kalerkantho


ইসির সঙ্গে সংলাপে আ. লীগের ১১ দফা

বর্তমান সীমানায় ইভিএমে নির্বাচন

বিশেষ প্রতিনিধি   

১৯ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



বর্তমান সীমানায় ইভিএমে নির্বাচন

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল ইসির সঙ্গে সংলাপে যোগ দেয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

সংবিধান অনুসারে বর্তমান সীমানায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব রেখেছে আওয়ামী লীগ। সেনা নিয়োগ প্রশ্নেও দলটি বর্তমান ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে অনাগ্রহী।

আওয়ামী লীগের ব্যাখ্যা, প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ করা যাবে ১৮৯৮ সালের প্রণীত ফৌজদারি কর্যবিধির ১২৯ থেকে ১৩১ ধারায় এবং সেনা বিধিমালা ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায়। এ ছাড়া নির্বাচন পরিচালনায় কেবল প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বশীল কর্মচারীদের প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব রেখেছে আওয়ামী লীগ।

নির্বাচন ভবনে গতকাল বুধবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে ২১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ইসির সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে এসব প্রস্তাব রাখে। প্রতিনিধিদলে আরো ছিলেন আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, এইচ টি ইমাম, ড. মসিউর রহমান, ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, রমেশ চন্দ্র সেন, সাবেক কূটনীতিক মো. জমির, মো. রশিদুল আলম, মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, এইচ এন আশিকুর রহমান, ড. হাছান মাহমুদ, ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ ও অ্যাডভোকেট এ বি এম রিয়াজুল কবির কাওছার।

১১ দফা প্রস্তাব : নির্বাচন কমিশনের কাছে দেওয়া আওয়ামী লীগের ১১ দফা প্রস্তাবের মধ্যে আছে : ১. ইংরেজি ভাষায় প্রণীত ‘দ্য রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডার, ১৯৭২’ ও ‘দ্য ডিলিমিটেশন অব কনস্টিটিউয়েন্সিস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬’-এর বাংলা সংস্করণ প্রণয়নের উদ্যোগ (নির্বাচন কমিশনের) প্রশংসনীয়। এতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সমর্থন থাকবে। ২. নির্বাচনে অবৈধ অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার রোধে সংবিধানে বর্ণিত নির্বাচনসংক্রান্ত নির্দেশনা ও বর্তমান নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচন করা। ৩. প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত এবং নির্বাচনী দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার অপেশাদার ও দায়িত্বহীন আচরণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ। ৪. নির্বাচন পরিচালনায় কেবল প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বশীল কর্মচারীদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার নিয়োগ।

৫. তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনে আগ্রহী প্রার্থীদের বাছাই করে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী চূড়ান্ত করা। ৬. নির্বাচনে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও সতর্কতা অবলম্বন। কোনোভাবেই কোনো বিশেষ দল বা ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যশীল হিসেবে পরিচিত বা চিহ্নিত ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংস্থাকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে দায়িত্ব প্রদান না করা। ৭. নির্বাচনের দিন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াসহ সব গণমাধ্যমকর্মীর নির্বাচনী বিধি-বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দায়িত্ব পালনের জন্য কার্যকর নির্দেশনা, গণমাধ্যমকর্মীদের উপযুক্ত পরিচয়পত্র প্রদান ও তাঁদের দায়িত্ব, কর্ম এলাকা নির্ধারণ করা। ৮. দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের ভোটের তিন দিন আগে এনআইডি ও ছবিসহ তালিকা দেওয়া এবং প্রিসাইডিং অফিসার কর্তৃক তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে ভোটকক্ষে প্রবেশ ও নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করা। ৯. নির্বাচনে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটের ব্যবস্থা করা। ১০. তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন এবং ইসি নির্ধারিত নির্বাচন-পরবর্তী সময়ের জন্য প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর ওপর ন্যস্ত থাকবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোন পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ করা যাবে তা ১৮৯৮ সালের প্রণীত ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৯ থেকে ১৩১ ধারায় এবং সেনা বিধিমালা ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ শিরোনামে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। ১১. সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি বিশেষ করে আদমশুমারির সঙ্গে সম্পর্কিত। সর্বশেষ ২০১১ সালে আদমশুমারির ওপর ভিত্তি করে (যা ২০১৩ সালে প্রকাশিত) ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন আদমশুমারি ছাড়া পুনরায় সীমানা পুনর্নির্ধারণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে বিভিন্ন আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। কমিশন নিশ্চয় অবগত আছে যে ২০১৮ সালের শেষের দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ অবস্থায় ৩০০ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের মতো জটিল কাজ সময় স্বল্পতার কারণে শেষ করা সম্ভব হবে কি না তা বিবেচনায় নেওয়া অত্যাবশ্যক।

