kalerkantho


মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে মিয়ানমার সেনারা

► হত্যা ধর্ষণ নিপীড়ন উচ্ছেদের প্রমাণ পেয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
► সাত দেশের অনুরোধে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক কাল

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে মিয়ানমার সেনারা

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর দেশটির সেনাবাহিনী যে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে, তাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বলে আখ্যায়িত করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ)। সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধের চারটি ক্ষেত্র হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও বল প্রয়োগে উচ্ছেদের বিপুল প্রমাণ মিলেছে বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।

একই সঙ্গে রোহিঙ্গা নির্যাতনে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এইচআরডাব্লিউ। এ ছাড়া মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর অবিলম্বে অবরোধ ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে নিরাপত্তা পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে সাত দেশের অনুরোধে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে আগামীকাল বৃহস্পতিবার আবারও বৈঠকে বসছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। বৈঠকে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলবেন সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এইচআরডাব্লিউর ওয়েবসাইটে সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী গুরুতরভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর যে নিপীড়ন চলেছে তা আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। সেনাবাহিনীর দ্বারা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রগুলো হলো—১. কোনো জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ বা স্থানান্তরিত ও বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য করা, ২. হত্যা, ৩. ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সন্ত্রাস এবং ৪. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম স্ট্যাচুর বিবেচনায় নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড করা।

প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ ও বাস্তুচ্যুতির প্রমাণ হিসেবে বলা হয়, আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে এ পর্যন্ত চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ৫০ জনের বেশি রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকার নেয়, যারা বলেছে, মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী তাদের গ্রামে ঢুকে আক্রমণ করেছে, গুলি ছুড়ে মানুষকে হত্যা ও আহত করেছে, বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে।

তাই জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে তারা পালিয়ে এসেছে। স্যালেটাইটের মাধ্যমে পাওয়া ছবিতে গ্রাম পোড়ানোর প্রমাণও পেয়েছে এইচআরডাব্লিউ।

রোহিঙ্গাদের হত্যার প্রমাণ হিসেবে এইচআরডাব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অনেকে রাখাইনে সেনাবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত হত্যার ঘটনা প্রত্যক্ষ করার বর্ণনা দিয়েছে। মংডু থেকে আসা ৩২ বছর বয়সী মোমেনা বলেছেন, তিনি ২৬ আগস্ট বাংলাদেশে এসেছেন। সেনাবাহিনী গ্রামে আক্রমণ করলে তিনি তাঁর সন্তানকে নিয়ে লুকিয়ে ছিলেন। সেনারা চলে যাওয়ার পর তিনি দেখতে পান, ৪০-৫০ জন গ্রামবাসীর রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে, যাদের মধ্যে তাঁর বাবা এবং অনেক শিশু-কিশোরও রয়েছে।

ওসমান গনি (২০) নামের আরেক রোহিঙ্গা এইচআরডাব্লিউকে জানান, যখন তাঁদের গ্রামে সেনারা হামলা চালায় তখন তিনি ও তাঁর পাঁচ বন্ধু পাহাড়ে গবাদি পশু চড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পান, হেলিকপ্টার থেকে গ্রামে কিছু ফেলা হচ্ছে। এতে তাঁর চার বন্ধু মারা যায়। তিনি আহত অবস্থায় বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।

হাসিনা (২০) নামের আরেক রোহিঙ্গা নারী জানান, আগস্টের শেষ দিকে মিয়ানমার সেনারা তাঁর গ্রাম তু লার তু লিতে আক্রমণ করে। এ সময় মানুষজন দৌড়ে পালানো শুরু করলেও অনেকেই সেনাদের হাতে ধরা পড়ে যায়। তিনি নিজে অন্তত কয়েক ডজন মানুষের রক্তাক্ত লাশ দেখেছেন। সেনাদের হাতে ধরে পড়েন তিনিও। ধর্ষণের চেষ্টা চালায় সেনারা। একপর্যায়ে শাশুড়ি, ননদ ও আরো বেশ কয়েকজন নারী ও শিশুর সঙ্গে তাঁকে একটি ঘরে বন্দি করে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় সেনারা। আগুনে দগ্ধ হয়ে কোনো রকমে জীবন নিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আসেন তিনি।

এ রকম অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, নিরপেক্ষ প্রতিবেদন, ছবি ও ভিডিওতে মিয়ানমার সেনাদের হত্যাযজ্ঞের প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে এইচআরডাব্লিউ। এমনকি মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষে মিয়ানমারের ভেতর ল্যান্ড মাইন পুঁতে পলায়নরত রোহিঙ্গাদের হত্যার প্রমাণ পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সন্ত্রাসের প্রমাণ সম্পর্কে বলা হয়, জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থার স্বাস্থ্যকর্মীরা পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানিয়েছেন, সেনা অভিযান শুরুর পর বাংলাদেশে যেসব রোহিঙ্গা নারী আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সেনাদের যৌন সন্ত্রাসের শিকার হয়ে গুরুতর আহত কয়েক ডজন নারী ও মেয়ে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এক নারী হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেন, আরো চার নারীর সঙ্গে তাঁকে সেনারা ধরে নিয়ে একটি ঘরে আটকে রাখে। অস্ত্রের মুখে তাঁদের গণধর্ষণ করে সেনারা। এর পর সেই ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেখান থেকে শুধু তিনি একা কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছেন।

