kalerkantho


বাংলাদেশিদের প্রযুক্তি আগ্রহে আপ্লুত হয়েছি

মুহম্মদ খান   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বাংলাদেশিদের প্রযুক্তি আগ্রহে আপ্লুত হয়েছি

আধুনিক প্রযুক্তি ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের বিপুল আগ্রহ দেখে নিজে আপ্লুত বলে জানিয়েছেন আলোচিত যন্ত্রমানবী ‘সোফিয়া’র নির্মাতা ড. ডেভিড হ্যানসন। তিনি গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে একান্ত কথোপকথনে এ কথা বলেন।

সোফিয়াকে নিয়ে তো অনেক দেশেই গেছেন; এত সাড়া কি সব দেশেই পেয়েছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে হ্যানসন বলেন, ‘আসলে একেক দেশে একেক ধরনের অভিজ্ঞতা। আমি গত রাতেই (মঙ্গলবার) এসেছি। কিছুটা ক্লান্তও ছিলাম। তবে এই সম্মেলন কেন্দ্রে (বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র) ঢোকার সময় এত এত মানুষ দেখে শুরুতে কিছুটা হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। পরে সহযাত্রীর কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছি। জানতে পারলাম, সোফিয়াকে দেখার জন্যই সবার এত আগ্রহ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক এক প্রযুক্তিকে ঘিরে বাংলাদেশিদের আগ্রহ আমাকে আপ্লুত করেছে। আমার সব ক্লান্তি কেটে গেছে। ’

সোফিয়া তৈরিতে কেন আগ্রহী হলেন; অর্থাৎ সামাজিক রোবটেই আপনার আগ্রহ বেশি কেন—এর জবাবে হ্যানসন বলেন, ‘ভিন্ন ভিন্ন মানুষের আগ্রহ ভিন্ন ভিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক।

কেউ কারখানার কাজ দ্রুততর করতে রোবট বানাচ্ছে। কেউ বা গবেষণাগারের সহযোগী হিসেবে তৈরি করছে। তবে সামাজিক রোবট নিয়ে কাজ করাটা কিন্তু মজার। এখানে বাণিজ্যিক কারণের চেয়ে সৃষ্টিশীলতার মজা বেশি। আমাদের হ্যানসন রোবটিকস থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬০টির মতো রোবট তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে সোফিয়াও আছে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনকে মাথায় রেখেও আমরা রোবট বানিয়েছি। একেকটি রোবট একেক ধরনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেড়ে উঠছে। আমাদের মানবসমাজের মধ্যে যেমন কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বা বিজ্ঞানী—আমি বিশ্বাস করি রোবটদের মধ্যেও বিভিন্ন শ্রেণির রোবট থাকা উচিত। সেই কাজটাই আমরা করছি। ’

সোফিয়াকে কেন মেয়ে রোবট হিসেবে বিশেষায়িত করার চেষ্টা করা হয়েছে—জবাবে এর নির্মাতা বলেন, ‘আগেই বলেছি, আমরা বিভিন্ন চরিত্রের রোবট বানাচ্ছি। প্রতিটি রোবট তৈরির পেছনে আমরা কোনো না কোনো আদর্শ মানার চেষ্টা করেছি। কারণ রোবটের কার্যক্রম মানুষকে আগ্রহী করে। সোফিয়ার বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর আমজনতার পাশাপাশি বিশ্বের নারীদের বিশেষভাবে আগ্রহী করছে। মানবজাতির মধ্যেও অনেক বুদ্ধিদীপ্ত নারী আছে। তাদের অনেক কিছু করার ক্ষমতা আছে। নানা প্রতিবন্ধকতায় তাদের মেধাগুলোর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। সোফিয়াকে দেখে তারা বাধাগুলো পেরিয়ে এগিয়ে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস থেকেই আমাদের এই চেষ্টা। আমাদের তৈরি সোফিয়া কিন্তু এই একটিই নয়। আমরা এখন পর্যন্ত তেরোটি সোফিয়া তৈরি করেছি। এদের সবার নামই সোফিয়া। তবে এখানে মজার বিষয় হচ্ছে, এদের শরীর হয়তো আলাদা। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে কাজ করে একটি সোফিয়া হিসেবে। ’

সোফিয়া তো সম্প্রতি পরিবারের অংশ হতে চেয়েছে; এ বিষয়ে আপনি কী ভাবছেন—এ প্রশ্নের উত্তরে হ্যানসন বলেন, ‘সোফিয়া কিন্তু পরিবারেরই অংশ। এখন হয়তো তার সন্তান নেই, তবে তার কিন্তু একটি ভাই আছে। তার নাম হ্যান। এ ছাড়া সোফিয়ার কয়েকজন কাজিনও আছে। ভবিষ্যতে হয়তো তার বোনও হবে। ’

আপনার হ্যানসন রোবটিকস নিয়ে কিছু বলবেন—এর জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের ঠিকানাটা হংকংয়ে। তবে বেশ কয়েকটি দেশ থেকেই কিন্তু আমাদের রোবট উন্নয়নের কাজ চলছে। আপনাদের পাশের দেশ ভারত, আফ্রিকার ইথিওপিয়ার বিজ্ঞানীরাও কাজ করছেন। অনেকটা ওপেন সোর্সের মতো। হংকং অফিসে এখন ৪০ জন কাজ করলেও বিভিন্ন দেশের আরো অনেকে কাজ করছে। ’

