kalerkantho


ভোট পরীক্ষার মুখে নির্বাচন কমিশন

সাত সিটির পর আসছে জাতীয় নির্বাচন

বিশেষ প্রতিনিধি   

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ভোট পরীক্ষার মুখে নির্বাচন কমিশন

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে আগামী ২১ ডিসেম্বর। ওই দিন ভোট হবে রংপুর সিটি করপোরেশনে। এরপর ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহেই হতে যাচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদে উপনির্বাচন। ডিএনসিসির মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুতে পদ শূন্য হওয়ায় ইসির রোডম্যাপের বাইরে ওই পদে ভোটের আয়োজন করতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে ডিএনসিসি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) সদ্য যুক্ত হওয়া ১৮টি করে মোট ৩৬টি ওয়ার্ডের সাধারণ ও নারীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদেও নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রস্তুত ইসি। আগামী এপ্রিল-মে মাসে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই এই পাঁচ সিটির নির্বাচন শেষ করতে চায় ইসি। এরপর আসছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

দশম সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। ফলে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিছুটা সময় হাতে রেখে আগামী বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে এ নির্বাচন অনুষ্ঠানে আগ্রহী ইসি। এর আগে নিয়মিত কাজ হিসেবে ইসিকে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন উপনির্বাচন এবং স্থগিত থাকা নির্বাচনও করতে হবে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনকে সরকার ও ইসির জন্য পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা।

নির্বাচন বিশ্লেষকরাও বলছেন, ২০১৮ সাল ইসি, সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল—সবার জন্য একটি পরীক্ষার বছর। একটি অবাধ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতা ও নিরপেক্ষতার ওপরই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং নতুন বছরের শুরুর দিকে ডিএনসিসির মেয়র পদে উপনির্বাচনের মাধ্যমেই ইসি ও সরকারের নিরপেক্ষতা যাচাই হতে পারে বলে মনে করেন তাঁরা। তাঁদের মতে, বিএনপিসহ সরকারের বাইরে থাকা দলগুলো এসব নির্বাচন দেখেই পরের নির্বাচনগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোর পরস্পরবিরোধী অবস্থান এখনো বহাল। তার পরও সে নির্বাচনের আগে সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে সবার অংগ্রহণের আগ্রহ ইতিবাচক বলেই বিশিষ্টজনদের ধারণা।

সুশানের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১৮ সাল হবে নির্বাচনী বছর। এ বছরই আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সুযোগের বছর। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। তবে সেটিই যথেষ্ঠ নয়। এ বিষয়ে সরকার তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল—সবার দায়িত্বশীলতার মাধ্যমেই আমরা একটি ভালো পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু তা না হলে, নির্বাচন একতরফা হলে, নির্বাচনে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন না ঘটলে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়বে। তখন পরিস্থিতি কারো জন্যই কল্যাণকর হবে না।’

নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার (জানিপপ) চেয়ারম্যান ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, চলতি মাসে রংপুর সিটি নির্বাচন হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ কেমন হবে, তা আগাম জানিয়ে দেবে সিটি নির্বাচনগুলো। বলা যায়, এক বছর পর জাতীয় নির্বাচন হবে। এই এক বছর হচ্ছে নির্বাচনী বছর। নির্বাচনে এবার বিএনপি অংশ না নিলে নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন বাতিলের আশঙ্কা আছে। কাজেই নির্বাচন নিয়ে বছরজুড়ে টান টান অবস্থা থাকবে।

ক্ষমতাসীনরা যা বলছেন : ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দাবি, সিটি নির্বাচনগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। তাঁদের মতে, নির্বাচনী আবহ শুরু হয়েছে। এ আবহ উৎসবের। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিএনপির উদ্দেশে বলেছেন, ‘প্রতিনিয়ত নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে আপনাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হচ্ছে। এসব অবান্তর অভিযোগে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে না, বিএনপির সদিচ্ছা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ করা বিএনপির পুরনো অভ্যাস। ভাঙা রেকর্ড তারা নির্বাচন এলেই বাজায়। রংপুরেও তারা তাদের সেই রেকর্ড বাজাচ্ছে। তারা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার আগে একবার হারে, আবার জেতার আগেও একবার হারে।’ গতকাল বিআরটিসির গাবতলী বাস ডিপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে ফলের আগ পর্যন্ত অবিরাম অভিযোগ করেছিল। গাজীপুর, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়েও তারা একই অভিযোগ করেছিল। নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন স্বাধীন কর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচনের প্রভাব তৃণমূলেও পড়বে। জাতীয় নির্বাচনের আগে দলের জন্যও এ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আনিসুল হককে ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রার্থী করে জয়ী হয়েছিলাম। কিন্তু তাঁর প্রয়াণে উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতা রক্ষায় আমরা আবার যোগ্য প্রার্থী দেব।’

আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল বলেন, ‘এ মাস থেকেই নির্বাচনমুখী হয়ে পড়ছে দেশ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রংপুর ছাড়াও বিভিন্ন সিটিতে নির্বাচন হবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আমরা এমন প্রার্থী দেব, যাতে তাঁর মাধ্যমে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থাকে।’

বিএনপি নেতাদের বক্তব্য : রংপুর সিটি নির্বাচন ও ডিএনসিসির উপনির্বাচনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া নির্বাচনী আমেজ সম্পর্কে বিএনপি স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, আসলে এই নির্বাচনগুলো সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য পরীক্ষা। কারণ একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রয়েছে। ফলে নির্বাচন কমিশন কী আচরণ করে বা জনগণ নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে কি না, এটি এই নির্বাচনে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ রয়েছে। তিনি আরো বলেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের এই ভূমিকা দেখার জন্যই স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বিএনপি অংশ নিয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে যে এ দেশে আগামী যেকোনো নির্বাচন ন্যূনতম সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে বিএনপি জয়লাভ করবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গণতান্ত্রিকব্যবস্থা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে বিএনপি সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, এরই ধারাবাহিকতায় শর্তহীনভাবে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে যাবে। জাতীয় নির্বাচন অবশ্যই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে। বিএনপির প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ইসি নিরপেক্ষ থাকলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বিএনপি অবশ্যই জয়ী হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব নির্বাচনে সরকার ও ইসির ভূমিকা দৃশ্যমান হবে। জনগণ দেখতে পাবে আগামী নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে কি না। নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নে বিএনপিরও এতে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।

সিপিবি সভাপতির বক্তব্য : বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডিএনসিসি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার বার্তা পাওয়া গেছে। নির্বাচন হবে ফেব্রুয়ারিতে। এ মাসেই রংপুর সিটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। যথাসময়ে নির্বাচন হলেও অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমাদের দেওয়া সুপারিশগুলো নির্বাচন কমিশন কানে তুলছে না। নির্বাচনে প্রার্থী হতে গেলে জামানত যা রাখতে হয়, তাতে সাধারণ মানুষ প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থেকে শুরুতেই বঞ্চিত হয়।’ ডিএনসিসির উপনির্বাচনে বাম দল থেকে অভিন্ন প্রার্থী দেওয়া হবে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘বাম দলগুলোর পক্ষ থেকে আমরা প্রার্থী চূড়ান্ত করব।’

এপ্রিল-মেতে যে পাঁচ সিটির ভোট : একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে পাঁচ সিটির ভোট। সংসদ নির্বাচনের আগে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের মাপকাঠি হিসেবে এই পাঁচ সিটির নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেবে রাজনৈতিক দলগুলো। ২০১৩ সালে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও গাজীপুর—এই পাঁচ সিটির সর্বশেষ নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন বিএনপির প্রার্থীরা।

ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, আগামী বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার পরপরই এপ্রিল-মে বা জুন মাসে বাকি পাঁচ সিটি করপোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।

আগামী বছরের মার্চ থেকে মধ্য অক্টোবরের মধ্যে ওই পাঁচ সিটির নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিধিমালা অনুযায়ী, রাজশাহী সিটিতে আগামী বছরের ৯ এপ্রিল থেকে ৫ অক্টোবর, খুলনায় ৩০ মার্চ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর, বরিশালে ২৭ এপ্রিল থেকে ২৩ অক্টোবর, সিলেটে ১৩ মার্চ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর এবং গাজীপুরে ৮ মার্চ থেকে ৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

 

 



মন্তব্য