক বিষয় নিয়েও কাজ করতে চাই।’



মন্তব্য