kalerkantho


দেশে ১৫-৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে সর্বাধিক মৃত্যু ক্যান্সারে

তৌফিক মারুফ   

১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দেশে ১৫-৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে সর্বাধিক মৃত্যু ক্যান্সারে

দেশে নারীদের মধ্যে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী যত নারীর মৃত্যু হচ্ছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা যাচ্ছে ক্যান্সারে। এর মধ্যে আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্তন ও জরায়ুর ক্যান্সারে ভুগে বেশি মৃত্যু হচ্ছে। সরকারের জরিপ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চিত্র। বিশেষজ্ঞরা এ ক্ষেত্রে নারীদের আরো বেশি স্বাস্থ্য সচেতন হতে এবং জীবনযাপন সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, এ বয়সের নারীদের মৃত্যু মানে শুধু সে নিজে শেষ হয়ে যাচ্ছে না, বরং একটি সংসারের ভবিষ্যৎও ঝুঁকিতে পড়ে।

সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্যসেবা জরিপ ২০১৬’-এর ফল। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্ট) উদ্যোগে এ জরিপ করা হয়েছে। জরিপের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে গত ছয় বছরে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে যাদের মৃত্যু ঘটেছে তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৪ শতাংশ মারা যায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে, ২৩ শতাংশ নারীর মৃত্যু হয় সংক্রমিত রোগে। এ ছাড়া মাতৃত্বজনিত কারণে ১৩ শতাংশ, অজ্ঞাত কারণে ৭ শতাংশ, আত্মহত্যা ও আঘাতজনিত কারণে ৬ শতাংশ এবং ১৭ শতাংশ নারী অন্যান্য বিভিন্ন কারণে মারা যায়। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে যেসব নারীর মৃত্যু হচ্ছে তাদের মধ্যে ৪৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সীরাই সবচেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে ১৫ বছরের পর থেকেই

 পর্যায়ক্রমে মৃত্যুহার বাড়তে শুরু করেছে, ২৫ বছরের পর থেকে তা দ্বিগুণ হয়ে যায়।

জরিপে তিন লাখ ২১ হাজার ২১৪ জন বিবাহিত নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। নিপোর্টের সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট সুব্রত কুমার ভদ্র কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এককভাবে ক্যান্সারের মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ বলে আমাদের জরিপে প্রতীয়মান হয়েছে। হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগের মতো প্রচলিত রোগে নারীদের মৃত্যুর সম্মিলিত হার ২৩ শতাংশ। কিডনি বিকল কিংবা আরো কিছু রোগকে আলাদা অন্যান্য ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। ফলে ক্যান্সারে একক মৃত্যুর হারটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।’

জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মেয়াররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটছে হৃদরোগে। এর পরই মৃত্যুর হার বেশি ক্যান্সারে। তুলনামূলকভাবে নারীদের হৃদরোগে মৃত্যুর হার আমাদের দেশে কম; কিন্তু বার্ধক্য ছাড়া দেশে নারীদের মধ্যে এখন ক্যান্সারে মৃত্যুর হার বেশি। এ ক্ষেত্রে অন্য ক্যান্সারের চেয়ে আবার স্তন ও জরায়ুর ক্যান্সারেই বেশি মৃত্যু হয়।

অধ্যাপক ডা. মেয়াররফ হোসেন বলেন, নারীরা সাধারণত স্তন ও জরায়ুর ক্যান্সারের চিকিৎসার ব্যাপারে এখনো পর্যাপ্ত মাত্রায় সচেতন নয়। শহরে ব্রেস্ট ক্যান্সারের স্ক্রিনিংয়ে সচেতনতা আগের তুলনায় অনেকটা বাড়লেও গ্রামে এখনো জরায়ু ক্যান্সারের চিকিৎসার ব্যাপারে চরম উদাসীনতা রয়েছে। অনেকেই নিজের সমস্যা টের পেয়েও সহসা ডাক্তারের কাছে আসতে চায় না। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের লোকজনও খুব একটা সহযোগিতা করে না। নারীদের এমন মানসিকতা কাটিয়ে উঠতে হবে; সমস্যা মনে না হলেও মাঝেমধ্যেই স্ক্রিনিং করাতে হবে। কারণ যেকোনো সময় ক্যান্সার ধরা পড়তে পারে। এ ছাড়া তামাকের কারণে মুখের ক্যান্সারেও অনেক নারীর মৃত্যু ঘটছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে ক্যান্সারের ওষুধ বিনা মূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা ও থেরাপির ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণের সমস্যা কমানো না গেলে পরিস্থিতি আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। ক্যান্সার শনাক্ত ও থেরাপির জন্য যন্ত্রপাতির সংখ্যাও বাড়ানো দরকার। দেশে ক্যান্সারের রোগীদের মধ্যে ফুসফুস, মুখগহ্বর, স্বরনালি, জরায়ু ও স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। নারী ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ জরায়ু মুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত। এ ক্ষেত্রে শুধু নারী ক্যান্সার রোগীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা বাড়ানো দরকার।

জরিপের তথ্যচিত্র অনুসারে ২০১০ সালে ক্যান্সারে মৃত্যু হওয়া ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সের নারীদের হার ছিল ২১ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা ৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২৪ শতাংশ। যদিও এ ছয় বছরে তুলনামূলক হারে সবচেয়ে বেশি (৭ শতাংশ) বেড়েছে প্রচলিত নানা রোগে মৃত্যুর ঘটনা। তবে ১ শতাংশ কমেছে মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর হার, ৫ শতাংশ কমেছে সংক্রমণে মৃত্যু, ৩ শতাংশ কমেছে আত্মহত্যা এবং ২ শতাংশ কমেছে অজ্ঞাত রোগে মৃত্যু।

জরিপ অনুযায়ী, দেশে গত তিন বছরে ৬০ বছর বয়সের নিচের মানুষের মধ্যে নারীদের তুলনায় পুরুষের মৃত্যুহার বেশি এবং ৬০ বছরের ওপরের মানুষের মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীদের মৃত্যুহার অল্প কিছু বেশি।

বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে বছরে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তদের মধ্যে ৭০ শতাংশই চিকিৎসকদের কাছে যায় শেষ পর্যায়ে। এভাবে বছরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ২২ হাজারের বেশি নারী। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসার সুযোগ পেলে এ রোগে ৯০ শতাংশেরই অকালমৃত্যু রোধ করা সম্ভব। কারণ এখন দেশেই উন্নত সব চিকিৎসা ও ওষুধ রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজন শুধু সচেতনতা।

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক বলেন, প্রত্যেক নারীর উচিত নিয়ম করে নিজের স্তন পরীক্ষা করা। শক্ত চাকার মতো অনুভূত হলেই পরিবারের অন্যদের জানাতে হবে কিংবা সরাসরি চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক জানান, নারীদের ক্যান্সারের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর ডিসেম্বরব্যাপী ফ্রি স্ক্রিনিং কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় এবারও শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত রাজধানীর মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতালে এই সেবা কার্যক্রম চলছে।



মন্তব্য