kalerkantho


অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই বিএনপির সামনে

এনাম আবেদীন ও শফিক সাফি   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই বিএনপির সামনে

নতুন বছর নিয়ে ভেতরে শঙ্কা কাজ করছে বিএনপির। দলটি মনে করছে, নতুন বছরটি তাদের অস্তিত্বের লড়াইয়ের বছরে পরিণত হতে পারে। কারণ প্রথমত, নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সরকার ছাড় দেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। দ্বিতীয়ত, জিয়া ট্রাস্টের দুই মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হওয়া না হওয়ার বিষয়টি সামনে আছে। এমন পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে কঠোর আন্দোলনে যেতে হতে পারে। আর সেই আন্দোলনে সফলতা-ব্যর্থতার ওপর বিএনপির অস্তিত্ব নির্ভর করছে বলে দলটির মধ্যে আলোচনা আছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বছরের শুরুতেই কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তা করছে না বিএনপি। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের কৌশল পরিবর্তন করতে চায় তারা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ায় সংসদের বিরোধী দল থেকে ‘রাজপথের বিরোধী দলে’ পরিণত হয়েছে বিএনপি। এবারও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে দলটির আন্দোলনে যাওয়া না যাওয়ার প্রশ্ন সামনে আছে। দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে দুই মামলার বিচারকাজও শেষ পর্যায়ে।

বিএনপির বিভিন্ন সূত্রে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সরকার নির্বাচনের চেষ্টা করলে বিএনপি তা প্রতিহত করার লক্ষ্যে কঠোর আন্দোলনে যাবে। আর ওই আন্দোলন ব্যর্থ হলে রাজপথের বিরোধী দল হিসেবেও বিএনপি টিকে থাকবে কি না, সেই আলোচনা বেশ কিছুদিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিএনপি যাতে নির্বাচনে যেতে বাধ্য হয়, সে জন্য চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও বিষয়টি সামনে আনার চেষ্টা করছেন। তাঁরা বলছেন, আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির অস্তিত্ব থাকবে না। এর অর্থ বিএনপি না এলে রাজনীতিতে এমন মেরুকরণ ঘটবে, যেখানে মূল স্রোত বা প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিএনপি নাও টিকে থাকতে পারে।

অবশ্য এ দেশের রাজনীতিতে বর্তমান দ্বিদলীয় মেরুকরণের পাশাপাশি ব্যাপক জনসমর্থনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি নেতারা মনে করেন, দ্বিতীয় দফায় একতরফা নির্বাচন কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। জনগণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী দেশগুলোও এটি সমর্থন করবে না। তাই দলটির কৌশল হলো আপাতত নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক পথে থাকা। কিন্তু সরকার বাধ্য করলে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামার চিন্তাও দলটির ভেতর রয়েছে।

বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ মনে করেন, খালেদা জিয়ার মামলার পরিণতি এবং নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে নতুন বছরটি বিএনপির জন্য অস্তিত্বের লড়াইয়ের বছরে পরিণত হবে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া সম্পর্কে কী বিচার হয় সেটি যেমন অন্যতম ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দেবে, তেমনি নির্বাচনী ব্যবস্থা ঠিক করা নিয়েও জটিল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তবে তাঁর মতে, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলের প্রবল চাপ থাকবে। এ অবস্থায় সরকার আরেকটি একতরফা নির্বাচন করার দুঃসাহস দেখায় কি না, এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১৮ সালটি এ দেশে রাজনৈতিকভাবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার তথা ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রামে পরিণত হবে বলে বিএনপি প্রত্যাশা করে। তাঁর মতে, জনগণ এই ভোটের অধিকারের সুযোগ পেলে বছরটি হবে বিএনপির বছর। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের মতো একতরফা নির্বাচন এ দেশে আর হবে না, হতে দেওয়াও হবে না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনও এ দেশে আর নির্বাচন হবে না।

কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনই সরকার নির্বাচন করার উদ্যোগ নিলে কী হবে—জানতে চাইলে বিএনপির প্রবীণ এই নেতা বলেন, ওই নির্বাচন বিএনপি মেনে নেবে না। আর ওই রকম পরিস্থিতিতে দেশে গভীর রাজনৈতিক সংকট তথা চরম অস্থিরতা তৈরি হবে।

