kalerkantho


নিজ এলাকায় তোপের মুখে অনেক এমপি

তৈমুর ফারুক তুষার   

২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



নিজ এলাকায় তোপের মুখে অনেক এমপি

কেউ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, কেউ নামমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছেন। বিগত জাতীয় নির্বাচনে এমন সহজ জয়ের পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের অনেকে নির্বাচনী এলাকায় যাতায়াত এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেন। কেউ কেউ এলাকার নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছেন—এমন অভিযোগও আছে। এভাবে গত চার বছরে অনেক এমপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব এমন স্থানে এসেছে, যা ঘোচানো সম্ভব নয়। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে অভিযুক্ত সংসদ সদস্যরা এলাকামুখী হতে গিয়ে স্থানীয়ভাবে বিরোধিতার মুখে পড়ছেন। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা চার বছরের অবহেলা আর উপেক্ষার জবাব দিচ্ছে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে। কোথাও এমপিদের এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হচ্ছে বা বিকল্প প্রার্থিতার কথা বলা হচ্ছে, কোথাও আবার সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকা থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছেও অভিযোগ পাঠানো হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

এনামুল হক : রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হকের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবির, জেএমবি ও সর্বহারার সদস্যদের দলে টানার অভিযোগ বেশ পুরনো। স্থানীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্রে আগে অভিযোগ গেছে। মাস দুয়েক আগেও বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা সংবাদ সম্মেলন ডেকে তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতিসহ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখার অভিযোগ আনেন। সংবাদ সম্মেলনকারীদের একজন বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান জাকিরুল ইসলাম সান্টু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো এমপির নেতৃত্বে জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সদস্য ফরম বিতরণ চলছে।’ তিনি বলেন, ‘এমপি সাহেবের সঙ্গে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এমপির স্বেচ্ছাচারিতা, দলীয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে বিএনপি-জামায়াত, জেএমবির নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করায় এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যে ১১ জন নেতাকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে তাঁদের মধ্যে আমি, একজন পৌর মেয়র ও চারজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রয়েছেন। এ ঘটনায় তৃণমূলের বেশির ভাগ নেতাকর্মী এমপির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এখন যদি এনামুল হককে আবারও দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়, তবে নৌকার ভরাডুবির সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।’

তবে এনামুল হক কালের কণ্ঠকে বলেছেন, তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন। জঙ্গি বা সর্বহারাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, অভিযোগকারীদেরই কারো কারো সঙ্গে এসব প্রতিক্রিয়াশীল মহলের যোগাযোগ রয়েছে।

আব্দুল ওয়াদুদ দারা : রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনের এমপি আব্দুল ওয়াদুদ দারাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশ। গত রবিবার সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুকের উপস্থিতিতে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান থেকে এ অবস্থান ব্যক্ত করা হয়। সমাবেশে ফারুক প্রধান অতিথি ছিলেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল মজিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহসানুল হক মাসুদ, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক মুনসুর রহমান ও দুর্গাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন। তাঁদের মধ্যে তাজুল ইসলাম ফারুকসহ বিশেষ অতিথিদের প্রথম তিনজন আগামী সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী। সমাবেশে অভিযোগ তোলা হয়, ‘দারা পুঠিয়া ও দুর্গাপুরে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করেছেন।’ তবে এমপি দারা কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘যারা আমার দ্বারা বিভিন্ন সময়ে উপকৃত হয়েছে, তারাই আজ আমার বিরুদ্ধে নেমেছে। তবে তাদের সঙ্গে দলের নেতাকর্মীরা নেই। নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছে।’

আবদুর রহমান বদি : কক্সবাজার-৪ (টেকনাফ-উখিয়া) আসনের সংসদ সদস্য। তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী ক্ষুব্ধ। তাদের আপত্তির কারণে মাস ছয় ধরে এমপি বদি টেকনাফে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারছেন না। টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমপি সাহেবকে দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় কোনো কর্মসূচিতে রাখা হচ্ছে না। কারণ আগে আমরা তাঁকে দলীয় অনুষ্ঠানে রাখতে চাইলেও তিনি আসতেন না। তাঁর নানা কর্মকাণ্ডে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। গত রমজান থেকে তিনি এলাকায় নেই। ওনার বিরুদ্ধে দলের নেতাকর্মীদের যে ক্ষোভ রয়েছে, তা উনি বোধ হয় বুঝতে পেরেছেন। এ কারণেই তিনি এলাকা ছেড়ে দিয়ে থাকতে পারেন।’

দুই দিন অনেকবার কল দেওয়ার পর এমপি বদি গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ২৪ মিনিটে ফোন রিসিভ করেন; কিন্তু কথা বলেননি। পরে আর ফোন ধরেননি, এসএমএস পাঠালেও সাড়া দেননি।

আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী : চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ‘জামায়াত ঘরানার’ লোক হিসেবেই এলাকায় পরিচিত ছিলেন। তাঁর শ্বশুর মোমিনুল হক চৌধুরী জামায়াতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদের সদস্য। দলীয় নেতাদের অভিযোগ, এমপি নদভী দল ও সরকারকে নয়, নিজেকে জাহির করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। উপজেলা পর্যায়ে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বাদ দিয়ে নদভী দলে নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করেছেন। দলের মধ্যে ‘দল’ করছেন। তাঁর কারণে এলাকায় জামায়াত নেতারা নাশকতার মামলা থেকেও রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন আর ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা ‘মামলা-হয়রানির’ শিকার হচ্ছে।

সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কুতুবউদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলের এমপি হিসেবে তিনি (নদভী) নির্বাচন করে বিজয়ী হলেও দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। আমরা ওনাকে দলের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালেও তিনি আসেন না। আর তিনি যেসব অনুষ্ঠানে যান সেখানে আমাদের (উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক) ডাকেন না।’ কুতুবউদ্দিন চৌধুরী আরো বলেন, ‘যেখানে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে ওনার (এমপি) যোগাযোগ নেই, সেখানে তো তিনি দলবিচ্ছিন্ন।’

লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, ‘এমপি সাহেবের (নদভী) সঙ্গে আমাদের (উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক) প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে যোগাযোগ নেই। উনি কোনো অনুষ্ঠান করলে আমাদের দাওয়াত দেন না। আমরা দাওয়াত দিলে উনি আসেন না। এমপি দল নিয়ে কোনো চিন্তা করেন না; তিনি সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়েও ভাবেন না। নিজের ফয়জুল্লাহ ফাউন্ডেশনের ব্যানারে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠান করছেন। তাঁর কারণে আমাদের দলের ক্ষতি হচ্ছে।’

নেজামউদ্দিন নদভী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ শতভাগ আমার পক্ষে। আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হতে দল ও সহযোগী সংগঠনের পাশাপাশি আলেম-উলামাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিয়ে এলাকাভিত্তিক কমিটি গঠন শুরু করেছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলায় দলের ৬৭ সদস্যের একটি করে দুটি কমিটি আছে। সেখানে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আমার পক্ষে না থাকলেও কমিটির আরো যারা আছে তাদের মধ্যে আমার সঙ্গে আছে ৪০-৪৫ জন করে। সভাপতি না থাকলে সহসভাপতি, সম্পাদক না থাকলে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আছে আমার সঙ্গে। আমি দল থেকে কিভাবে বিচ্ছিন্ন?’

সামশুল হক চৌধুরী : চট্টগ্রাম-১২ আসনে (পটিয়া) টানা দুইবারের এমপি। গত বছর দুটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে তাঁর সঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের দূরত্ব চরম আকার নিয়েছে। এমপির সঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের যোগাযোগ নেই। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে উপজেলা আওয়ামী লীগ এবং উপজেলা ও পৌরসভা আওয়ামী লীগের ব্যানারে এমপির সমর্থক নেতাকর্মীরা পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করে আসছে।

পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নাছির কালের কণ্ঠকে বলেন, “এমপি এমনকি সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও দলীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করছেন না। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের অনুষ্ঠানে আসছেন না, নিজেই আলাদা অনুষ্ঠান করছেন। ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘বিতর্কিত’ ব্যক্তিদের মনোনয়নে সহযোগিতা করার পাশাপাশি অসাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কারণে এমপির সঙ্গে আমাদের (উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ তৃণমূল) কোনো যোগাযোগ নেই। বিভিন্নভাবে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হয়রানি করা হচ্ছে।”

তবে অভিযোগ প্রসঙ্গে সামশুল হক চৌধুরীর মন্তব্য জানতে বারবার ফোন দিলেও কেউ ধরেননি, মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়েও উত্তর পাওয়া যায়নি।

মনোরঞ্জন শীল গোপাল : দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ ও কাহারোল) আসনের এমপি। দুই উপজেলাতেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ। সম্প্রতি বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা বর্ধিত সভা ডেকে মনোরঞ্জন শীল গোপালকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকারিয়া জাকা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মনোরঞ্জন শীল গোপাল গত কয়েক বছরে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। স্থানীয় নেতাকর্মীরা এমপির আশপাশে ভিড়তে পারেনি। উল্টো ত্যাগী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের জুলুম-নির্যাতন করেছেন। এত দিন জনবিচ্ছিন্ন থেকে এখন এমপি সাহেব আগামী নির্বাচন সামনে রেখে যোগাযোগ শুরু করছেন। এ জন্যই নেতাকর্মীরা তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে।’

