kalerkantho


আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে একঝাঁক মনোনয়নপ্রার্থী

আহমেদ উল হক রানা, পাবনা   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে একঝাঁক মনোনয়নপ্রার্থী

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরগরম পাবনা-৩ আসনের রাজনীতি। জাতীয় সংসদের ৭০তম এ আসনটি পাবনার ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর ও চাটমোহর উপজেলা নিয়ে গঠিত।

প্রায় চার লাখ ভোটারের এ আসনে আগামী নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে নবীন-প্রবীণ মিলিয়ে দলীয় মনোনয়নপ্রার্থীর সংখ্যা অন্তত ২৩ জন। আওয়ামী লীগের ১৩ এবং বিএনপির ১০ নেতা দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার আশায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচারের দিক থেকে এগিয়ে আছেন। তাঁরা মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে নিজের প্রার্থিতার বিষয়ে জানান দিচ্ছেন।

এ ছাড়া ভোটযুদ্ধে নামতে যাঁরা দলীয় প্রতীক চাইছেন তাঁরা এরই মধ্যে ছবি দিয়ে পোস্টার ও বিলবোর্ড করে এলাকায় এলাকায় টানিয়ে দিয়েছেন। গণসংযোগের পাশাপাশি মনোনয়ন পেতে তাঁরা যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন সংশ্লিষ্ট দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে। আওয়ামী লীগ চাইছে আসনটি ধরে রাখতে। আর বিএনপি চায় তাদের হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করতে।

মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই দলেই রয়েছে গ্রুপিং ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতার ভাগাভাগির লড়াইয়ে আওয়ামী লীগের কোন্দল প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির মধ্যে কোন্দল থাকলেও আপাতত তারা নির্বাচনের দিকে মনোযোগী। অবশ্য নেতাকর্মীরা মনে করছে, নির্বাচন এলে কোনো দলেই এই গ্রুপিং ও কোন্দল থাকবে না। আপাতত দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্যে দল গোছানোর কাজ করে চলেছেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি প্রার্থী বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান সাইফুল আযম আওয়ামী লীগের ওয়াজি উদ্দিন খানকে হারিয়ে এ আসনে সংসদ সদস্য হন। ১৯৯৬ সালে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াজি উদ্দিন খান নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়ী হন। সেই সময় বিএনপির প্রার্থী ছিলেন কে এম আনোয়ারুল ইসলাম। ২০০১ সালে বিএনপি প্রার্থী কে এম আনোয়ারুল ইসলাম আওয়ামী লীগের মকবুল হোসেনকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে পরের নির্বাচনেই জয়ের মুখ দেখেন মকবুল। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন সাইফুল আযম। ২০১৪ সালে দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী আবুল কালাম আজাদকে এক লাখ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো জয়ী হন মকবুল হোসেন।

আওয়ামী লীগ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-৩ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আছেন বর্তমান সংসদ সদস্য পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মকবুল হোসেন, সহসভাপতি আব্দুল হামিদ মাস্টার, দলের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল আলিম, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আ স ম আব্দুর রহিম (পাকন), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক বাকী বিল্লাহ, দলের চাটমোহর উপজেলা শাখার সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন (সাখো), পাবনা আইনজীবী সমিতির সভাপতি শাহ্ আলম, ফরিদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ও যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া রাজ্য শাখা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবুল কালাম আজাদ, দলের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক আতিকুর রহমান আতিক, ফরিদপুর উপজেলা শাখার সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ  চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান সরকার, একই শাখার সহসভাপতি ও পৌর মেয়র খ ম কামরুজ্জামান মাজেদ, সাধারণ সম্পাদক আলী আশরাফুল কবীর ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) পাবনা শাখার সভাপতি ডা. গোলজার হোসেন।

বর্তমান সংসদ সদস্য কৃষি মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মকবুল হোসেন বলেন, ‘আমি তিন যুগ ধরে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে আরো শক্তিশালী করতে আগামীতেও জনকল্যাণে কাজ করে যাব ইনশাআল্লাহ। দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় আমি এ পর্যন্ত এসেছি। তাই সার্বিক মূল্যায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনেও আমি মনোনয়ন পাব বলে আশা রাখি। ’