প্রায় একই রকম অভিমত ব্যক্ত করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১৮ সালটি নির্বাচনের বছর হওয়ায় আমরা বছরটিকে বিএনপির বছর বলেই মনে করি। কারণ নির্বাচন হলে দেশের জনগণ বিএনপিকেই ভোট দেবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তৃতীয়বার ক্ষমতায় বসার উদ্যোগ সরকারের দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছুই নয়। তাঁর মতে, ভোটারবিহীন আরেকটি নির্বাচন এ দেশের জনগণ এবং বিএনপি মেনে নেবে না। তিনি বলেন, সরকার তেমন উদ্যোগ নিলে কঠোর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণ তা ধূলিসাৎস করে দেবে।

জানা গেছে, গত তিন বছরের মতো এবারও ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা’ দিবস হিসেবে পালন করবে বিএনপি। ওই দিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করার জন্য এরই মধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে আবেদন করা হয়েছে। একই দিন সারা দেশে তৃণমূল পর্যায়েও সমাবেশ করার কথা ভাবছে দলটি। তবে ওই জনসভা কোনো সংঘাত সৃষ্টির জন্য নয়, স্রেফ রাজনৈতিক শোডাউনের জন্য। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে দলটি আন্দোলনের পরিকল্পনা করবে আরো কয়েক মাস পর। এর আগে কূটনীতিক মহলে তৎপরতাসহ নানাভাবে তারা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করবে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ছাড় পাওয়া না গেলে ওই চাপকেই ক্রমাগত বাড়িয়ে রাজপথ দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালাবে বিএনপি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলের চেয়ারপারসন বলেছেন, আমরা একই সঙ্গে নির্বাচন ও আন্দোলন-সংগ্রামের প্রস্তুতি নিয়েছি। তিনি এই আন্দোলন-সংগ্রাম বলতে জনগণের দাবি আদায়ের জন্য ইতিবাচক কর্মসূচির কথা বলেছেন। আগামী বছরটা আমরা ইতিবাচক কর্মসূচি দিয়ে শুরু করতে চাই। তবে সরকার বাধা সৃষ্টি করলে বিএনপি বসে থাকবে না।’

দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে কোনো গণতন্ত্র নেই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সরকার গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। প্রতিবছরের মতো এবারও আমরা দিবসটি সারা দেশে পালন করব।’

বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিজেদের ভুল ও ব্যর্থতা পর্যালোচনা করেই বিএনপি আগামী নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক কর্মকৌশল ঠিক করছে। এ কারণে ২০১৭ সালে হরতাল বা অবরোধের মতো কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। এর আগে ২০১৪ সালের নির্বাচনের এক বছর পর ৫ জানুয়ারিকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস ঘোষণা করে বিএনপি আন্দোলনের চেষ্টা চালিয়েছিল। ওই সময় ঢাকাসহ সারা দেশে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে ৯২ দিন গুলশানে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ ছিলেন খালেদা জিয়া। ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ কর্মসূচি পালন করতে পারলেও ২০১৭ সালে দলটিকে অনুমতি দেওয়া হয়নি।

এদিকে নতুন বছরের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের লক্ষ্যে তৃণমূলের বার্তা তুলে আনতে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের ৭০টি টিম গত ২৬ থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশ সফর করেছে। ওই সব সফর থেকে পাওয়া তথ্য বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে তুলে ধরা হবে। ৭০টি টিমের দায়িত্বে থাকা নেতাদের মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বরিশালে, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সিলেটে, ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ গোপালগঞ্জে, আব্দুল্লাহ আল নোমান ময়মনসিংহ উত্তর, দক্ষিণ ও শেরপুর এবং রুহুল আমীন চৌধুরী নেত্রকোনায় যান। শরীয়তপুর-মাদারীপুর ঘুরে এসেছেন ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, গত এক বছরে ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে যে সংগঠন গোছানো হয়েছে, এর অগ্রগতি ও তৎপরতা দেখভাল করতেই সারা দেশে টিম গেছে। নতুন কমিটি হয়েছে, সাংগঠনিক পরিস্থিতি কেমন, এসব বিষয় দেখভাল করার জন্যই ৭০টি টিম।


মন্তব্য