তবে মনোরঞ্জন শীল গোপাল কালের কণ্ঠকে বলেন, আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে আসনটি আওয়ামী লীগের কোন্দলের কারণে ২০০১ সালে জামায়াত কবজা করে। তিনিই এটি উদ্ধার করেন। কোন্দলের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, মনোনয়ন লাভের আশায় তিন-চারজন নেতা তাঁর বিরোধিতা করে থাকতে পারেন; তবে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা তাঁর সঙ্গে রয়েছে।

আবদুল কুদ্দুস : নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর) আসনের এমপি। গত ১৫ অক্টোবর উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা থেকে তাঁকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে গুরুদাসপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র শাহনেওয়াজ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমপি সাহেব দলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন দূরের কথা, দুর্ব্যবহার করেন। তিনি স্বজনদের নিয়ে আছেন। আমরা আর ওনাকে এমপি হিসেবে দেখতে চাই না। আমাদের অবস্থান দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছেও পৌঁছে দিয়েছি। কিছুদিনের মধ্যেই সংবাদ সম্মেলন ডেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আবদুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে নিজেদের অভিযোগ তুলে ধরবে।’

জানতে চাইলে আবদুল কুদ্দুস এমপি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তারা সবাই দলীয় আদর্শ পরিপন্থী কাজ করছে। জনগণ এসবের জবাব দেবে। আর তারা ভুয়া কমিটি দিয়ে বর্ধিত সভা ডেকে আমার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি সংগঠনের স্বার্থেই আমার নেতাকর্মীদের শান্ত রেখেছি। কোনো বিবাদে জড়াতে দিচ্ছি না।’

নিজাম উদ্দিন হাজারী : ফেনী-২ (সদর) আসনের এমপি। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে দলীয় নেতাকর্মী হত্যা, নির্যাতনসহ নানা অভিযোগ এনেছেন জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী সদস্য এবং সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এম আজহারুল হক আরজু। গত ২১ নভেম্বর ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে এ সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে নিজাম উদ্দিন হাজারীকে আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না দিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান আরজু।

অবশ্য হাজারী কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘নেতাকর্মীরা আমার পক্ষেই আছে, শুধু জয়নাল হাজারীর কিছু অনুসারী ভিত্তিহীন অভিযোগ আনছে। জয়নাল হাজারী এলাকার আতঙ্ক ছিলেন। তিনি এখন কিছু নেতাকর্মীর মাধ্যমে আবার অস্থির অবস্থা ফিরিয়ে আনতে চান।’

হাবিবুর রহমান : বগুড়া-৫ (শেরপুর ও ধুনট) আসনের সংসদ সদস্য। গত জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় ধুনট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি টি আই এম নুরুন্নবী তারেক বলেন, ‘এমপির কারণে ধুনট উপজেলা আওয়ামী লীগ ক্ষতবিক্ষত ও তছনছ হয়ে গেছে। তিনি নিজ সংগঠনের বেকার কর্মীদের বঞ্চিত করে বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়েছেন। এমপির শ্যালক বিএনপি নেতা ধুনট পৌরসভার সাবেক প্রশাসক আকতার আলম সেলিম আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২৯ মামলার বাদী।’

এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমার এখানে সংগঠনের যত ভালো অবস্থা, তা দেশের খুব কম জায়গাতেই আছে। সম্প্রতি যতগুলো দলীয় কর্মসূচি আমরা পালন করেছি, এতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি ছিল। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনকারী নুরুন্নবী তারেকের সামাজিক কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তিনি উপজেলা পর্যায়েও যদি নির্বাচন করেন, তবে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। দলের ১০ জন নেতাকর্মীও তাঁর সঙ্গে নেই।’

মাহবুব আলী : হবিগঞ্জ-৪ (মাধবপুর-চুনারুঘাট) আসনের এমপি। ২৪ নভেম্বর মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলার মধ্যবর্তী সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে দুই উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একটি সভা করে। দুই উপজেলার অধীন আওয়ামী লীগের সব ইউনিটের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে সভা থেকে আগামী নির্বাচনে মাহবুব আলীকে দলের প্রার্থী না করতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগকে অনুরোধ জানানোর সিদ্ধান্ত হয়। সভায় মাহবুব আলীর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে নেতাকর্মীরা।

মাহবুব আলী এমপি কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি জনবিচ্ছিন্ন নন। আর বিরোধিতা করার অধিকার সবারই রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা যাঁকে মনোনয়ন দেবেন, তিনিই আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হবেন।

মোয়াজ্জেম হোসেন রতন : সুনামগঞ্জ-১ (তাহিরপুর, ধর্মপাশা, মধ্যনগর ও জামালগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য। তাঁর সঙ্গে বিরোধ চরমে রয়েছে আওয়ামী লীগের একটি অংশের। দুই অংশই আলাদা কর্মসূচি পালন করে থাকে। এখানে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে রয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল করিম শামীম, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগ নেত্রী শামীমা শাহরিয়ার ও সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা রণজিত সরকার।