একজন রোহিঙ্গা পুরুষ জানান, তিনি তাঁর গ্রামে তিন নারীকে সেনাদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হতে দেখেছেন। একই গ্রামের দুই নারী এইচআরডাব্লিউকে জানান, সেনারা তাঁদের ধরে নিয়ে একটি ঘরে আটকে রেখেছিল। সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান আরো বহু নারীকে সেনারা নগ্ন করে নিয়মিত নির্যাতন চালাচ্ছে। মারাত্মক আহত দেহ নিয়ে কোনো রকমে পালিয়ে এই দুই নারী বাংলাদেশে এসেছেন বলে জানান।

রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের প্রমাণ হিসেবে এইচআরডাব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, সহিংসতা ও মানুষের মৌলিক অধিকারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এমন উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ডগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে। কয়েক দশক ধরে মিয়ানমার সরকার রাখাইনে বসবাস করা বেশির ভাগ নাগরিককে বিদেশি বলে বিবেচনা করেছে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, নাগরিকত্ব থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ভিত্তিতে রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিনের মিয়ানমারের শাসনতান্ত্রিক বৈষম্যের সম্মুখীন হয়েছে। যেহেতু রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নেই, তাই মিয়ানমার পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও স্থানীয় কর্মকর্তারা নিয়মিত রোহিঙ্গাদের ওপর খবরদারি করেছে। স্বাধীনভাবে চলাফেরায় বাধা, এমনকি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায়ও তারা বঞ্চিত হয়ে আসছে। সেনাদের অভিযান শুরুর পর রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা নিয়ে মানবিক সংস্থা এগিয়ে যেতে চাইলেও সরকার সেখানে তাদের যেতে বাধা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আইসিসি রোম স্ট্যাচুর সংজ্ঞা অনুযায়ী, মানবতাবিরোধী অপরাধ হলো এমন এক উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ড, যা বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিস্তৃত ও কাঠামোবদ্ধ হামলার মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়। এ ধরনের হামলা অবশ্যই রাষ্ট্রীয় অথবা সাংগঠনিক নীতির অংশ। আন্তর্জাতিক আইনি বিচারব্যবস্থা অনুযায়ী এ হামলা হতে হবে বিস্তৃত অথবা কাঠামোবদ্ধ। হামলার বিস্তৃতির মানে হলো ‘অপরাধের মাত্রা কিংবা ঘটনার শিকার মানুষের সংখ্যা’ এবং কাঠামোবদ্ধ হামলা দিয়ে বোঝায় ‘পদ্ধতিগত পরিকল্পনা’।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মানবতাবিষয়ক আইনে বলা আছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ যে কেবল সামরিক হামলার ক্ষেত্রে হবে তা নয়। কারণ, মানবতাবিরোধী অপরাধ সশস্ত্র সংঘাতমূলক প্রেক্ষাপটের মধ্যে কিংবা এর বাইরেও হতে পারে। তা ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধ মানে যে কেবল একটি এলাকার গোটা জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা পরিচালনা করা, তা নয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মনে করে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর বিস্তৃত ও কাঠামোবদ্ধ হামলা চালিয়েছে। আগে স্যাটেলাইটে ধারণকৃত ছবিতে দেখা গেছে, যে এলাকায় জ্বালাও-পোড়াওয়ের আলামত পাওয়া গেছে তা রাখাইন রাজ্যের ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে নভেম্বরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জ্বালাও-পোড়াওয়ের তৎপরতা নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরিত ও বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য করেছে। আইসিসি পূর্ববর্তী সব বড় বড় আন্তর্জাতিক অপরাধের দলিলেই বিতাড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

এইচআরডাব্লিউ লিগ্যাল অ্যান্ড পলিসি ডিরেক্টর জেমস রস বলেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে। সেখানে গণহত্যা ও রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায়কে দ্রুত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ’

কাল নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক : এদিকে সাত দেশের অনুরোধে মিয়ানমারে চলা সহিংসতা নিয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসছে নিরাপত্তা পরিষদ। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কাজাখস্তান, সেনেগাল ও সুইডেনের অনুরোধে এই বিশেষ বৈঠক বসতে যাচ্ছে। বৈঠকে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলবেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

এর আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিষয়টি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর দ্রুত সহিংসতা বন্ধ করতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগস্ট কয়েকটি পুলিশ পোস্ট ও সেনা ক্যাম্পে হামলার অভিযোগে নৃশংস সেনা অভিযান শুরু হলে এখন পর্যন্ত চার লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। জাতিসংঘ রাখাইনে চলা এই সেনা অভিযানকে ‘জাতিগত নিধন’ বলে দাবি করেছে। গত সপ্তাহে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ এই অভিযানকে ‘গণহত্যা’ নামে অভিহিত করেন।


মন্তব্য