kalerkantho


বড় প্রশ্ন : কেমন হবে এই নির্বাচন?

এম সাখাওয়াত হোসেন

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বড় প্রশ্ন : কেমন হবে এই নির্বাচন?

সংবিধান অনুসারে ২০১৮ সালের শেষের দিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এ নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে নতুন সরকার গঠিত হবে। এর আগে নতুন বছরের শুরুতেই ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচন এবং দুই সিটির নতুন ৩৬টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। বছরের মাঝামাঝি রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন করতে হবে। ময়মনসিংহকে বিভাগ এবং এ বিভাগে নতুন সিটি করপোরেশন করা হলে সে নির্বাচনও এ বছরই হতে পারে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের নিয়মিত কাজ হিসেবে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচন, উপনির্বাচনও করতে হবে। কয়েক দিন আগে ৫৬টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করতে হলো। বছরটি পার হবে ছোট, বড় নানা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। পরে আসবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সে কারণে বলতে পারি, ২০১৮ সাল হচ্ছে নির্বাচনী বছর। এখন  নির্বাচনগুলো কেমন হবে সেটিই বড় প্রশ্ন। 

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এ নির্বাচনকে ‘ফ্লড’ (ত্রুটিযুক্ত) নির্বাচন বলেছে অনেকেই। একটি গবেষণাপত্রে দেখা যায়, ২০১৪ সালে হয়েছিল এমন পাঁচটি দেশের নির্বাচনের মধ্যে বাংলাদেশের নির্বাচনকে বলা হয়েছে ফেইল্ড ইলেকশন। ‘ফ্লড’ ইলেকশন হচ্ছে, যেখানে জোচ্চুর, জাল ভোট, মারামারি এসব সমস্যা থাকে। ‘ফেইল্ড’ ইলেকশন হচ্ছে, যে ইলেকশন গণতান্ত্রিক সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। কেন ফেইল্ড ইলেকশন তার কারণও ওই গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ইলেকশন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও আমাদের নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হয়েছে। এ নির্বাচনে তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। প্রার্থীদের কেউ বলেছেন, ‘আমি প্রার্থিতা উইথড্র করেছি’, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। কেউ বলেছেন, উইথড্র করেননি, তার পরও উইথড্র হয়ে গেছে। এ বিষয়গুলো গোপনও ছিল না। এ বাস্তবতা পরের ইলেকশনগুলোতে প্রভাব ফেলেছে। উপজেলা নির্বাচনে ভোট ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। রাতে কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা, দিনে ওপেন সিল মারা, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে রেকর্ড গড়া—সব কিছুই হয়েছে।  ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনও আমরা দেখেছি। এভাবে নির্বাচনের ফলে দেশের নির্বাচনী সিস্টেমটাই নষ্ট হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। একটি-দুটি ভালো নির্বাচন হলে তো হবে না। অব্যাহতভাবে ভালো নির্বাচন হলে বলতে পারি যে সিস্টেমটা কাজ করছে। কিন্তু তা বলা যায় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা দারুণভাবে ভঙ্গুর এবং ভঙ্গুর অবস্থা নতুন বছরে আলাদিনের চেরাগ দিয়ে ঠিক হয়ে যাবে, সেটা আমি মনে করি না। তার নমুনাও আমি খুব একটা দেখছি না। রংপুর ইলেকশন ভালো হয়েছে, কুমিল্লার ইলেকশন ভালো হয়েছে, সেখানে ম্যানেজমেন্ট পুরো মনোযোগ দিতে পেরেছে। কিন্তু রংপুরের পর যে কতগুলো ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হলো, সেসব নির্বাচন নিয়ে আমাদের মিডিয়াও উচ্ছ্বসিত ছিল না। এসব কারণে আমি খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে বলে মনি করি না। পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচন বোঝা যায় না। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যেভাবে নজর রাখা যায়, তা তৃণমূল পর্যায়ে সম্ভব হয় না। তৃণমূল পর্যায়ে ভালো নির্বাচন হতে হলে ভালো নির্বাচনের একটি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা দরকার।    

