kalerkantho


রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ফেরানোই জরুরি

সৈয়দ আবুল মকসুদ

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ফেরানোই জরুরি

বর্তমানে দেশে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি চলছে, তা কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক ধারা নয়, সুস্থ রাজনীতিও নয়। এই ধারাটির সূচনা করে গেছে ১১ জানুয়ারির বিশেষ ধরনের সরকার। তাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা ছিল দেশকে বিরাজনীতিকরণ। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তারা পরীক্ষামূলকভাবে দুই প্রধান নেত্রীকে বন্দি করে এবং তাঁদের সহকর্মীদেরও করে কারারুদ্ধ অথবা নানাভাবে নাজেহাল। দেশের রাজনীতি থমকে দাঁড়ায়। বৈদেশিক আনুকূল্য পেয়েও তারা সফল হতে পারেনি। দেশের মানুষ নেতাদের ওপর যতই বিরক্ত হোক, স্বাভাবিক রাজনৈতিক ধারায় ফিরে যেতে চেয়েছে। তারা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চেয়েছে।

২০০৯ সালে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর স্বাভাবিক রাজনৈতিক তৎপরতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। স্বাভাবিক রাজনৈতিক অবস্থায় রাজনৈতিক সংগঠনগুলো জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য এবং জাতির আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম করে। সেই কর্মকাণ্ড ঘরের ভেতরে আলোচনার মাধ্যমে করে এবং ময়দানে সভা-সমাবেশ করে। সভা-সমাবেশে, মিছিল-বিক্ষোভে জনগণের আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ ঘটে। ক্ষমতাসীন দলের তাতে ক্ষতির চেয়ে উপকারই বেশি হয়। যেসব দাবি-দাওয়া বাস্তবায়ন সম্ভব, তা মেনে নিলে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ে। কিন্তু মিটিং-মিছিল-সমাবেশ বন্ধ থাকলে মানুষের মনের ক্ষোভ চাপা থাকে এবং একসময় তার বিস্ফোরণ ঘটে।

গত কয়েক বছর ধরে শুধু যে বিরোধী দলগুলোর রাজনীতির স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রয়েছে তাই নয়, সরকারি দলের নেতাদেরও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়া ছাড়া গণমুখী কোনো তৎপরতা নেই। সব রাজনৈতিক দল জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা অতীতে কখনো হয়নি। বিরোধী নেতাকর্মীরা মামলা-মোকদ্দমা ও জেল-জুলুমের চাপে আছে। সেটাও অস্বাভাবিক নয়। রাজনীতি করলে ওসব সইতে হয়। এর মধ্যেই জনগণের কাছেও যেতে হয়। তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হয়। বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থায় নেতারা শুধু ভোটের জন্য জনগণের কাছে যান। নির্বাচনে বিজয়ী হলে অথবা পরাজিত হলে জনগণের সঙ্গে নেতাদের আর সম্পর্ক থাকে না। এ বছরটি নির্বাচনের বছর। প্রধান দুটি দলের নেতারা নির্বাচনী কথাবার্তাই বলছেন। সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বার্থে সব দলের অবাধ সভা-সমাবেশ করার সুযোগ থাকতে হবে। নেতাদের যেতে হবে জনগণের কাছে। জনগণ কী চায় তা জানতে হবে। অতীতের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি তিক্ততারই জন্ম দেয়। গণতন্ত্রে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ যেমন আবশ্যক, তেমনি ভবিষ্যতে জাতির কিসে কল্যাণ হবে, তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেসব বিষয় রাজনীতিকে সংঘাতপূর্ণ করে রেখেছে, সেসব কাঁটা দূর করার জন্য যা যা দরকার, নেতারা তা করবেন, এই প্রত্যাশা করি। নেতাদের প্রতি বিশ্বাস হারাতে চাই না। এ বছর তাঁরা রাজনীতিতে একটি ভালো গণতান্ত্রিক ধারা উপহার দেবেন, বাংলাদেশ একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীতে মর্যাদার আসন পাবে—নববর্ষে এই আমাদের প্রত্যাশা। নতুন বছরটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার জন্য শুভ হোক।

সৈয়দ আবুল মকসুদ : লেখক ও বুদ্ধিজীবী



মন্তব্য