kalerkantho


রংপুর সিটিতে কাল ভোট

আ. লীগ-বিএনপিকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে জাপা

পার্থ সারথি দাস ও স্বপন চৌধুরী, রংপুর থেকে   

২০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আ. লীগ-বিএনপিকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে জাপা

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রংপুরের পুত্রবধূ। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাড়িও রংপুরে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের শুরুটা করে দিচ্ছে রংপুর। আগামীকাল বৃহস্পতিবার রংপুর মহানগরে ভোট। এই ভোটের ফলাফলের দিকে শুধু রংপুরবাসী শুধু নয়, তাকিয়ে আছে পুরো দেশ। কারণ এখানকার ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে নতুন রং ছড়াবে।

প্রতীক বরাদ্দের পর টানা দুই সপ্তাহের প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার মধ্যরাতে। নগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডের বেশির ভাগ স্থানে ‘লাঙ্গল’ শব্দটি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। সাধারণ ভোটার এবং বিভিন্ন দলের নেতারাই  বলছেন, মেয়র পদে জাতীয় পার্টি এখানে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের জন্য এ পরীক্ষা বড় কঠিন।

২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর নবগঠিত রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচন হয়েছিল। দলীয় প্রতীকবিহীন মেয়র পদের নির্বাচনে ওই সময় সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু জয়ী হন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ২৮ হাজার। মোটরসাইকেল প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছিলেন এক লাখ ছয় হাজার ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এবারের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের নির্দেশ অমান্য করে স্রোতের বিপরীতে গিয়ে মোস্তফা ভোটযুদ্ধে নেমে ৭৭ হাজার ৮০৫ ভোট পেয়েছিলেন তখন। এবার সেই মোস্তফা জাতীয় পার্টির সব নেতার আশীর্বাদ ও লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে ঝন্টুর ঝাণ্ডা নামিয়ে ফেলতে চান। আর ঝন্টু এবার আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন।

বিএনপি এবং পরে জাতীয় পার্টি ত্যাগ করে শেষ পর্যন্ত মেয়র হওয়ার পর আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির উপদেষ্টা হয়েছেন সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু। এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের ১১ জন। কিন্তু দল ঝন্টুকে মনোনয়ন দেওয়ায় প্রথমদিকে মনোনয়নবঞ্চিতদের ক্ষোভ ছিল। তবে শুধু প্রতীকের দিকে তাকিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ না দেখিয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নিয়েছেন তাঁরা।

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের পক্ষের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উজ্জ্বল ভাবমূর্তির নতুন কোনো প্রার্থী দিলেও কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হতো না। আওয়ামী লীগকে মন থেকে ভালোবাসেন—এমন অনেক ভোটার জানিয়েছেন, যোগ্য প্রার্থী না দেওয়ায় দল হয়তো উচিত শিক্ষা পেতে পারে।’

রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, গাজীপুরসহ সর্বশেষ গত মার্চে অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীরা হেরেছেন। কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের পরাজয়ের প্রতিশোধ প্রায় আট মাস পর রংপুরের নির্বাচনে নেওয়ার সুযোগ কতটা আছে তা নিয়ে সংশয়ের ক্ষেত্র তৈরি করেছেন দলীয় প্রার্থী ঝন্টু নিজেই।

স্থানীয় লোকজনের দাবি, কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়ার পাশাপাশি আচরণ ভালো নয় বলে ঝন্টুর আগের সমর্থকরাও তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

যদিও ঝন্টু নৌকা প্রতীকের ওপর ভরসা রেখে মাঠে ভোট চেয়েছেন। তাঁর ধারণা, মূলত প্রতীক নৌকার কারণেই তাঁর জয় নিশ্চিত।

গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টি সমর্থিত প্রার্থী আবদুর রউফ মানিক পেয়েছিলেন ৩৭ হাজার ভোট। এবারের নির্বাচনে সেই মানিক মাঠে নেই। দলের লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হওয়া এবার মোস্তফার জন্য ইতিবাচক দিক। কারণ গত নির্বাচনে দলের সমর্থন না পেয়েই তিনি ৭৭ হাজার ৮০৫ ভোট পেয়েছিলেন।

