kalerkantho


শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে সুষমার উদ্বেগ

মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা ফেরত নিতেই হবে

► সহায়তা দেবে ভারত
► দুই এমওইউ স্বাক্ষর

কূটনৈতিক প্রতিবেদক    

২৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা ফেরত নিতেই হবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গতকাল গণভবনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সাক্ষাৎ করেন। ছবি : পিএমও

রাখাইন রাজ্যের চলমান সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন, মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত হয়ে যেসব মানুষ বাংলাদেশে এসেছে তারা ফিরে গেলেই সেখানে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে। তিনি বলেছেন, রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতির একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো সেখানে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং এ ক্ষেত্রে ভারত সহায়তা দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

সুষমা স্বরাজ গতকাল রবিবার তাঁর ঢাকা সফরের প্রথম দিন বিকেলে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শক কমিশনের চতুর্থ সভা শেষে দেওয়া বক্তব্যে এ কথা বলেন।

এর পর সন্ধ্যায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে সুষমা স্বরাজ বলেছেন, মিয়ানমার থেকে আসা বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী (রোহিঙ্গা) বাংলাদেশের জন্য বোঝা। মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে।

সুষমা স্বরাজ এমন এক সময় ঢাকা সফর করছেন যখন প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক  সম্প্রদায়ের সমর্থন চেয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে যৌথ পরামর্শক কমিশনের সভা শেষে সুষমা স্বরাজ তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করেননি, তেমনি তাদের ‘শরণার্থীও’ বলেননি। বরং তিনি ‘বাস্তুচ্যুত’ শব্দ ব্যবহার করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ইঙ্গিত করেছেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্যরা যে মিয়ানমারেরই জনগোষ্ঠী তারও ইঙ্গিত ছিল সুষমার বক্তব্যে।

জানা গেছে, যৌথ পরামর্শক সভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের ও  সুষমা স্বরাজ ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।

সভায় মাহমুদ আলী রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারকে চাপ দেওয়ার জন্য ভারতের প্রতি অনুরোধ জানান। বৈঠক শেষে মাহমুদ আলী বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজার জন্য আমরা চেষ্টা করছি যাতে রোহিঙ্গারা তাদের দেশে ফিরে যেতে পারে। সে জন্য আমি ভারতের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন মিয়ানমারকে চাপ দেয়। ’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা দেওয়ায় ভারতকে ধন্যবাদ জানান। পানিসম্পদ খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পানিসম্পদ আমাদের দুই দেশের বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করার উপাদান হিসেবে কাজ করবে। আমরা তিস্তাসহ দুই দেশের যৌথ নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা ভারতকে মনে করিয়ে দিয়েছি, দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, আমাদের দুই সরকারের সময়েই তিস্তা চুক্তি সই হবে। ’

পরে সুষমা স্বরাজ তাঁর বক্তব্যে দৃশ্যত পানিবণ্টন চুক্তির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমরা অনিষ্পন্ন কিছু ইস্যু সম্পর্কেও অবগত। আমি আপনাদের আশ্বাস দিচ্ছি যে আমরা সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। ’

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষ দিকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের লাখ লাখ রোহিঙ্গার জন্য ভারতের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের (অপারেশন ইনসানিয়াত) প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, ভারত সব সময় বাংলাদেশের প্রয়োজনে এগিয়ে এসেছে। মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ লোককে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে, ভারত এ দেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি বলতে পারি, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতায় ভারত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। জনগণের কল্যাণের কথা মাথায় রেখে সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য আমরা আহ্বান জানিয়েছি। ’

সুষমা স্বরাজ আরো বলেন, ‘এটি স্পষ্ট যে বাস্তুচ্যুত জনগণ রাখাইন রাজ্যে ফিরে গেলেই কেবল স্বাভাবিকতা ফিরবে। আমাদের (ভারতের) দৃষ্টিতে রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত সব সম্প্রদায়ের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এমন ত্বরিত আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামো উন্নয়ন সাধনই এ পরিস্থিতির একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। ’

সুষমা স্বরাজ বলেন, ভারত এ ক্ষেত্রে রাখাইন রাজ্যে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলে চিহ্নিত প্রকল্পগুলোতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। কফি আনানের নেতৃত্বে বিশেষ পরামর্শক কমিশনের প্রতিবেদনে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নকেও ভারত সমর্থন করেছে।

