kalerkantho


জনমত-দলীয় ঐক্য নিয়ে চিন্তা আওয়ামী লীগে

তৈমুর ফারুক তুষার   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জনমত-দলীয় ঐক্য নিয়ে চিন্তা আওয়ামী লীগে

গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে নতুন বছরে। আর বছরের শেষ দিকে হওয়ার কথা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জয়লাভ করতে হলে নিজেদের জনসমর্থন বাড়ানো এবং সংগঠনের অভ্যন্তরীণ ঐক্য সুদৃঢ় করাটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। ফলে এই দুই বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে বছরের শুরু থেকে দলীয় তৎপরতা চালিয়ে যাবে আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের ওই নেতারা জানান, বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে সরকারের উদ্যোগের বিষয়টি বিভিন্ন মহলে আলোচনায় থাকলেও নির্বাচনের আগে এটি বড় ইস্যু হবে না। তাঁদের মতে, অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে বিএনপি। ফলে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে কিভাবে জয়লাভ করা যায় সে বিষয়টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। তাঁরা নির্বাচনে জয়ের জন্য জনমত পক্ষে রাখা এবং তৃণমূলে দলীয় কোন্দল নিরসন করতে পারাটাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার অংশ হিসেবে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকেই আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা জেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক সফর করবেন। সফরকালে তাঁরা সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরার পাশাপাশি সাংগঠনিক সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করবেন।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১৮ সাল নির্বাচনের বছর। আমাদের সাংগঠনিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারের উন্নয়ন ও সাফল্য প্রচার এ বছর আমাদের লক্ষ্য হবে। আমরা নির্বাচনের কাজে গুরুত্ব দেব। এ দেশ ১৬ কোটি মানুষের দেশ। আর আওয়ামী লীগ তো কোনো কমিউনিস্ট পার্টি না, এটা আমজনতার পার্টি। তবে এটা কিন্তু সার্কাস পার্টি না যে এখানে যার যা খুশি করবে।’

নতুন বছরে সরকারের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘২০১৭ সালের পুরোটা বছর বিএনপি হিপোক্রেসি করে কাটিয়েছে। তাদের অবস্থা হলো—আমি মাছ খাই না, মাছের ঝোল খাই। তারা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে অংশ নিয়েছে কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে তারা অংশ নেয় না। তারা সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। আগামীতেও এটা অব্যাহত থাকবে। নিজের এক চোখ কানা করে আওয়ামী লীগের দুই চোখ কানা করতে প্রার্থনা করার মানুষ এ দেশে আছে। এগুলো মোকাবেলা করেই আমাদের চলতে হবে। আর ২০১৭ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি, রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয়গুলো আমাদের সামাল দিতে হয়েছে। এ বছরও এই বিষয়গুলো আমাদের সফলতার সঙ্গে সামাল দিতে হবে।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন বছরে আমরা নতুন উদ্যমে কাজ করছি। ইউনিয়নগুলোতে যাচ্ছি। নির্বাচনের কাজ করছি। আমরা সাংগঠনিক ট্যুরে যাব। এরই মধ্যে আমরা নেমে পড়েছি। নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আমাদের সাংগঠনিক সফর চলতে থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘নতুন বছর কঠিন হবে। কারণ এটা নির্বাচনের বছর। অর্থনীতি চাপে থাকবে, ব্যাংকিং চাপে থাকবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও চাপে থাকবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলকে সুসংগঠিত করা, সুশৃঙ্খল রূপ দেওয়া, দলকে শক্তিশালী করা আমাদের লক্ষ্য। দীর্ঘদিন আমরা ক্ষমতায় আছি। ১০ বছর ক্ষমতায় থাকলে স্বাভাবিকভাবে কর্মীদের মধ্যে পাওয়া-না পাওয়ার বিষয়টি প্রভাব ফেলে। অনেক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী নিজ এলাকায় হয়তো চেষ্টা করেও একটা রাস্তা বা কালভার্ট নির্মাণ করাতে পারেননি। এমন কারণসহ আরো নানা কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা ক্ষোভ কাজ করে, নানা রকম বিভেদ সৃষ্টি হয়। দল হিসেবে আমাদের কাজ হবে তৃণমূলে গিয়ে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করা। নেতাকর্মীদের মধ্যে যে দূরত্ব আছে সেগুলো কমিয়ে আনা এবং একটি সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সম্পর্ক স্থাপন করিয়ে দেওয়া।’