বিএনপি প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা ২০১২ সালের সিটি নির্বাচনের আগের দিন রাতে ভোট বর্জন করেন। তার পরও ২১ হাজার ২৩৫ ভোট পেয়েছিলেন। এবার তাঁর সমর্থকরা বলছেন, তিনি জামায়াত-শিবির ঘরানার প্রায় ৬০ হাজার ভোট পেতে পারেন। বাবলার পক্ষে সরকারবিরোধী মনোভাবের এবং সরকারের দমন-পীড়নের কারণে ক্ষুব্ধ অংশের ভোটাররা অবস্থান নিয়েছেন।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জনপ্রিয়তার অবস্থা কি তা জানা যাবে এই নির্বাচনের মাধ্যমে—এমন কথাও বলছে কেউ কেউ।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, নারায়ণগঞ্জের মতো তাঁরা সুষ্ঠু নির্বাচনের নজির সৃষ্টি করতে চান রংপুরে। দলের জনপ্রিয়তার প্রকৃত অবস্থা জানতে সহায়ক হবে এ নির্বাচন।

অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের নেতারা বলছেন, দলের জনপ্রিয়তা ও সরকারি দলের আচরণ পর্যবেক্ষণের জন্য এ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রংপুরে এসে গত সোমবার প্রার্থীর পক্ষে গণসংযোগকালে রংপুরবাসীকে ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে বলেছেন। এর কারণ, তাঁর ভাষায়, ‘আওয়ামী লীগ ভোট চুরি করে।’

তবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, ‘বিএনপি ভোট চুরির অভিযোগও করে আবার নির্বাচনেও অংশ নেয়। নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার ভরসা থেকে তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নির্বাচন হবে উৎসবমুখর।’

নগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে বর্ধিত ১৮ ওয়ার্ড গ্রামাঞ্চলে। তিন লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪ ভোটের মধ্যে প্রায় দুই লাখ ২৪ হাজার ৯৯৪ ভোটই বর্ধিত অংশের ওয়ার্ডগুলোতে। ২০১২ সালের সিটি নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ঝন্টুর জয়ের বড় কারণ ছিল বর্ধিত ১৮ ওয়ার্ডের বিপুল সমর্থন। গতকাল দুপুরে রংপুর মূল নগর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে বর্ধিত ১৮ ওয়ার্ডের একটি ৬ নম্বর ওয়ার্ড ঘুরে কোথাও উন্নয়নের আলামত চোখে পড়েনি। একই ওয়ার্ডের বুড়িরহাটে গোল হয়ে ভোটের হিসাব কষছিলেন বাহাদুর সিংহ গ্রামের আব্দুস ছালামসহ আরো কয়েকজন। পরিস্থিতি কী জানতে চাইলে ছালাম ও অন্যরা বললেন, ‘এ্যাটে বাহে নৌকার ওপরে হামার কারো গোসা (গোসসা) নাই। সউগ গোসা হইল ঝন্টুর ওপরে। একখান কাগজোত তার দস্তখত আনতে তিনবার গেইলেও তা পাওয়া যায় না। মেয়র হবার পর থাকি ঝন্টু আর হামাকগুলাক চেনে না।’

গত সোমবার রাত থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত নগরীর শাপলা চত্বর, গুপ্তপাড়া, মেডিক্যাল মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় যাকেই জিজ্ঞেস করা গেছে সেই বলেছেন ঝন্টুকে পরীক্ষা দিতেই হবে। শেষ পর্যন্ত ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা ‘গোপন সমঝোতা’ না হলে লাঙ্গলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন না ঝন্টু।

ঝন্টু পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সরকারের উন্নয়ন, রংপুরের পুত্রবধূ প্রধানমন্ত্রীর ইমেজ তুলে ধরে ঘরে ঘরে ভোট চেয়েছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতা তাঁর পক্ষে শেষ পর্যন্ত ছিলেন না। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ১১ জন নেতাও ক্ষুব্ধ। এই অবস্থায় সরকারবিরোধী মনোভাব এবং প্রায় ৬০ হাজার ‘জামায়াতি ভোটার’ নিয়ে নীরবে মাঠে আছেন বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা।