সুষমা স্বরাজ তাঁর বক্তব্যে বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম একক সফর ছিল বাংলাদেশে। এবার তাঁর দ্বিতীয় সফর। বাংলাদেশে আসা তাঁর জন্য সব সময়ই আনন্দের। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ভারত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে। মানবিক প্রচেষ্টার দৃশ্যত সব খাতেই আজ আমাদের অংশীদারি আছে। মৈত্রীর বন্ধনে দুই দেশ আবদ্ধ। সার্বভৌমত্ব, সাম্য, বিশ্বাস ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে এ সম্পর্ক স্ট্র্যাটেজিক মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

সুষমা স্বরাজ বলেন, যৌথ পরামর্শক কমিশনের বৈঠকে উভয় দেশ পারস্পরিক বিশ্বাস ও বোঝাপড়ার পরিবেশে আলোচনা করেছে। উভয় দেশ অভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেছে। এগুলোর অন্যতম হলো সন্ত্রাস, উগ্রবাদ ও কট্টরপন্থা।

সুষমা স্বরাজ বলেন, ‘সব পর্যায়ে সহিংস উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সমন্বিত উদ্যোগ ও কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করার মাধ্যমে আমরা উভয়েই ঘৃণা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসের আদর্শের ঝুঁকি থেকে আমাদের সমাজগুলোকে রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। ’ তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরের সময় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো দুই দেশের অন্যান্য সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, নিরাপত্তা, কানেকটিভিটি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, জাহাজ চলাচল, মানুষে মানুষে যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে অগ্রগতিতে সন্তুষ্টির কথা জানান সুষমা।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারত বাংলাদেশের পুরনো ও বিশ্বাসযোগ্য উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে আছে। তিনটি ঋণ রেখার আওতায় ভারত এ পর্যন্ত বাংলাদেশকে ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা দিয়েছে। এটি বিশ্বব্যাপী ভারতের সর্বোচ্চ উন্নয়ন সহায়তা। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রকল্পগুলোতে মঞ্জুরি সহায়তাও দিচ্ছে। গত তিন বছরেই ভারতের মঞ্জুরি সহায়তায় ২৪টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। বর্তমানে আরো ৫৮টি প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। আজ সোমবার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও কমিউনিটি উন্নয়ন খাতে আরো ১৫টি প্রকল্প উদ্বোধন করা হবে বলে জানান সুষমা।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাংলাদেশকে ভারতের সহযোগিতায় সন্তুষ্টির কথাও জানিয়েছেন সুষমা স্বরাজ। তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব এবং প্রতিবেশীদের পরস্পরকে সহযোগিতা করতে হবে—এমন বোঝাপড়ার কারণে আমরা অনেক অর্জন করেছি। ভারত বর্তমানে বাংলাদেশের জনগণের প্রয়োজনে ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। অদূর ভবিষ্যতে এটি যদি তিন গুণও না হয়, অন্তত দ্বিগুণ হবে। ’

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের জনগণের স্বার্থে আমরা ইতিমধ্যে মঞ্জুরি প্রকল্পের আওতায় শিলিগুড়ির সঙ্গে পার্বতীপুরের পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন সংযোগ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ’ তিনি বলেন, ১৯৬৫ সাল পূূর্ববর্তী সড়ক, রেল, পানি ও জাহাজ চলাচল পথগুলো আবার সচল করার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে কানেকটিভিটি বাড়ানো হচ্ছে। ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের চলাচলের সংখ্যা বেড়েছে। খুলনা ও কলকাতার মধ্যে বন্ধন এক্সপ্রেস শিগগিরই চালু হবে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি লোক ভারতে যায়। গত বছর বাংলাদেশে ভারতীয় মিশন ৯ লাখ ৭৬ হাজার ভিসা ইস্যু করেছে। এ বছর এ সংখ্যা ১৪ লাখে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই আমাদের সহযোগিতার সম্পর্ক। আমাদের দুই দেশের সহযোগিতা ও একযোগে লড়াই করা গর্বের বিষয়। বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানাতে ভারত পাঁচ বছরমেয়াদি মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা দিচ্ছে। ভারতে তাদের চিকিৎসার একটি স্কিমও আমরা চালু করেছি। ’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী বলেছেন, ‘আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য আজ আমরা নতুন কিছু প্রস্তাব রেখেছি। ভারত সেগুলো ইতিবাচক দৃষ্টিতে বিবেচনার কথা বলেছে। ’

ঢাকা-চেন্নাই-কলম্বো বিমান চলাচল, চট্টগ্রাম-কলকাতা-কলম্বো জাহাজ চলাচল, পঞ্চগড়-শিলিগুড়ি রেল যোগাযোগ, ভারতীয় ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে ভুটানের সঙ্গে ইন্টারনেট যোগাযোগ, বাংলাদেশের নাকুগাঁও স্থলবন্দর থেকে ভারতের ডলু হয়ে ভুটানের গাইলেফুং স্থলবন্দরের সঙ্গে বাণিজ্য যোগাযোগের কথা রয়েছে ওই প্রস্তাবে।

