kalerkantho


বুয়েট-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও মাদকের ছোবল

► মাদকসেবী শিক্ষার্থী, কর্মচারী, বহিরাগত, ছাত্রলীগের কয়েক নেতা ও পুলিশের কিছু সদস্যের মদদে গড়ে উঠেছে মাদকের আস্তানা
► ১০ মাসে ৩৫ মামলা, গত ছয় মাসে আটক ৫০ জনেরও বেশি

রফিকুল ইসলাম   

৩ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বুয়েট-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও মাদকের ছোবল

সন্ধ্যা নামলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আবাসিক হলগুলোর বিভিন্ন কক্ষে বসে মাদকের আড্ডা। বন্ধ কক্ষগুলো থেকে ভেসে আসে গাঁজা ও ইয়াবার উৎকট গন্ধ।

হলগুলোর ছাদেও একই চিত্র। আবাসিক হল পেরিয়ে আশপাশের এলাকার উদ্যান, খেলার মাঠ ও বিভিন্ন চত্বরে গেলেও এখানে-সেখানে মাদকাসক্ত তরুণদের জটলা চোখে পড়বে। মাদকের ভয়াল থাবায় দেশের শীর্ষ দুই বিদ্যাপীঠের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন তছনছ হয়ে যাচ্ছে। তারা পরীক্ষায় ফল খারাপ করছে, শিক্ষাজীবনে বিরতি পড়ছে, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং নেশার টাকা জোগাড় করতে জড়িয়ে পড়ছে চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধে।

শিক্ষার্থীরা শুরুতে কৌতূহল থেকে নেশার জগতে ঢুকলেও পরে চক্রে বাঁধা পড়ে যায়। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্টরা দায়ী করছেন মাদকের সহজলভ্যতাকে। উভয় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই হাত বাড়ালেই মেলে নানা উপকরণ। ওত পেতে থাকে মাদক কারবারিরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালায়, পুলিশ কারবারিদের আটক করে; কিন্তু থামে না মাদক বাণিজ্য।

পুলিশ বলছে, আটকের পর নানা জায়গা থেকে প্রভাবশালীদের ফোন আসে। চাপে পড়ে পুলিশ অনেক সময় অভিযুক্তদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাজু নামের চিহ্নিত এক মাদক কারবারিকে ধরিয়ে দিতে ছবিসহ পোস্টার টাঙিয়েছে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। সেই পোস্টারে রাজুর দুই সহযোগী শুভ ও অর্ণবের নামও রয়েছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহেও গাঁজা নিয়ে বিতর্কের জের ধরে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার পর বুয়েট কর্তৃপক্ষ রাজুসহ ১০-১২ জনের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে। নিরাপদ ক্যাম্পাসসহ আট দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কথা বলে এবং সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের টার্গেট করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের চারপাশে গড়ে উঠেছে মাদকের আস্তানা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, চানখাঁরপুল মোড়, পলাশী, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, বুয়েট, আনন্দবাজার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, নীলক্ষেত, কাঁটাবন ও নিউ মার্কেট এলাকায় রয়েছে মাদকের আস্তানা। অবাধে বিক্রি হচ্ছে ফেনসিডিল, ইয়াবা ও গাঁজা। এসব আস্তানা গড়ে ওঠার পেছনে হাত রয়েছে উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদকসেবী কিছু শিক্ষার্থীর। তাদের সঙ্গে জোট বাঁধে আশপাশের বহিরাগতরাও। তারা দলবেঁধে ক্যাম্পাসে মাদক সেবন করে। উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কয়েকজন প্রথম সারির নেতাও মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মচারীও মাদক কারবারে জড়িত। পুলিশের বিরুদ্ধেও টাকা নিয়ে এ কারবারে মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ছিন্নমূল শিশু-কিশোর ও রিকশাচালকদের মাধ্যমে আস্তানা থেকে মাদক বেচাকেনা চলে।  

