kalerkantho


কূটনৈতিক লড়াইয়েই হেরে আত্মসমর্পণ পাকিস্তানের

৭ দিন আগেই আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছিলেন নিয়াজি

মেহেদী হাসান   

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০




কূটনৈতিক লড়াইয়েই হেরে আত্মসমর্পণ পাকিস্তানের

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের আগেই কূটনৈতিক লড়াইয়ে হেরেছিল পাকিস্তান। পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে তা ঠেকাতে ৪, ৫ ও ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান তার তখনকার মিত্র দেশগুলোকে দিয়ে অস্ত্রবিরতির তিনটি প্রস্তাব এনেছিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে। মাত্র ৯ দিনের মধ্যে আনা ওই তিনটি প্রস্তাবের প্রতিটিতেই ‘ভেটো’ দেয় রাশিয়া (তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন)।

অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে পরিস্থিতি অন্যদিকে ঘোরানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ১৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বক্তব্য দিয়েই বেরিয়ে যান পাকিস্তানের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। পাকিস্তানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ঠেকাতে না পারায় চীন ছাড়া অন্য পরাশক্তিগুলোর প্রতি ক্ষোভ ছিল তাঁর। টানা ৯ মাস বাংলাদেশে (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান) গণহত্যা ও নির্বিচার নৃশংসতা চালানো পাকিস্তান সেদিন এ দেশকে মুক্ত করতে ভারতীয় সহযোগিতাকে ‘আগ্রাসন’ ও নিজেকে ‘আক্রান্ত’ বলে দাবি করেছিল।

নিরাপত্তা পরিষদকে ভুট্টো বলেছিলেন, “করাচি থেকে আমার ১১ বছর বয়সী ছেলে গতকাল আমাকে ফোন করে বলেছে, ‘আত্মসমর্পণের দলিল নিয়ে এসো না। তুমি যদি তা করো তবে আমরা তোমার পাকিস্তানে ফেরা দেখতে চাই না।’ আমি নিরাপত্তা পরিষদ থেকে আত্মসমর্পণের দলিল নিয়ে ফিরব না। আমি আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়ার অংশ হতে চাই না।”

জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছিলেন, ‘মুসলিম বেঙ্গল স্বেচ্ছায় পাকিস্তানের অংশ হয়েছিল, টাকার বিনিময়ে নয়। আলাস্কা যেমন কেনা হয়েছিল, আমরা তেমন কিনিনি। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ কেন এটি বোঝে না?’

যুদ্ধ থামাতে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে অনুপস্থিত থাকা যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের উদ্দেশে ভুট্টোর মন্তব্য ছিল, তাদের ওই অনুপস্থিতির জন্য পাকিস্তানকে কড়া মূল্য দিতে হয়েছে। ভুট্টো বলেছিলেন, নিরপেক্ষ বলতে দুনিয়াতে কিছু নেই। রাশিয়া (তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন) একটি পক্ষ নেওয়ায় তাদের প্রশংসা করেও ভুট্টো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকে ভুল বলে অভিহিত করেছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক নথি থেকে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর ভারত ২৯ মার্চ বিষয়টি জাতিসংঘের তখনকার মহাসচিব উ থান্টের নজরে এনে গণহত্যা বন্ধে উদ্যোগ প্রত্যাশা করে। তা ছাড়া বাংলাদেশ থেকে ভারতমুখী শরণার্থী স্রোত সামাল দিতে ২৩ এপ্রিল ও ৬ মে জাতিসংঘের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে ভারত। তখনকার জাতিসংঘ মহাসচিব গণহত্যার বিষয়টি বিবেচনায় না নিলেও ১৯ মে ও ১৬ জুন বাংলাদেশি শরণার্থীদের বোঝা লাঘবে ভারতের পাশে দাঁড়াতে বিশ্বের সব রাষ্ট্রকে আহ্বান জানান। ভারত বাংলাদেশে পাকিস্তানি গণহত্যা ও মানবিক সংকটের বিষয়টি জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে তুলেছিল।