এর আগে গতকাল দুপুরে সুষমা স্বরাজ ঢাকায় এসে পৌঁছলে বঙ্গবন্ধু বিমানঘাঁটিতে তাঁকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী। আজ সোমবার তিনি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের নতুন চ্যান্সারি কমপ্লেক্স উদ্বোধন করবেন ও অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। এরপর দুপুরেই তাঁর ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।

দুটি এমওইউ সই : যৌথ পরামর্শক কমিশনের সভা শেষে বাংলাদেশ ও ভারত দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে। এগুলোর একটি ভারতের এইচএমটি ও খুলনার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের মধ্যে কারিগরি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠাবিষয়ক। এর আওতায় খুলনায় দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র চালু করতে ভারত সরকার ৯ কোটি ৯৭ লাখ রুপি মঞ্জুরি সহায়তা দেবে। অন্য এমওইউটি বাংলাদেশে গ্যাস-অয়েল সরবরাহের জন্য ভারতের নুমালিগর রিফাইনারি ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মধ্যে বিক্রয়-ক্রয় চুক্তি।

এ ছাড়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে ভারত ১০ কোটি টাকার চেক হস্তান্তর করেছে। ‘প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অর্থরিটি’ (পিআইডাব্লিউটিটি) কাঠামোর আওতায় অভ্যন্তরীণ নৌপথ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশকে ওই অর্থ দেয় ভারত।

এদিকে বাংলাদেশ ‘ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স’ (আইএসএ) চুক্তি অনুস্বাক্ষর-সংক্রান্ত দলিল গতকাল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে হস্তান্তর করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সুষমা স্বরাজের সৌজন্য সাক্ষাৎকালে কী কথা হয়েছে তা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবিশ কুমারের আলাদা টুইট বার্তা সূত্রে জানা যায়। তিনি লিখেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কই ভারতের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এ সম্পর্ক আরো জোরদার করার উপায় নিয়ে তাঁরা আলোচনা করেছেন। সুষমা স্বরাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাঁর ভারত সফরের পর থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অর্জিত অগ্রগতি এবং যৌথ পরামর্শক কমিশনের সভায় ফলপ্রসূ আলোচনার কথা জানিয়েছেন। তাঁরা বাংলাদেশে রাখাইন রাজ্যের বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর ঢল নামার ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং দ্রুত ও টেকসই সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করেন।

এদিকে ভারতীয় হাইকমিশন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, রাখাইন রাজ্যের বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, অনুপ্রবেশ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রতি ভারত সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। ‘অপারেশন ইনসানিয়াতের’ আওতায় ভারত প্রায় পাঁচ লাখ লোকের জন্য এক হাজার টন ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, সুষমা স্বরাজ জোর দিয়ে বলেছেন যে ভারত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতিতে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। রাখাইন রাজ্যে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসা এবং যত দ্রুত সম্ভব এর টেকসই সমাধান নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক।

মোদির বার্তা জানালেন : শেখ হাসিনার সঙ্গে সুষমা স্বরাজের সাক্ষাতের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিকে উদ্দেশ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে আপনার একটা উজ্জ্বল ভাবমূর্তি আছে, সেটা যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়। ’

ইহসানুল করিম আরো জানান, সুষমা স্বরাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে বলেছেন, মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের নাগরিকদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে হবে। এটা বাংলাদেশের জন্য বোঝা। বাংলাদেশ এই বোঝা কত দিন বইবে? এর একটি স্থায়ী সমাধান হওয়া উচিত।

সংকটের স্থায়ী সমাধানে রাখাইনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবদান রাখা উচিত বলেও মন্তব্য করেন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সন্ত্রাসীদের শাস্তি দিতে পারে, নিরীহ মানুষকে নয়। ’

নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের প্রশংসা করেন সুষমা। প্রধানমন্ত্রী একাত্তর সালে বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের ভারতে আশ্রয় দেওয়ার কথা স্মরণ করেন। এ ছাড়া তিনি স্মরণ করেন মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার কথাও। সে জন্য দেশটির নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

শেখ হাসিনা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে উদ্বাস্তু হিসেবে দেশের বাইরে যে দীর্ঘদিন ছিলেন সে কথাও বৈঠকে উল্লেখ করেন।

বাসস জানায়, ভারতীয় ঋণে বাংলাদেশে যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হওয়ার কথা সেগুলোতে কিছুটা দেরি হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সুষমা স্বরাজ জানিয়েছেন।


মন্তব্য