kalerkantho


রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিন, সু চিকে বললেন জাতিসংঘ মহাসচিব

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিন, সু চিকে বললেন জাতিসংঘ মহাসচিব

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রবল বৈশ্বিক চাপের মুখে পড়েছেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। সোমবার আসিয়ান সম্মেলনে বক্তব্যে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনায় তিনি গভীর উদ্বেগ না জানিয়ে পারছেন না।

তিনি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এবং আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ দেন। গতকাল মঙ্গলবার গুতেরেস ম্যানিলায় সু চির সঙ্গে বৈঠকেও এ অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। মিয়ানমারকে সতর্ক করতে তাঁর সঙ্গে ম্যানিলায় বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনও। আজ বুধবার দেশটিতে সংক্ষিপ্ত সফরে আসছেন টিলারসন। এদিকে গণহত্যা, জাতিগত নিধন, ধর্ষণ, নির্যাতন থেকে শুরু করে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নৃশংসতার ষোলো কলা পূর্ণ করা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাতমাদো এবার দাবি করেছে, গুলি ছোড়া দূরের কথা, তারা কাউকে নির্যাতনই করেনি।

গতকাল ম্যানিলায় পূর্ব এশিয়া সম্মেলনের ফাঁকে সু চির সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। চ্যানেল নিউজ এশিয়ার অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকের ছবি তোলার সুযোগে সাংবাদিকদের একজন সু চিকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক কি না’—সু চি জবাব দেননি। বৈঠকের পর টিলারসনকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি মিয়ানমারের নেতাদের জন্য জোরালো কোনো বার্তা নিয়ে দেশটিতে যাচ্ছেন কি না? টিলারসনও প্রশ্নটি এড়িয়ে শুধু বলেছেন, ‘ধন্যবাদ’।

ম্যানিলায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসন বুধবার নেপিডোয় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠকে সহিংসতা বন্ধ ও রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীলতা ফেরানোর ওপর জোর দেবেন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, ফিলিপাইনে জাতিসংঘ মহাসচিব ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাপে পড়েন সু চি। জাতিসংঘ মহাসচিব সোমবার আসিয়ান সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী এ সংকট উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এটি এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও উগ্রবাদের সম্ভাব্য ঝুঁকি। তিনি বলেন, ‘সংকটের শুরু ও সংঘাত থামা পর্যন্ত আমি ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়গুলোর জন্য অবাধ মানবিক সহায়তা এবং বাস্তুচ্যুত হয়ে পালানো ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সম্মানজনকভাবে নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকারের কথা বলছি। এ ট্র্যাজেডির অবসানে আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ’

গতকাল ম্যানিলায় সু চির সঙ্গে বৈঠকের পর জাতিসংঘ মহাসচিবের দপ্তর বলেছে, বৈঠকে সু চি ও গুতেরেস মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। গুতেরেস ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়গুলোর কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো; স্বেচ্ছায়, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসন ও প্রকৃত অর্থেই আন্ত সম্প্রদায় পুনর্মিলনের প্রচেষ্টা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনের নামে গত সোমবার মিয়ানমারের সেনবাহিনী তাতমাদো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে তারা নিজেদের অপকর্ম ও মানবাধিকার লঙ্ঘন অস্বীকার করে সব দোষ চাপিয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর। বৈশ্বিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিতর্কিত এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে মিয়ানমার বাহিনীর অপরাধগুলোর আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, রোহিঙ্গারা গত ২৫ আগস্ট রাতে মিয়ানমার বাহিনীর ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালিয়েছিল। এটি মোকাবেলায় মিয়ানমার বেশ সংযত উদ্যোগ নিয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করেনি।

দেশটির সেনাপ্রধানের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া খবরে দেখা যায়, এখনো কিছু রোহিঙ্গা রয়ে গেছে—রাখাইনের এমন কিছু গ্রামে গিয়ে তারা তদন্ত চালায় এবং গুলি না চালানো ও ধর্ষণের মতো অপরাধ না করার ভিত্তিহীন প্রতিবেদনটি দেয়। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের ‘বেঙ্গলি’ (বাংলাদেশ থেকে যাওয়া) হিসেবে অভিহিত করে বলেছে, কথিত রোহিঙ্গা জঙ্গিদের সংগঠন ‘আরসা’ অন্য রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্যদের ভয় দেখিয়ে বা জোরপূর্বক বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর সু চিকে টেলিফোন করে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন টিলারসন। গত মাসের শেষ দিকে টিলারসন সরাসরি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ককে ফোন করে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর এবং বেসামরিক সরকারকে সহযোগিতা করার তাগিদ দেন। এমন প্রেক্ষাপটে আজ টিলারসন তাঁর মিয়ানমার সফরে কী বার্তা দেন সেদিকে সবার দৃষ্টি থাকবে।

এদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোও মিয়ানমারের নেত্রী সু চির সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কথা বলার বিষয়টি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিয়ে সু চির সঙ্গে তাঁর বিশদ আলোচনা হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশের মতো কানাডাও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।

জাস্টিন ট্রুডো বলেন, ‘কিভাবে সহযোগিতা করা যায়, সহিংসতা কমানো যায়—এগুলো আমরা সব সময় দেখছি। আমরা আইনের শাসন ও সব নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করায় জোর দিচ্ছি। ’

এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মির’ হামলায় দেশটির বেশ কজন সেনা সদস্য হতাহত হয়েছে বলে জানা গেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল মাউং মাউং সোয়েকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। ওই হামলার অজুহাতে রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর তৎপরতা আরো বাড়ানো হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।

জাতিসংঘ অভিযোগ করেছে, মিয়ানমার তার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দেশছাড়া করতে ধারাবাহিকভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এটি আক্ষরিক অর্থেই জাতিগত নিধনযজ্ঞ। গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের বাহিনীর হামলায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। গতকাল সন্ধ্যায় আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এক প্রতিবেদনে বলেছে, রোহিঙ্গারা মানবপাচার ও শোষণের শিকার হয়েছে। গত ২৫ আগস্ট থেকে ছয় লাখ ১৭ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

ট্রাম্পের আহ্বান : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি মিয়ানমারকে প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তার নির্বিঘ্ন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতেও আহ্বান জানান। গত সোমবার ম্যানিলায় ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের সঙ্গে বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়েছে।

ফিলিপাইনভিত্তিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম ল্যাপলারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে রাখাইনে চলমান মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট নিয়ে কথা বলেছেন। রাখাইনে সহিংসতা বন্ধে মিয়ানমার সরকারের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়ে তাঁরা রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন ও আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।

থার্ড কমিটিতে প্রস্তাবের ওপর আলোচনা : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটির গত রাতের কার্যসূচিতে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) পক্ষে মিসর এ প্রস্তাব এনেছে। ওই প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়া ও নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে। বাংলাদেশ আশা করছে ওই প্রস্তাবটি গৃহীত হবে। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ আরো বাড়বে।


মন্তব্য