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক আবদুল আলিম বলেন, ‘সরকারের টেকসই উন্নয়ন জনসাধারণের মধ্যে তুলে ধরে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি আমি মনোনয়ন পাব। ’ তিনি আরো বলেন, ‘তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাহিদা অনুযায়ী প্রার্থী মনোনয়ন দিলে আওয়ামী লীগ এ আসনটি ধরে রাখতে পারবে। অন্যথায় জয় পাওয়া কষ্টসাধ্য হবে। তবে দল যাঁকে মনোনয়ন দেবে আমি তাঁর জন্যই কাজ করব। ’

নিজের মনোনয়ন প্রত্যাশার বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল হামিদ মাস্টার বললেন, ‘পাবনা-৩ আসনে ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলার চেয়ে চাটমোহর উপজেলায় ভোট প্রায় ৪০ হাজার বেশি। চাটমোহর আমার জন্মমাটি। ১৯৭০ সালে আমি কলেজ ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ছিলাম, ১৯৭৪ সালে জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হই। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এখনো স্বচ্ছতার সঙ্গে রাজনীতি করে যাচ্ছি। আমার চাটমোহরের ভোটাররা এবারের নির্বাচনে তাদের এলাকার মানুষকেই নির্বাচিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। ’ তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করে আরো বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক জীবন ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা উপলব্ধি করে দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে বলে আমি মনে করছি। ’

ভাঙ্গুড়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক পৌর মেয়র বাকী বিল্লাহ বলেন, ‘রাজনীতি শুরু করার পর থেকে আজ অবধি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে রাজপথে আছি। দলের দুর্দিনে সব সময়ই সক্রিয় ছিলাম। রাজনীতি করতে গিয়ে বহু অত্যাচার, জুলুম সহ্য করেছি, জেলে গেছি। আমার অতীত রাজনৈতিক ও সাংগাঠনিক কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে বলে বিশ্বাস করি। ’

বিএনপি : আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মাঠে দৌড়ে বেড়ালেও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা অনেকটাই মন্থরগতিতে প্রচার চালাচ্ছেন। দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে নির্দেশ থাকলেও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নানা হয়রানিতে মাঠে প্রচার চালাতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা। তবে তাঁরা জানান, প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও তৃণমূল পর্যায়ে গণসংযোগ এবং মনোনয়নের জন্য দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তাঁরা লবিং অব্যাহত রেখেছেন।

তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা ১০ জন। ধানের শীষের প্রার্থী হতে কেন্দ্রে তদবির চালাচ্ছেন এমন  নেতাদের মধ্যে আছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কে এম আনোয়ারুল ইসলাম, সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল আযমের ভাই এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) ফখরুল আযম, জেলা বিএনপির সহসভাপতি মাসুদ খন্দকার, সেন্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসানুল ইসলাম রাজা, চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাসাদুল ইসলাম হীরা, ফরিদপুর উপজেলা বিএনপি সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম বকুল, ভাঙ্গুড়া উপজেলা বিএনপির প্রধান উপদেষ্টা রাজিউল হাসান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রবিউল ইসলাম, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান বয়েন উদ্দীন মিয়া ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক আরিফা সুলতানা রুমা।

মাসুদ খন্দকার বলেন, ‘আওয়ামী লীগের আমলে এলাকায় উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়ন হয়নি, এলাকার মানুষ উন্নয়ন চায়। ভোটের অধিকার চায়। নিরপেক্ষ ভোট হলে এ আসনে এবার বিএনপি প্রার্থী জয়ী হবে ইনশাআল্লাহ। ’

শিল্পপতি হিসেবে চাটমোহর তথা পাবনা-৩ আসনে দলীয় বেশির ভাগ কর্মসূচিতে হাসানুল ইসলাম রাজার সহযোগিতা থাকে বলেই স্থানীয়রা জানে। পাশাপাশি বিগত দিনে তৃণমূল পর্যায়ে তিনি দলকে সংগঠিত করেছেন। এমনটাই জানাল দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তাঁর নিজস্ব ভোট ব্যাংকও রয়েছে। ফলে দলীয় মনোনয়ন পেলে পাবনা-৩ আসনটি বিএনপিকে উপহার দিতে পারবেন বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন হাসানুল ইসলাম রাজা।

আসনটিতে জাতীয় পার্টি কিংবা অন্য কোনো দলের প্রার্থীদের আনাগোনা তেমন লক্ষ করা যায়নি।


মন্তব্য