শাহবাগ থানা সূত্র জানায়, গত ছয় মাসে ৫০ জনেরও বেশি মাদকসেবী ও বিক্রেতাকে আটক করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও ছিল। চলতি বছর এ পর্যন্ত মাদকসংশ্লিষ্ট মামলা হয়েছে ৩৫টি। মাদক কারবারিদের আটক করে মামলা দিলেও ছাড়া পেয়ে তারা আবারও একই কাজে জড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ মামলাটি হয়েছে গত ২৭ অক্টোবর চকবাজার থানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারির ঘটনায়। শাহবাগ থানার এসআই পদের এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সম্প্রতি মাদক বিক্রির খবর পেয়ে উদ্যানে একজন ছিন্নমূলকে আটক করা হলেও, ছাড়িয়ে নিতে ফোন দেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক পদের এক নেতা। এ রকম ঘটনায় আমরা কিছুই করতে পারি না। ছেড়ে দিতে হয়। ’

নীলক্ষেত ও বাবুবাজার পুলিশ ফাঁড়ি ও শাহবাগ থানা পুলিশ সূত্র জানায়, উভয় ক্যাম্পাসের আশপাশে মাদকের আস্তানা ও বিক্রি সম্পর্কে সবাই জানে। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে ছিন্নমূল ব্যবসায়ীদের ধরা হয়। কিন্তু ছাড়া পেয়ে তারা আবারও মাদক ব্যবসায় জড়ায়। মাদকসেবী শিক্ষার্থীরাই মাদকের আস্তানার নিয়ন্ত্রক। ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতাও রয়েছেন।

কয়েকটি আস্তানা ঘুরে ও মাদকসেবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরান ঢাকা, কামরাঙ্গীর চর, নাজিমুদ্দিন রোড এবং কারওয়ান বাজার থেকে আসে গাঁজা। ছিন্নমূল শিশু-কিশোর ও রিকশাচালকের হাত হয়ে তা ক্যাম্পাসে আসে। বিক্রি হয় অবাধে। ঢাকার বাইরে থেকে আসে ইয়াবা ও ফেনসিডিল। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ঢাবি ক্যাম্পাসের কিছু শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার আশ্রয়ে সাতক্ষীরা ও কক্সবাজার থেকে ইয়াবা আসে। তা ভাগাভাগি হয় ক্যাম্পাসেই। এখান থেকেই ছড়িয়ে দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও আশপাশের এলাকায়।

উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদকসেবী অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদকাসক্ত বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে নেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র কিংবা সহপাঠীদের প্ররোচনায় কৌতূহল থেকে একপর্যায়ে তারা মাদকে জড়িয়ে যায়। কেউ কেউ জড়ায় নানা হাতাশা থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের শিক্ষার্থী ইমরান কালের কণ্ঠকে জানান, হলের বন্ধু ও সিনিয়রদের সঙ্গে মিশতে গিয়ে তিনি মাদকে আকৃষ্ট হয়েছে। মাকসুদুল আলম নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বন্ধুদের বেশির ভাগই মাদকে যুক্ত হওয়ার পর আমিও ক্রমেই আসক্ত হয়েছি। ’ উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী সেলিম আক্তার জানান, ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর আশা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো বিভাগে ভর্তি হব। কিন্তু তা না হওয়ায় হতাশা থেকে ধীরে ধীরে মাদকে আসক্ত হয়েছি। এখন ঠিকমতো ক্লাসও করা হয় না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বুয়েট এলাকায় গাঁজা ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রক রাজু। সে বুয়েটের এক কর্মচারীর ছেলে। ছিন্নমূল শিশু ও রিকশাচালকদের মাধ্যমে মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ করে সে। গত সপ্তাহে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনায় রাজুরও ভূমিকা ছিল। ঘটনার পর পালিয়েছে সে। চিহ্নিত মাদক কারবারি আখ্যা দিয়ে তাকে ধরিয়ে দিতে ক্যাম্পাসে ছবিসহ পোস্টার টাঙিয়েছে শিক্ষার্থীরা। পোস্টারে শুভ ও অর্ণব নামে রাজুর দুই সহযোগীও রয়েছে।

বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী পার্থ প্রতীম দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে রাজু ক্যাম্পাসে মাদক সেবন ও বিক্রিতে জড়িত। এর আগেও সে মাদকের টাকা জোগাড় করতে এক ছাত্রের সাইকেল চুরি করেছিল। তখন প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে বলেও নেয়নি। আমরা রাজুর গ্রেপ্তার চাই, ক্যাম্পাস থেকে মাদক নিমূর্ল চাই। যত দ্রুত সম্ভব তাকে গেপ্তার করা হোক। ’