অন্যদিকে মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি কূটনীতিকরা পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। তাঁরা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ও পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার কথা সঠিকভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে পাকিস্তানে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বন্ধ, বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন ও স্বীকৃতির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ভারতের সামরিকবিষয়ক ওয়েবসাইট ভারতরক্ষক-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নানা তথ্য রয়েছে। সেখানে একটি বিবরণীতে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ভারত ও পাকিস্তানের ইস্যু বানাতে চেয়েছিল। কিন্তু ভারত তা ঠেকাতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছিল। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের দিকে পাকিস্তান জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করে ভারত সীমান্ত এলাকাগুলোতে সামরিক তৎপরতা জোরদার করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই জাতিসংঘে পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক লড়াই চালিয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। বাংলাদেশি কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরাও জাতিসংঘে তৎপরতা চালান।

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এ যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর পাকিস্তান একে ভারতীয় আগ্রাসন হিসেবে অভিহিত করে। মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় বাংলাদেশিদের সহায়তায় জোরালো ভারতীয় আক্রমণে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী কোণঠাসা অবস্থায় পড়ে। তবে তাদের আত্মবিশ্বাস ও মনোবলে চিড় ধরেছিল আরো বেশ আগে। মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।

ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তাদের জবানিতে বাংলাদেশে অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক ও প্রপাগান্ডা যুদ্ধের প্রসঙ্গও এসেছে। পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণ রাখার মতো প্রয়োজনীয় সামরিক জনবল না রেখেই সীমান্ত এলাকাগুলোতে ভারতীয় আক্রমণ ঠেকাতে অতিরিক্ত সেনা পাঠিয়েছিল। পাকিস্তানের প্রত্যাশা ছিল, তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সামরিকভাবে সহযোগিতা করবে। ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের কয়েক দিন আগেও ইসলামাবাদে পাকিস্তান সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দখলদার বাহিনীকে এমন বার্তা দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের ভাবনা ছিল, চীনা বাহিনী তাদের সহযোগিতা করবে বিমানযোগে, আর যুক্তরাষ্ট্র নৌবহর পাঠাবে। এ কারণে আকাশ আর বঙ্গোপসাগর দিয়ে দৃষ্টি ছিল পাকিস্তানিদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেসব সহযোগিতা আসেনি।

১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর ভারতীয় প্যারাট্রুপাররা যখন টাঙ্গাইলের কাছাকাছি নেমেছিল, তখন পাকিস্তানি বাহিনী তাদের চীনা প্যারাট্রুপার বলে ভুল করেছিল। তবে ওই প্যারাট্রুপারদের অবতরণ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচারিত একটি ভুল খবরেও পাকিস্তানিরা দুশ্চিন্তায় পড়েছিল। ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের কাছাকাছি অবতরণ করেছিল ভারতের ৫০ প্যারাব্রিগেডের একটি ব্যাটালিয়ন। কিন্তু আন্তর্জাতিক একটি সংবাদমাধ্যমের খবরে ভুল করে পাঁচ হাজার প্যারাট্রুপার নামার খবর প্রচারিত হয়েছিল।

পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যদের নৈতিক মনোবলেও ধস নেমেছিল নানা অপরাধের সঙ্গে জড়ানোর কারণে। ভারতীয় সেনারা পাকিস্তানি সেনাদের সতর্ক করে বার্তা পাঠাচ্ছিল। যুদ্ধের শেষ দিকে ঢাকা থেকে দখলদার পাকিস্তান বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকেও ইসলামাবাদে যে বার্তাগুলো পাঠানো হয়েছিল সেগুলোতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিকল্প ভাবনা ছিল।

১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় দখলদার পাকিস্তানি প্রশাসনের গভর্নর আবদুল মোতালেব মালিক তাঁদের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে পাঠানো বার্তায় নিরপরাধ জীবন রক্ষায় সম্ভাব্য সব কিছু করার আহ্বান জানান। 

যুদ্ধ শেষে দখলদার বাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবকে বলেছিলেন, পরাজয়ের বিষয়টি তিনি আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন এবং ১৬ই ডিসেম্বরের অন্তত সাত দিন আগেই আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইয়াহিয়া তা হতে দেননি। ইসলামাবাদে ইয়াহিয়া খান ও তাঁর উপদেষ্টাদের তখনো কিছু আশা ছিল।



মন্তব্য