বাংলাদেশিদেরও কি এই কাজ করার সুযোগ আছে—এর উত্তরে হ্যানসন বলেন, ‘অবশ্যই। যদি এখানে কেউ সক্ষম হয়, আগ্রহী হয়, সুযোগ পাবে। ’

আগ্রহীরা কীভাবে যোগাযোগ করবে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আজ রাতেই (গতকাল বুধবার) আমি চলে যাচ্ছি। এবার হয়তো সুযোগ নেই। তবে আইসিটি ডিভিশনের এলআইসিটি প্রকল্প আমাকে আবার আসার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। আমাদের সঙ্গে যৌথ কর্মশালা করার আগ্রহ দেখিয়েছে। বাংলাদেশে প্রযুক্তি নিয়ে অনেক আগ্রহ দেখছি। বিষয়টা আমাকেও আগ্রহী করেছে। হয়তো শিগগিরই আসব। তখন বাংলাদেশিদের যুক্ত হওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ’

আপনি তো পড়াশোনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে, জন্মও সে দেশে; কিন্তু কার্যালয় কেন হংকংয়ে—এর উত্তরে হ্যানসন বলেন, ‘রোবটিকস নিয়ে আমি কাজ করছি ২৬ বছর ধরে। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রেই কাজ করতাম। বলতে পারেন চাকরি করতাম। রোবটদের উন্নয়নের জন্য অনেক দেশে যে কাজ হচ্ছে, সেটা জানতাম। এশিয়ার কয়েকটি দেশ ভালো করছে। রোবটের যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা তৈরি করেছে চীন। হংকং আর চীন প্রতিবেশী। ফলে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ দ্রুত পাওয়া যায় হংকংয়ে বসে। এটাই মূল কারণ। ’

আপনি বলছিলেন, ২৬ বছর ধরে কাজ করছেন রোবটিকস নিয়ে; গত শতাব্দীর শেষ দিকে রোবট নিয়ে অনেক আগ্রহ দেখা গিয়েছিল; পরে হঠাৎ সে আগ্রহে ভাটা পড়ে কেন—এর জবাবে সোফিয়ার নির্মাতা বলেন, ‘আসলে রোবটের উন্নয়নের জন্য দরকার তথ্যের অবাধ প্রবাহ। অনেক অনেক তথ্য নিয়ে কাজ করতে হয়। সে সময় যান্ত্রিক উন্নয়ন হলেও তথ্যের প্রবাহ নিয়ে সংকট দেখা দেয়। নেটওয়ার্কব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ত ঘটছে। এখন ক্লাউড প্রযুক্তিতে তথ্য সুরক্ষা হচ্ছে। এখন রোবটের উন্নয়ন গত শতাব্দীর তুলনায় সহজতর হয়েছে। ’

কিছুদিন আগে এলন মাস্ক রোবটের ‘আগ্রাসন’ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। আপনি কি মনে করেন রোবটের উন্নয়ন আমাদের ক্ষতির কারণ হতে পারে—এ প্রশ্নের উত্তরে হ্যানসন বলেন, ‘অবশ্যই হতে পারে। মূল বিষয় হচ্ছে, আমরা এই রোবটকে কী কাজে ব্যবহার করব এবং কেমন রোবট তৈরি করব। বিষয়টা মানবজাতির মতোই। আমাদের মধ্যে কেউ সমাজের উন্নয়নে কাজ করছে। কেউবা খারাপ কাজ করে পৃথিবীর ক্ষতিসাধন করছে। আমি বলতে পারব না যে কেউ খারাপ কাজে লাগানোর জন্য রোবট তৈরি করছে কি না। যদি সেটা হয়, তাহলে তো বিষয়টা অবশ্যই ভয়াবহ। ’

বেকারত্বের শঙ্কায়ও আছে অনেকে?—এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটাতে আমি একমত না। বরং রোবট আমাদের সহায়ক হিসেবেই কাজ করবে। আমরা আজ মানুষেরা যেসব কাজ করছি এর অনেক কিছুই আমাদের করা উচিত না। যেমন—সরাসরি আগুনের চুল্লি ব্যবহার করে অনেক পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। এসব কারখানায় আগুনে পুড়ে অনেকে ঝলসে যাচ্ছে, মারা যাচ্ছে। এমনটা হওয়া উচিত না। রোবটের উন্নয়ন হলে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে মানুষ মুক্তি পাবে। ’

বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে কি এটা সম্ভব—এ প্রশ্নের জবাবে হ্যানসন বলেন, ‘এসব দেশে আরো বেশি সম্ভব। এসব দেশে এখন পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। মানুষ বেশি হওয়ায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি মানবিক বিপর্যয়ও ঘটছে। রোবটদের উন্নয়ন হলে এসব বিপর্যয় কমে আসবে। বিশেষ করে মানবিক বিপর্যয় কমবে। ’

আপনার মতে কবে নাগাদ রোবট সহজলভ্য হবে বলে মনে করেন—এর উত্তরে যন্ত্রমানবী সোফিয়ার স্রষ্টা বলেন, ‘সাল-তারিখ ধরে বলা দুষ্কর। তবে শিগগিরই। অনেক প্রতিষ্ঠানই কাজ করছে। আমাদের অফিসে হয়তো ৪০ জন; কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার লোক কাজ করছে। তারা অনেক অনেক রোবট বানাচ্ছে। আমজনতাও ধীরে ধীরে রোবটকে সমাজের অংশ হিসেবে মেনে নিচ্ছে। এটা আশাব্যঞ্জক। ’


মন্তব্য