তাহলে ২০১৮ সালে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সরকার। এ নির্বাচন হতে যাচ্ছে এমন এক পরিস্থিতিতে যেখানে ২০১৪ সালের মতোই পার্লামেন্ট বহাল থাকবে। আমাদের পার্লামেন্ট মেম্বাররা আইনানুগভাবে না হলেও অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। তাঁরা তাঁদের এলাকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। ডিসি কে আসবেন, কে আসবেন না, ওসি কে থাকবেন, থাকবেন না—এসব বিষয়ে তাঁদের প্রভাব কাজ করে। স্থানীয় সরকারগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে না। পার্লামেন্ট মেম্বাররা কার্যত প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। দ্বিতীয়ত, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড যেভাবে হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না এবং হবে না। এটি নির্বাচনের বহু আগে থেকেই থাকা দরকার। শুধু নির্বাচনের সময় সভা-সমাবেশ বা প্রচার-প্রচারণার সুযোগ দিলেই হয় না। আইন প্রণয়ন দিয়ে এটি শুরু হয়। একটা আইনও যদি অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হয় না। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডে যদি দীর্ঘদিন ধরে বাধা দেওয়া হয়, তাতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকে না। রাজনৈতিক অঙ্গনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না হলে নির্বাচনে কিভাবে হবে? আমাদের রাজনীতি এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। দুটি দলের শক্তি, অর্থ, মেধা—এসব নিয়োজিত হচ্ছে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে লক্ষ্য করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে এ দুটি দলের বিকল্প নেই। বিকল্প তৈরিও হচ্ছে না। নতুন যেগুলো তৈরি হচ্ছে, তা মূলত এই দলের সঙ্গে জোট করার জন্য। জাতীয় পার্টির সেকেন্ড পার্টি হিসেবে দাঁড়ানোর অবস্থা নেই। সে কারণে একটি শক্তিশালী তৃতীয় দল নতুনভাবে জন্ম নেওয়ার আগ পর্যন্ত আরো বহুদিন আমাদের দুই পার্টির মধ্যেই থাকতে হবে। নির্বাচনে প্রতিযোগিতা হবে প্রধান দুই দলের মধ্যে। এ অবস্থায় নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করার দায়িত্ব হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের।

আগামী নির্বাচনও একপেশে হওয়ার আশঙ্কা এই কারণে যে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিশাল মূল্য দিতে হয়। হেরে গেলে মামলা, আদালতে হাজিরা দেওয়া, জেল, জরিমানাসহ নানা ধরনের মানসিক নির্যাতন শুরু হয়। এ জন্য যারা ক্ষমতায় থাকে তারা ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করে।

সার্বিক বিচারে বলা যায়, বাংলাদেশের ১০টির মধ্যে চারটি সংসদ নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে ফেয়ার ইলেকশন হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিল। এ চারটির মধ্যে তিনটি ছিল সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে আর একটি অ্যাডহক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে। এ পর্যন্ত ১২টি নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। এর মধ্যে চারটি নির্বাচন কমিশন সফলভাবে নির্বাচন করতে পেরেছে।  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে নির্বাচনে কোনো দল পুনর্বার ক্ষমতায় আসেনি। দলীয় সরকারের মাধ্যমে নির্বাচনে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার ঘটনা ঘটেছে। এবার আওয়ামী লীগ একনাগাড়ে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসতে পারে। আর বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনও সব সময় পূর্ণ মেয়াদে কাজ করতে পারেনি। কমিশনারদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণেও কমিশনের কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