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এবং অনুসন্ধানে জানা যায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভাসমান মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করে ছিন্নমূল যুবক অলি। সে উদ্যানে পানি বিক্রি করে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদের এক নেতা তাকে আশ্রয় দেন। থানা-পুলিশের সঙ্গেও সখ্য রয়েছে অলির। সন্ধ্যা ৭টার পর উদ্যান বন্ধ হয়ে যায়। তবে তার মধ্যেও নানা কৌশলে রাত পর্যন্ত সেখানে ছিন্নমূল শিশুদের দিয়ে মাদক বিক্রি চলে। এ ক্ষেত্রে উদ্যানে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরাও জড়িত।

পলাশীকেন্দ্রিক মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ করে মাসুদ। থাকে পলাশীর পাশে আবাসিক কোয়ার্টারে। ফেনসিডিল ও ইয়াবাও পাওয়া যায় তার কাছেই।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও শিববাড়ী মাদকের বড় আস্তানা। এ এলাকায় মাদকের সরবরাহকারী মাসুম ও জহির নামের দুই ব্যক্তি। মাসুম থাকে পুরান ঢাকায়, জহির থাকে শিববাড়ীতে। জহির বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারীর আত্মীয়। চাকরির মেয়াদ শেষে ওই কর্মচারী অবসরে গেলেও জহির মাদকের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে। তাকে আশ্রয় দেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও একজন সাংগঠনিক সম্পাদক। ঢাকা মেডিক্যাল এলাকাকেন্দ্রিক মাদকের আস্তানা নিয়ন্ত্রণ করে মেডিক্যাল ও আলিয়া মাদরাসার ছাত্রলীগের কতিপয় নেতাকর্মী।

নিউ মার্কেট ১ নম্বর গেটের উল্টো দিকে মাদকের আস্তানা নিয়ন্ত্রণ করে ছিন্নমূল এক নারী। সে সেখানে পান-সিগারেট বিক্রি করে। এর আড়ালে চলে তার গাঁজার কারবার।

সম্প্রতি সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সন্ধ্যার পর থেকে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমতে থাকে মাদকের আস্তানা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই চলে গাঁজা-ইয়াবা কেনাবেচা ও সেবন। শাহবাগ থানার দক্ষিণ পাশ থেকে টিএসসি-বাংলা একাডেমি-দোয়েলচত্বর পর্যন্ত রাস্তায় সবার সামনেই অবাধে বিক্রি চলে। রাস্তার ধারে বসেই চলে গাঁজা সেবন। মাদকসেবীরা ইয়াবা সেবন করে হলে। কোনো দর-কষাকষি নেই। গাঁজার ছোট পুরিয়া ৫০ টাকায়, বড় পুরিয়া ১০০ টাকায় হাতবদল হয়। ইয়াবা নিতে চাইলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।

চানখাঁরপুল মোড় পুলিশ বক্সের পাশেই একদল ছিন্নমূল সিরিঞ্জ দিয়ে মাদক নেয়, গাঁজাও খায়। টাকা দিলেই গাঁজার পুঁটলি মিলে।

বুয়েটে শহীদ মিনারের পাশে, ফুট ওভারব্রিজের ওপরে এবং বকশিবাজার মোড়ে অবাধে চলে গাঁজা-ইয়াবা বিক্রি।

পুলিশ বিভিন্ন সময় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আবাসিক হলগুলোতে অভিযান চালায়। ২০১৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের গেট থেকে ১২৫০টি ইয়াবাসহ বহিরাগত সাতজনকে আটক করেছিল শাহবাগ থানা পুলিশ। দুটি সিএনজিতে হল থেকে এ বিশাল চালান নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা হলের ৩১১, ৩৩৭ ও ৩৩৮ নম্বর কক্ষের কথা উল্লেখ করে। ওই সময় ছাত্রলীগের মদদে হলে ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগ ওঠে। ওই সময় হল শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজনের বিরুদ্ধে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও সংগঠন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো ছাত্রলীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন।