সাবেক মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা যে উন্নয়ন করেছি তা দৃশ্যমান এবং মানুষও স্বীকার করে। কিন্তু নিজেদের কিছু ভুল-ভ্রান্তির জন্য নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা বিভেদ আছে। আগামী নির্বাচনে বৃহত্তর স্বার্থে নেতাকর্মীদের বিভেদ ভুলে দলের জন্য কাজ করানো আমাদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এর জন্য আমাদের কেন্দ্রীয় নেতাদের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যেতে হবে, মতবিনিময় করতে হবে।’

আওয়ামী লীগ জনসমর্থন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ ভোটার হয়েছে। এরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। এদেরকে আমাদের পক্ষে রাখাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তরুণদের মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নতি এবং তাদের কর্মসংস্থানের জন্য আশাবাদ সৃষ্টি করতে হবে। আমরা তরুণদের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করছি সেগুলো তুলে ধরব।’ তিনি আরো বলেন, ‘যেকোনো দেশের উন্নয়নের জন্য সার্বিক স্থিতিশীলতা জরুরি। গত বছর আমাদের দেশের উন্নয়নের যে অগ্রযাত্রা ছিল তা অব্যাহত রাখতে হলে দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। এটা আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য মুহম্মদ ফারুক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১৮ সাল নির্বাচনের বছর। এ বছরে বেশ কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনগুলো জাতির জন্য, দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এই নির্বাচনগুলোতে জয়লাভের জন্য নিজেদের জনসমর্থন বাড়ানো এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। জনমত যেন আমাদের পক্ষে থাকে সেই চেষ্টা করতেই নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশনা দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।’

সাবেক মন্ত্রী ফারুক খান বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে গত বছর জনগণ যেমন আমাদের পক্ষে থেকে সরকারের কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিতে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছে, এ বছরও তা অব্যাহত থাকবে। জনগণ সব সন্ত্রাস, অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে এটাই আমরা বিশ্বাস করি। জনগণের জীবনমান এগিয়ে নেওয়ার জন্য এ বছর সরকারের চলমান বিভিন্ন উন্নয়নকাজ শেষ করতে জোর তৎপরতা থাকবে। একই সঙ্গে নতুন বেশ কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু করা হবে।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১৮ সাল যেহেতু নির্বাচনের বছর, আমার আশঙ্কা বিএনপি-জামায়াত গতবারের মতো আবার একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। তাদের বিভিন্ন অসংলগ্ন ও বাস্তবতাবিবর্জিত কথায় এবং নানা অসত্য উচ্চারণে মনে হচ্ছে তারা একটা অপচেষ্টা চালাতে পারে। আমি মনে করি, তারা যদি গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসে তবে সেটাই হবে তাদের জন্য মঙ্গল। কিন্তু তারা যদি সন্ত্রাসের পথ ধরে তবে সেটা সরকার যথাযথভাবে মোকাবেলা করবে। আর রাজনৈতিকভাবে যদি তারা কোনো অপচেষ্টা চালায় তবে আওয়ামী লীগ সেটা রাজনীতির মাঠেই মোকাবেলা করবে।’

সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার যেসব উন্নয়ন করেছে, শুধু সেই বিষয়গুলো যদি আমরা জনগণের সামনে ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারি, আর আমাদের দলের ভেতরের ঐক্য যদি ধরে রাখতে পারি তাহলেই আমরা সফল হব। বিএনপিকে আমি মূল চ্যালেঞ্জ মনে করি না। তারা কোনো দিন মানুষকে কিছু দিতে পারেনি। আমি মনে করি, আমাদের দলের ভেতরের ঐক্য ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। আওয়ামী লীগ অনেক বড় দল এবং আমরা টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় আছি। তৃতীয়বার যখন আমরা সরকার গঠনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করব, তখন আমাদের দলের মধ্যে অনেকেই নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইবেন। কিন্তু দল থেকে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাবেন একজন। আমরা সবাই যেন দল মনোনীত প্রার্থীর জন্য কাজ করতে পারি এটা নিশ্চিত করা আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ।’


মন্তব্য