আওয়ামী লীগের মূল প্রস্তাবনায় বলা হয়, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ই ১৯৭২ সালে প্রণীত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশসহ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, যার অধীনে ১৯৭৩ সালে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

প্রস্তাবনায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে বলা হয়, এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই, হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের হোতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সংবিধান ও সেনা আইন লঙ্ঘন করে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের সংবিধান ও সকল প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দেন। শুরু হয় স্বৈরশাসন।

এই স্বৈরশাসক তাঁর অবৈধ ক্ষমতা দখলকে বৈধতা দেওয়ার অভিপ্রায়ে ১৯৭৭ সালের ৩০ মে হাঁ/না ভোটের আয়োজন করেন। জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে তাঁর নিয়োজিত সন্ত্রাসী বাহিনী নির্বিচারে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভরে তোলে। প্রহসনের এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ যেমন তাদের ভোটাধিকার হারিয়ে ফেলেন অন্যদিকে সকল গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিনষ্ট হয়ে যায়। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত, যখন জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ক্ষমতা দখলকারী অপর স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনকালের অবসান ঘটে।

১৯৮১-১৯৯১ সাল পর্যন্ত জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার যে সংগ্রাম করে আসছিলেন স্বৈরশাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে তার প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয়। জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সরকার পরিচালনায় রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন ঘটে। ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে বিভিন্ন প্রক্রিয়া শুরু হলেও এর কার্যকর প্রতিফলন ঘটতে শুরু করে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় থেকে।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের পর সাবেক স্বৈরাচারের রাজনৈতিক দল বিএনপি, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সক্ষম হয়। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ঢাকা (মিরপুর ও তেজগাঁও) ও মাগুরার উপনির্বাচনে এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সকল রাজনৈতিক দল কর্তৃক বর্জিত ও ভোটারবিহীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে নজিরবিহীন কারচুপি ও অন্যায় সংঘটিত হয় তা বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা করে।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর এই প্রথম দেশ পরিচালনায় বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের সব স্তরের কার্যকর পুনর্গঠন শুরু হয়।

২০০১ সালের ১ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে পরাজিত করার জন্য পরিকল্পিত উপায়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। এ সময় নির্বিচারে আওয়ামী লীগ সমর্থক বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় তাদের নির্বাচনী এলাকা থেকে বিতাড়িত, অনেককে পঙ্গু ও হত্যা করা হয়। শিশু পূর্ণিমা, রাজুফা, ফাতেমা, মাহিমাসহ অগণিত নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ এর নামে নির্বিচারে অত্যাচার ও অনেককে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়।

২০১০ সালে আদালতের নির্দেশনায় বিএনপি-জামায়াতের নারকীয় তাণ্ডবের বিষয়ে তদন্ত করে দেখার জন্য একটি বিশেষ বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করা হয়। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাসী দ্বারা ৪৩ জেলায় ৬২টি স্থানে ৩৪২ শিশুকে ধর্ষণ, নির্বিচারে গণধর্ষণ, লুণ্ঠন, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হামলার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটে।

২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনকালে একদিকে ‘বাংলাভাই’-র নেতৃত্বে জঙ্গিবাদ ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা তার স্বরূপে আবির্ভূত হয়, অন্যদিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক দুর্নীতি ও দুঃশাসনে বাংলাদেশ প্রায় একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। প্রায় এক কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার দিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট যে ভোটার তালিকা তৈরি করে তা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নিকৃষ্ট প্রহসন।  

