kalerkantho


ঢাবি ‘ঘ’ ইউনিট

রাত ৩টায় প্রশ্ন পরীক্ষা শুরুর আগে উত্তর

ছাত্রলীগ নেতাসহ আটক ১৫

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

২১ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



রাত ৩টায় প্রশ্ন পরীক্ষা শুরুর আগে উত্তর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা যে প্রশ্নপত্রে হয়েছে তা আগের রাতেই পেয়ে গেছে ভর্তীচ্ছু অনেক শিক্ষার্থী। গতকাল শুক্রবার অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গে আগের রাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল পাওয়া গেছে।

আবার পরীক্ষায় এটিএম কার্ডের মতো দেখতে ডিভাইসের মাধ্যমে জালিয়াতির ঘটনাও ঘটেছে। জালিয়াতিতে জড়িত অভিযোগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহসম্পাদক মহিউদ্দিন রানাসহ ১৫ জনকে আটকও করা হয়েছে। রানাকে জালিয়াতচক্রের হোতা হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর রানাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছে ছাত্রলীগ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও জালিয়াতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি স্বীকার করছে না কর্তৃপক্ষ। নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হবে কি হবে না সে ব্যাপারেও কিছু জানায়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

গতকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ৫৩টি এবং ক্যাম্পাসের বাইরের ৩৩টি কেন্দ্রে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার আগের রাত ৩টার দিকে প্রশ্নপত্রের ইংরেজি অংশের ২৪টি প্রশ্ন ই-মেইলের মাধ্যমে অনেক ভর্তীচ্ছুর কাছে পাঠানো হয়।

প্রশ্ন ফাঁসচক্রের সদস্যদের যারা টাকা দিয়েছে তারাই পেয়েছে এ প্রশ্ন। আর গতকাল সকালে পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টাখানেক আগে নির্দিষ্ট ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনে এসএমএস করে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তর পাঠানো হয়।

গতকাল পরীক্ষার আগে অনেক কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, মোবাইল ফোনে অনেক ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থী প্রশ্নের উত্তর পড়ছিল। পরীক্ষার পরে এর সঙ্গে প্রশ্নপত্রের উত্তরের মিল পাওয়া গেছে।

ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে দেখা গেছে, ইংরেজি অংশে প্রথম প্রশ্ন ছিল, “হোয়াট ইজ দ্য মিনিং অব দি ইডিয়ম ‘টু ফলো ইয়োর নোজ’?”; তৃতীয় প্রশ্ন ছিল, ‘দ্য হাইওয়ে এজেন্স...বেড ওয়েদার...’; চতুর্থ প্রশ্ন ছিল, ‘ফারহানা স্পিকস ইংলিশ ফ্লুয়েন্টলি,...সি নোজ ফ্রেঞ্চ’; অষ্টম প্রশ্ন ছিল, ‘জার্মানি হ্যাজ ওন দ্য ফুটবল ম্যাচ...’; ২০ নম্বর প্রশ্ন ছিল, ‘অ্যা পিস অব কেক মিনস। ’

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক এম আমজাদ আলী বলেন, ‘প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে কেন্দ্রে বিতরণ পর্যন্ত এই কাজটি অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে করা হয়, যেটা ফাঁস হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ’

‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রধান সমন্বয়কারী ও সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁসের কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। তবে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। ’ 

জালিয়াতির ডিভাইস, ছাত্রলীগ নেতাসহ আটক ১৫ : গতকালের পরীক্ষায় এটিএম কার্ডের মতো দেখতে ডিভাইসের মাধ্যমে জালিয়াতি করায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরে ১০টি কেন্দ্র থেকে ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে দুজন বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী। তাঁদের একজন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহসম্পাদক রানা এবং অমর একুশে হল শাখা ছাত্রলীগের কর্মী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দুই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ তদন্ত দল বাদী হয়ে মামলা করবে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক এম আমজাদ আলী।

আটক বাকি ১৩ জন হলেন নূর মোহাম্মদ মাহবুব, ফরহাদুল আলম রাফি, ইশরাক হোসেন রাফী, আব্দুল্লাহ আল মুকিম, রিশাদ কবির, আছাদুজ্জামান মিনারুল, ইসতিয়াক আহমেদ, জয় কুমার সাহা, রেজওয়ানা শেখ শোভা, মাশুকা নাসরিন, তারিকুুল ইসলাম, নাসিরুল হক নাহিদ ও মিরাজ আহমেদ। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাঁদের এক মাসের বিনা শ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী হাকিম তৌহিদ এলাহী এ সাজা দেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই ১৩ জনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, আনোয়ারা বেগম মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয় ও টিচার্স ট্রেনিং কলেজ কেন্দ্র থেকে আটক করা হয়।

সূত্র জানায়, জালিয়াতির জন্য পরীক্ষার আগের রাতে পরীক্ষার্থী সংগ্রহ ও ডিভাইস আদান-প্রদানের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ হল থেকে রানাকে এবং অমর একুশে হল থেকে মামুনকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম। রানা পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। আর মামুন ফলিত রসায়ন বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।

ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর এম আমজাদ আলী বলেন, পরীক্ষা চলাকালে কয়েকজন পরীক্ষার্থী জালিয়াতির চেষ্টা করেছে। তাদের আটক করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সিআইডির সংঘবদ্ধ তদন্ত দল মামলা করবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাদের বহিষ্কার করা হবে।

ছাত্রলীগ নেতা রানা বহিষ্কার : ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির ঘটনায় আটক ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহসম্পাদক মহিউদ্দিন রানাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গতকাল ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হুসাইন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেছেন, ছাত্রলীগে কোনো দুষ্কৃতকারীর স্থান নেই।

 


মন্তব্য