তবে মোয়াজ্জেম হোসেন রতন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থানীয় আওয়ামী লীগ আমার কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকে। আগামী নির্বাচনে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে যারা এলাকায় কর্মসূচি করছে তারা নিজেরাই করছে। তাদের সঙ্গে নেতাকর্মীদের সম্পর্ক নেই।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যেহেতু বৃহত্তম সংগঠন, সেহেতু এ সংগঠন থেকে অনেকেই স্বপ্ন দেখতে পারে মনোনয়নের বিষয়ে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় কৃষক লীগ নেত্রী শামীমা শাহরিয়ার বলেন, ‘এমপি সাহেব গত ৬ ডিসেম্বর জামালগঞ্জে আমার নারী সমাবেশে বাধা দিয়েছেন। হুমকি-ধমকি দিয়েছেন। আমি কৃষক লীগ ও আওয়ামী মহিলা যুবলীগের নেতাদের নিয়ে নারী সমাবেশ ডেকেছিলাম।’ শামীমা আরো বলেন, ‘এ আসনে মনোনয়নের জন্য আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছেন। তাঁরা আমার কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকেন। আমাকে মনোনয়ন বিষয়েও সমর্থন দিচ্ছেন।’

ফরহাদ হোসেন : মেহেরপুর-১ (সদর ও মুজিবনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। সংসদ সদস্য নির্বাচনের আগে জেলা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে না থেকেও পরে সভাপতি হন। তৃণমূল ও পুরনো নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ফরহাদ হোসেন দলকে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। একসময়ের পুরনো ও ত্যাগী নেতাদের ছুড়ে ফেলেছেন। ফলে তাঁর সঙ্গে সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের সম্পর্ক নেই।

অবশ্য ফরহাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘আমার এলাকা বঙ্গবন্ধুর নামের এলাকা। আসনটি টিকিয়ে রাখতে দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। দলের সব নেতাকর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখছি।’

কবীরুল হক মুক্তি : নড়াইল-১ (কালিয়া ও সদর আংশিক) আসনের এমপি। অভিযোগ রয়েছে, শুধু নিজের সংসদীয় এলাকায় নয়, এমপি মুক্তি গোটা জেলার রাজনীতিতেই নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করেছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে নিজের পছন্দ না হলে দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধেই প্রার্থী দিয়েছেন। স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন ‘মুক্তিলীগ’।

তবে কবীরুল হক মুক্তি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তৃণমূল মানুষ ও নেতাকর্মীদের স্বার্থে কাজ করছি। দলবিরোধী কোনো কাজের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই। একটি মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

অ্যাডভোকেট নূরুল হক : খুলনা-৬ (কয়রা ও পাইকগাছা) আসনের সংসদ সদস্য। দলে একটি বিরোধী অংশের সঙ্গে দ্বন্দ্ব অনেকটাই প্রকাশ্য। বছরখানেক আগে তাঁর সমর্থকরা দলের অপর অংশের ওপর হামলা চালিয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে এলাকায় নিজস্ব সালিস ব্যবস্থায় দণ্ড ও জরিমানার মতো স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ রয়েছে। তবে অ্যাডভোকেট নূরুল হক বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষের সঙ্গে কাজ করছি। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে এলাকায় উন্নয়ন চালিয়ে যাচ্ছি। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।’

কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্য : আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহম্মদ ফারুক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেশ কিছু আসনে সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে নেতাকর্মীদের অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা করছেন।’ তিনি এও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি বড় দল, এখানে প্রতিযোগিতা আছে, থাকবে।’ আগামী নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দলের মনোনয়ন বোর্ডের কাছে বিভিন্ন তথ্য আছে। আমরা সব আসনে জরিপও চালাচ্ছি। সব বিবেচনায় নিয়েই মনোনয়ন বোর্ড প্রার্থী মনোনয়ন দেবে।’

খুলনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনা অনুযায়ী শত ফুল ফুটতে দেওয়া উচিত। সেখান থেকে আওয়ামী লীগ সভাপতি সঠিক ফুলটিকে মনোনয়ন দিয়ে জনগণের মুখোমুখি করবেন।’ তিনি বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য তাঁর এলাকার তালুকদার বা জমিদার নন। এটি কোনো স্থায়ী পদও নয়। একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য যদি পরেরবার আরো অধিক ভোটে জয়লাভ করতে না পারেন, তবে সেটি হবে তাঁর ব্যর্থতা, জনগণের নয়।’

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক অফিস ও জেলা প্রতিনিধিদের তথ্যসহায়তা নেওয়া হয়েছে।



মন্তব্য