২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে ১৫০ ক্যান বিয়ারসহ তিনজনকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে দুজন হল শাখা ছাত্রলীগের পদধারী নেতাও ছিলেন। তবে পরে ওই দুজনকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় হল শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য আইন ও পুলিশি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে পৃথক তিনটি মামলা করে শাহবাগ থানা পুলিশ।

একই বছরের ৪ মে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের এক কর্মচারীর বাসা থেকে প্রায় ২০০ ইয়াবা ও মাদক সেবনের বিপুল সরঞ্জামসহ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী দেলোয়ার হোসেন ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে শাহবাগ থানা পুলিশ।

২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলে ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে ইয়াবা সেবনকালে দুই বহিরাগতকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে হল প্রশাসন। হলের শহীদ রফিক ভবনের ২০৭ নম্বর কক্ষ থেকে তাদের আটক করা হয়। একই বছর বিজয় একাত্তর হল থেকে গাঁজাসহ এক শিক্ষার্থী ও এক বহিরাগতকে আটক করে পুলিশে দেয় প্রশাসন।

গত ৭ জুলাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে মাদক সেবনের অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থীসহ ২৬ জনকে আটক করে পুলিশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদকে আসক্ত হয়ে কোনো শিক্ষার্থীর জীবন নষ্ট হোক এটা আমরা চাই না। এসব কাজে কোনো শিক্ষার্থী জড়িত থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। থানা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে এসব নির্মূল করা হবে। ক্যাম্পাসের নিয়ম-শৃঙ্খলা ফেরাতে জোরদারভাবে কাজ করছি। ক্যাম্পাসের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নানামুখী উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. তানিয়া রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা নতুন জগতে প্রবেশ করে। তারা অজানাকে জানতে চায়। গ্রাম থেকে আসা শিক্ষার্থীরাই এ ক্ষেত্রে মাদকে বেশি আসক্ত হয়। শহরে এসে ফ্যাশন কিংবা মাদকাসক্ত বন্ধুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়েও মাদকে ঝুঁকছে অনেকে। এটা খুবই অ্যালার্মিং। প্রতিটি হলে আবাসিক শিক্ষক ও কাউন্সিলিং জোরদার করা প্রয়োজন। মাদকের অপকারিতা সম্পর্কে প্রচারণা চালাতে হবে। ’

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্রাম থেকে আসায় অনেক সময় কেউ কেউ মনে করে অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চললে গ্রুপ থেকে বাদ পড়বে, এমন শঙ্কা থেকেই একপর্যায়ে তারা মাদকে যুক্ত হয়। যারা মাদকাসক্ত তারা অপরাধেও যুক্ত হয়ে পড়ে। মাদকের সরবরাহ কমাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপর হতে হবে। খেলাধুলাসহ সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়াতে হবে। ’

বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. সত্য প্রসাদ মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্যাম্পাসে মাদকের ব্যবসার বিষয়টি আমরা জানতাম না। কারা এই বিষয়ে জড়িত তা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে সত্য বেরিয়ে আসবে। তার আগে এ বিষয়ে কিছুই বলা যাবে না। ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্যাম্পাসকে মাদকমুক্ত করা আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। ক্যাম্পাসের শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ছাত্রলীগের দেওয়া ১৯ দাবির মধ্যে একটি ছিল মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস। এই মাদক ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত কিংবা ছাত্রলীগের কেউ থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ’

বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ কনক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকেই বুয়েট ক্যাম্পাসে রিকশাচালক ও ছিন্নমূল মানুষ মাদক বিক্রি করে। পুরান ঢাকার কিছু মানুষও এর সঙ্গে যুক্ত। দেখলেও কখনো কেউ কিছু বলেনি। সম্প্রতি এই নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছে। এই মাদক কারবারির সঙ্গে এক কর্মচারীর ছেলে জড়িত রয়েছে বলে জানা গেছে। ’

শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান সব সময় চলে। এ এলাকায় মাদকের বিক্রেতারা মূলত ভাসমান মানুষ। সবাইকে চেনা যায় না। তবে নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অভিযান চালিয়ে অনেককে আটকও করি। কিন্তু জামিনে বের হয়ে তারা আবারও এ কাজে জড়ায়। ’


মন্তব্য