kalerkantho


এমপি কেয়া লাঞ্ছিত, অজ্ঞান হয়ে হাসপাতালে

সংঘর্ষে ৪ পুলিশ আহত

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি   

১১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



এমপি কেয়া লাঞ্ছিত, অজ্ঞান হয়ে হাসপাতালে

হবিগঞ্জের বাহুবলে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক তারা মিয়া ও তাঁর লোকজনের হাতে এ লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে।

পরে তাত্ক্ষণিক এক প্রতিবাদসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন এমপি কেয়া চৌধুরী। স্থানীয় হাসপাতালে জ্ঞান না ফেরায় উন্নত চিকিত্সার জন্য তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) ভর্তি করা হয়। গতকাল শুক্রবার রাত সোয়া ১০টা পর্যন্ত তাঁর জ্ঞান ফেরেনি।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে বাহুবল উপজেলার মিরপুর বাজারে বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠান চলাকালে লাঞ্ছনার ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষ থামাতে গেলে পুলিশের হবিগঞ্জের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রাসেলুর রহমানসহ চার পুলিশ সদস্য আহত হন। এ সময় প্রায় দুই ঘণ্টার জন্য হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

সর্বশেষ খবরে জানা যায়, গতকাল রাত সোয়া ৯টায় কেয়া চৌধুরীকে বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্সটি সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে। আগে থেকেই তাঁর জন্য হাসপাতালের আইসিইউয়ের বিশেষ শাখা হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটের (এইচডিইউ) ব্যবস্থা করা হয়।

তাঁকে সেখানেই ভর্তি করা হয়েছে। জানা গেছে, তাঁর সঙ্গে উপজেলা মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক রাহেলা বেগমও জ্ঞান হারান। তাঁকেও কেয়া চৌধুরীর সঙ্গে ওসমানী মেডিক্যালে পাঠানো হয়।

কেয়া চৌধুরীর অসুস্থতার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তাঁকে প্রাথমিক চিকিত্সা দানকারী বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক বাবুল কুমার দাস জানান, এমপির প্রচণ্ড রকম শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। অক্সিজেন দেওয়া অবস্থায় তাঁকে সিলেট পাঠানো হয়।

সিলেটে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার আবুল খায়ের চৌধুরী জানান, পূর্ব থেকেই আইসিইউ প্রস্তুত রাখা ছিল। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার এ কে মাহবুবুল আলম, ডা. সব্যসাচীসহ সিনিয়র চিকিৎসকরা তাঁকে হাসপাতালে গ্রহণ করেন। এ সময় হাসপাতালে নেতাকর্মীরা ভিড় জমায়।

গতকাল রাত সোয়া ১০টার দিকে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সব্যসাচী রায় বলেন, ‘কেয়া চৌধুরী আশঙ্কামুক্ত। তবে এখনো তাঁর জ্ঞান ফেরেনি। ’ মানসিক ও শারীরিক চাপের কারণে এমনটা হয়েছে বলেও জানান ওই চিকিৎসক।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হবিগঞ্জ সমাজসেবা অধিদপ্তরের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার বিকেলে স্থানীয় বেঁদে সম্প্রদায়ের মধ্যে অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন এমপি কেয়া চৌধুরী। সভা শুরু হলে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক তারা মিয়া ও জেলা পরিষদ সদস্য আলাউর রহমান শাহেদের পক্ষের এক তরুণ সেখানে গিয়ে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করতে থাকে। বিষয়টি এমপি কেয়া চৌধুরীর নজরে এলে তিনি ছেলেটির কাছে পরিচয় জানতে চাইলে সে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় তার হাত থেকে মোবাইলটি কেড়ে নেন এমপি কেয়া চৌধুরী। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা মিয়া সেখানে উপস্থিত হয়ে মোবাইলটি ফেরত চান। এমপি কেয়া চৌধুরী মোবাইলটি ওসির হাতে দেওয়া হবে বলে জানালে তারা মিয়া কেয়া চৌধুরীর কাছ থেকে জোরপূর্বক মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন। এ সময় ধস্তাধস্তি শুরু হলে এমপি কেয়া চৌধুরী মাটিতে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সমর্থকরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এ সময় ঢাকা-মৌলভীবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মাঝে ধাওয়াধাওয়ি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে এমপি কেয়া চৌধুরীর সমর্থকরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে সন্ধ্যায় প্রতিবাদসভার আয়োজন করে। প্রতিবাদসভায় বক্তব্য দেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল হোসেন, ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান টেনু, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আসকর আলী, ইউপি মেম্বার রাহেলা বেগমসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা।

প্রতিবাদসভায় এমপি কেয়া চৌধুরী বলেন, ‘শেখ হাসিনা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন এলাকার উন্নয়ন করার। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। তারা সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি করছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা এর প্রতিবাদ করেছি। আমাকে কেউ বাধা দিয়ে আটকাতে পারবে না। সরকারের উন্নয়নকাজ চালিয়েই যাব। ’ এইটুকু বলেই হঠাৎ তিনি অসুস্থ ও অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তখন তাঁর সমর্থকদের মধ্যে আবারও উত্তেজনা দেখা দেয়। এ সময় পুলিশ পাহারায় এমপি কেয়া চৌধুরীকে প্রথমে বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।

হামলার ঘটনার কথা স্বীকার করে যুবলীগ নেতা তাঁরা মিয়া জানান, কেয়া চৌধুরীর লোকজনও তাঁদের ওপর হামলা করেছে এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়। তিনি বলেন, এমপি কেয়া চৌধুরী জামায়াতে ইসলামীর অনুষ্ঠানে যাওয়ায় লোকজন হামলা করেছে।

তবে অনুষ্ঠানটি উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের আয়োজনে করা হয়েছিল বলে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান। স্থানীয় নেতারা জানান, এমপি কেয়া চৌধুরীর কর্মসূচিতে প্রায়ই তারা মিয়া বাধার সৃষ্টি করেন। এরই ধারাবাহিকতায় এ ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবাদসভায় বক্তৃতার আগে এমপি কেয়া চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, তিনি সরকারি একটি কর্মসূচিতে যোগদানের জন্য এসেছিলেন। তাঁর জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি মহল ন্যক্কারজনকভাবে এ হামলার ঘটনা ঘটায়। স্থানীয় লোকজন তাত্ক্ষণিকভাবে এর প্রতিবাদ করেছে। তিনি বলেন, ‘লোকজন আমার পাশে যেভাবে থেকেছে, আমি কৃতজ্ঞ। কোনো ষড়যন্ত্রই আমাকে রুখতে পারবে না। আমি সরকার ও আওয়ামী লীগের উন্নয়নকাজ করেই যাব। ’

বাহুবল-নবীগঞ্জ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রাসেলুর রহমান গতকাল রাত ৮টার দিকে জানান, দুই পক্ষের মাঝে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি নিজেসহ চার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তিনি আরো জানান, প্রতিবাদসভায় বক্তব্যের একপর্যায়ে এমপি কেয়া চৌধুরী অসুস্থ হলে তাঁকে পুলিশ পাহারায় সিলেটে পাঠানো হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে।

রাত ১১টার দিকে একই কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, এ ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়নি; কোনো মামলাও হয়নি।

হবিগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক হামদুল করিম বলেন, মিরপুরে বেদেপল্লীর লোকজনকে নিয়ে সমাজসেবা কার্যালয়ের উদ্যোগে একটি অনুষ্ঠান ছিল। সংসদ সদস্য কেয়া চৌধুরী ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নুসরাত আরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে।


মন্তব্য