জাতীয় পার্টির দুর্গ রংপুরে নব্বই দশকের পর থেকে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে যেই প্রার্থী হয়েছেন তাঁর ঘরেই অনায়াসে জয় এসেছে। এ কারণে এই নির্বাচনকে জাতীয় পার্টি মর্যাদা রক্ষার নির্বাচন হিসেবেই দেখছে। গত সোমবার থেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুর নগরের দর্শনা এলাকায় নিজ বাসভবন পল্লী নিবাসে অবস্থান করছেন। এরও দুই দিন আগে থেকে দলের কো-চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ কাদের রংপুরে এসে মোস্তফার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় নির্বাচন করছে কি না জানতে চাইলে গতকাল গোলাম মোহাম্মদ কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রংপুর আমাদের দুর্গ। বিপুল ভোটে আমাদের প্রার্থী জয়ী হবে। কারোর জোর করে ভোট কেনা কঠিন হবে। সমঝোতা করে আমাদের জিততে হবে না। জাতীয় নির্বাচনে এই নির্বাচন সব দলের পরিকল্পনা গ্রহণে গুরুত্ব বহন করবে।’

আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ঝন্টুর পক্ষে প্রচারণায় স্থানীয় উন্নয়নের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে রংপুরে বিভাগ গঠন, সিটি করপোরেশন গঠন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, তিস্তা সেতু চালুসহ ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।

আওয়ামী লীগ প্রার্থী ঝন্টুর পক্ষে রংপুরে অবস্থানরত দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন গতকাল দিনভর প্রচারণা চালিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘রংপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে উন্নয়ন করেছেন তা শত বছরেও হয়নি। আওয়ামী লীগে কোন্দল নেই। সবাই একসঙ্গে কাজ করছে।’

রংপুরের ছেলে এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে কিছু উন্নয়নের চেষ্টা করেন। তাঁর ধারাবাহিকতা বজায় রাখেনি পরের সরকারগুলো। ১৮৬৯ সালে ২৩ বর্গকিলোমিটারের পৌরসভা থেকে এখন ২০৩ বর্গকিলোমিটারের সিটি করপোরেশন হয়েছে রংপুর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালের ৮ জানুয়ারি জিলা স্কুল মাঠে জনসভায় রংপুরকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা দেন এবং দেশের দশম সিটি করপোরেশন ঘোষণা করে ২০১২ সালের ২৮ জুন প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। ১ জুলাই থেকে যাত্রা শুরু করে এ সিটি করপোরেশন। আগের পৌরসভার সঙ্গে সদর উপজেলার ইউনিয়ন রাজেন্দ্রপুর, সাতগাড়া, হরিদেবপুর, উত্তম, দর্শনা, তামপাট, তপোধন, সদ্যপুষ্করনী, পরশুরাম ও চন্দনপাট সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু এখনো উন্নয়নের বাইরে রয়ে গেছে বলে স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছে। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত হওয়া কাউনিয়া উপজেলার সারাই ও পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নও মেয়রের সুনজরে পড়েনি।

রংপুরে সরেজমিন ঘুরে ও আলাপকালে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে, এবারের এ নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ভর করবে ব্যক্তি ভাবমূর্তির ওপর। এ ছাড়া নারী ভোটার, নতুন ভোটার, বর্ধিত ১৮ ওয়ার্ডের ভোটও প্রভাবক হবে।

সাবেক পরশুরাম ইউনিয়ন এখন সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড। এখানে সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রার্থী শহীদুল ইসলাম দুখু। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ থাকাকালে ১৮টি ওয়ার্ডের দুস্থ পরিবারগুলো ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ) কার্ডসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেত। পাঁচ বছর ধরে এসব পরিবার বঞ্চিত। তারা বঞ্চনার জবাব দেবে।

 


মন্তব্য