বলা যায়, চারটি সূচকের নেতিবাচক অবস্থানের কারণে আমাদের নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে ফাংশন করতে পারবে না। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে ধারাবাহিকভাবে ভালো নির্বাচন আশা করা যায় না। সূচকের একটি হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এক ধরনের সুবিধাবাদী ও তোষামোদি রাজনীতি চলছে। নমিনেশনের ব্যাপারে, অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যাপারে এক ধরনের ‘পেট্রল ক্লায়েন্ট’ সম্পর্ক এবং অসহিষ্ণুতা বিদ্যমান। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন গঠিত হচ্ছে, তাতে প্রথমেই নির্বাচন কমিশনের ওপর অবিশ্বাসের ধাক্কা লাগে। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে ফাংশন না করতে পারলে এই অবিশ্বাস আরো বাড়ে। তৃতীয় সূচকটি হচ্ছে, প্রশাসনে রাজনৈতিকীকরণ হয়েছে। প্রশাসনের বেশির ভাগ লোক পার্টিকর্মী হিসেবে কাজ করছে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি—এসব বিষয়ে দলের প্রতি আনুগত্যই প্রাধান্য পাচ্ছে। এমনকি নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়াতেও এটা কাজ করে। নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনকে বেসামরিক প্রশাসনের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়। কিন্তু প্রশাসন যদি নির্মোহভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে ভালো নির্বাচন আশা করা যায় না। চার নম্বর সূচক হচ্ছে নির্বাচনী নিরাপত্তা। রংপুর সিটি নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাড়ে পাঁচ হাজার সদস্য মোতায়েন করতে পারলেও তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচনে তা করার সামর্থ্য নেই। এই নিরাপত্তা পদ্ধতিতেও রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। নির্বাচন কমিশনের নিরাপত্তা ম্যানুয়েল নেই। কমপ্লেইন ম্যানুয়েলও নেই। কিভাবে নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে তার ব্যবস্থা নেই। মোটা দাগে যদি এই চার সূচকই নেতিবাচক থাকে, তাহলে কিভাবে ভালো নির্বাচন আশা করব? এই সূচকগুলো যদি ভালোভাবে কাজ করে, তাহলে যে সরকারই থাকুক না কেন, ভালো নির্বাচন হতে পারে।

দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ১৯৯১ সালে বাস্তবতা অনুসারে একটা ব্যবস্থা নিয়েছিল। এই ব্যবস্থার অপব্যবহার হয়ে থাকলে তা রোধেরও ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু বাতিল করার মতো অবস্থা এখনো  বাংলাদেশে আসেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অনির্বাচিত সরকার বলা হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩ আসনে যদি বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা বৈধ হয়ে থাকলে তিন মাসের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারও নির্বাচিত করা যেতে পারে। এসব নির্ভর করছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর। আমি আবারও বলছি, সংসদ রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন কঠিন হবে। এ ছাড়া আগামী সংসদ নির্বাচনে বড় দল দুুটির, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নমিনেশন পাওয়া নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। যাঁরা নমিনেশন পাবেন না তাঁরা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারেন। নির্বাচন কমিশনের জন্য বিষয়টি বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।  অন্যান্য চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গত নির্বাচন ‘ফ্লড’ ও ‘ফেইল্ড’ হিসেবে চিহ্নিত হলেও দেশ ও সরকারের একটি ডেমোক্রেটিক ফেস রয়েছে। কিন্তু ফ্লড ও ফেইল্ডের পুনরাবৃত্তি হলে সমস্যা হবে। এ ছাড়া ২০১৮ সালে আমরা আরো অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ব। রোহিঙ্গা কিভাবে ফেরত যাবে, গেলে তাদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি কী হবে, আদৌ ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে কি না—এসব প্রশ্ন আছে। এক্কা, দোক্কা, চার শ, পাঁচ শ ফিরিয়ে নিলে সমস্যার সমাধান হবে না। একই সঙ্গে ভারতের আসাম পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য নতুন সংকট ডেকে আনতে পারে। সেখান থেকে ২০ লাখেরও বেশি বাংলাভাষী মুসলিমকে বাংলাদেশে বিতাড়নের চেষ্টা চলছে। এটি হলে বাংলাদেশের সমস্যা আরো বাড়বে। সব মিলিয়ে ২০১৮ সাল খুব স্মুথ হবে বলে মনে করি না। তবে আশা রাখতে চাই। দেশের কল্যাণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সব পক্ষের মধ্যে শুভ বোধের উদয় হোক।

অনুলিখন : কাজী হাফিজ


মন্তব্য