কিন্তু আবারও গণ-আন্দোলনের মুখে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের পতন ঘটে এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনকালে (২০০১-০৬) আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল এবং মহাজোটের অন্যান্য শরিকদল নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে একটি অভিন্ন রূপরেখা ঘোষণা করে। এই রূপরেখায় ৩০ দফা সুপারিশ করা হয়। পরে ওই ৩০ দফাকে ২৩ দফা দাবি হিসেবে নিয়ে আসা হয়। ওই ২৩ দফার ওপর ভিত্তি করেই ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের প্রচলন, নির্বাচনে পেশিশক্তি ও অর্থের ব্যবহার বন্ধ, প্রার্থীর সম্পদের বিবরণী প্রকাশ, চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরপরই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ বন্ধ, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধির তালিকা প্রণয়ন এবং সেখান থেকে মনোনয়ন প্রদান, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্য থেকে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার নিয়োগসহ বিভিন্ন সংস্কার সাধন করা হয়। ভৌতিক ভোটার তালিকা থেকে এক কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার বাদ দেওয়া হয়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জয়যুক্ত হয়ে পুনরায় রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে। শুরু হয় নতুন দিনের পথচলা। ১৯৭১-৭৫ এবং ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে যেসব জনমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল তা পুনরায় প্রাণ ফিরে পায়। ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানকে’ স্বরূপে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, আইন সভা ও নির্বাহী বিভাগসহ সব স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি সাধনে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে শুরু করে।

১৯৭২ সালের গ্রণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ প্রণীত হওয়ার পর দীর্ঘ সময়ে নির্বাচনসংক্রান্ত দু-তিনটি অধ্যাদেশ/আইন প্রণয়ন করা হলেও প্রয়োজনীয় সব আইন বা অধ্যাদেশই আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৯-২০১৬ সময়ের মধ্যে সম্পাদিত হয়েছে। জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত প্রায় ৩২টি অধ্যাদেশ/আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ওই সময়ের বিরোধীদলের নেত্রী খালেদা জিয়াকে নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন সরকারে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। এমনকি তাদের পছন্দনীয় নির্বাহী বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণেরও প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোটনেত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ও দেশের বিরাজমান সব আইন-কানুনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন।

বিএনপি-জামায়াতের এই অশুভ জোট নির্বাচন বা নির্বাচনকালীন সরকারে অংশগ্রহণের পরিবর্তে নির্বাচন প্রতিহত করার নামে সারা দেশে এক নজিরবিহীন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে মেতে ওঠে। নির্বাচনকেন্দ্র, গণপরিবহন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের যানবাহন ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনায় পেট্রলবোমা মেরে সারা দেশে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এমনকি সরাসরি গণমানুষকে লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে; যার ফলে বহু মানুষ নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ ও অসংখ্য মানুষ মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে।

বিএনপি-জামায়াত জোট এবং তাদের পূর্বসূরি স্বৈরশাসকদের শাসনকাল পর্যালোচনা করলে একটি বিষয়ে সহজেই পরস্ফুিট হয়ে ওঠে, সেই অপশক্তি কখনোই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী নয়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংবিধানের আলোকে গণতন্ত্র ও জনমানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রতিবেশী বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও আইনের মাধ্যমে একটি কার্যকর নির্বাচন কমিশনে পরিণত করা হয়েছে।   

ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়নসহ দেশে নির্বাচনপ্রক্রিয়ার নানা উন্নয়নের তথ্য জানিয়ে প্রস্তাবনায় আরো বলা হয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সাংবিধানিক পদের অধিকারীদের সমন্বয়ে সার্চ কমিটির মাধ্যমে ইলেকশন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে সর্বাধিক সক্ষমতা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হচ্ছে। নির্বাচনে জনমানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিতকল্পে দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।


মন্তব্য