kalerkantho


নতুন করে নিধনযজ্ঞের এক মাস

এত রোহিঙ্গা বাঁচাতে বিশ্বকে পাশে চায় বাংলাদেশ

গাউস রহমান পিয়াস   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



এত রোহিঙ্গা বাঁচাতে বিশ্বকে পাশে চায় বাংলাদেশ

‘মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা, নিহত ৮৯, বাংলাদেশে ফের রোহিঙ্গার ঢল’—গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংসতা শুরুর পর এভাবেই প্রথম সংবাদটি দিয়েছিল কালের কণ্ঠ। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে পাঠানো সে প্রতিবেদনে সীমান্তের ওপার থেকে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ ভেসে আসা, দলে দলে রোহিঙ্গার বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা, এক হাজারের মতো রোহিঙ্গার সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে পড়ার খবর ছিল।

তথ্য ছিল কিছু রোহিঙ্গাকে ঢুকতে না দিয়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোরও। রাখাইনে কথিত রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার জবাবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী অভিযানে নামলে রোহিঙ্গারা পালাতে শুরু করেছিল। তখনো বিশ্ববাসী ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি, ওপারে কী মাত্রায় নিধনযজ্ঞ চলছে। এরপর এক মাসেরও কম সময়ে সোয়া চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশে—এও ছিল কল্পনাতীত। প্রবল আন্তর্জাতিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার নমনীয় ভাব দেখালেও সমস্যার সমাধান সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোও বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে জাতিসংঘ।

গতকালই জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপো গ্র্যান্ডি কক্সবাজারে আশ্রিত কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে দেখার পর বলেছেন, এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার জন্য এখন প্রয়োজন পড়বে ‘ব্যাপক (ম্যাসিভ) আন্তর্জাতিক সহযোগিতার।

 গতকাল ইউএনএইচসিআরের প্রধান ফিলিপো গ্র্যান্ডির দেওয়া হিসাব অনুসারে গত এক মাসে বাংলাদেশে চার লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করে। শনিবার বাংলাদেশে এসে গতকাল রবিবার কক্সবাজার যান ফিলিপো।

আশ্রিত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থা দেখে তিনি বলেন, ‘এখন তাদের এত বেশি কিছুর প্রয়োজন যে দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছি। তাদের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, থাকার জায়গা ও যথার্থ স্বাস্থ্যসেবা দরকার। ’ ফিলিপো বলেন, বাংলাদেশের মানুষও অবিশ্বাস্য পরিমাণে সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে, তবে তা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখন এগিয়ে আসতে

 হবে। এখনো রোহিঙ্গারা আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই স্রোত আর কত দিন চলবে তা বলা কঠিন।

এক মাসের ঘটনাপ্রবাহ : আগে থেকেই অবস্থানরত পাঁচ লাখের মতো রোহিঙ্গার কারণে বাংলাদেশ নানা সমস্যা মোকাবেলা করে আসছিল। নতুন করে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ শুরু হওয়ায় তাত্ক্ষণিক কূটনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত অং মিন্তকে ডেকে সীমান্ত এলাকায় যৌথ অভিযানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তাতে সাড়া দেয়নি দেশটির সরকার। এরই মধ্যে রোহিঙ্গার স্রোত আরো তীব্র হয়। রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বিবৃতি দেন। ১০ দিনে ঢুকেছে অন্তত ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা—সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে এ তথ্য আসে। মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়লেও চীন তাদের পক্ষে থাকার কথা জানা যায়। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সানু সু চিকে হুঁশিয়ারি দেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। ৪ সেপ্টেম্বর খবর আসে মাত্র একদিনেই ৩৫ হাজার রোহিঙ্গার বাংলাদেশে প্রবেশের। ৫ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।

পরদিনও প্রধানমন্ত্রী একই আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি রবার্ট ডি ওয়াটকিনসের বিদায়ী সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে। নতুন করে মিয়ানমারের আনুমানিক এক লাখ ২৬ হাজার নাগরিক বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হিসেবে অনুপ্রবেশ করেছে জানিয়ে ওয়াটকিনস বলেন, ‘সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। ’ এদিকে ১২ দিনের মধ্যে চতুর্থবারের মতো মিয়ানমারের দূতকে ডেকে ঢাকা প্রতিবাদ জানায়। অনুপ্রবেশের স্রোত তীব্র হতে থাকায় সিদ্ধান্ত হয় সব রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের।

৮ সেপ্টেম্বর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর চলা সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র। তীব্র হচ্ছিল আন্তর্জাতিক প্রতিবাদও। মর্মস্পর্শী এক খোলা চিঠিতে সু চিকে মানবিক হতে বললেন শান্তিতে আরেক নোবেলজয়ী ডেসমন্ড টুটু। তিনি বলেন, ‘আমি এখন বৃদ্ধ, জরাগ্রস্ত। আনুষ্ঠানিকভাবে সব কিছু থেকে অবসর নিয়েছি। কিন্তু সর্বজনীন বিষয়ে নীরব থাকার যে অঙ্গীকার আমি করেছিলাম, তোমার দেশে রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের দুর্দশা দেখে গভীর দুঃখের সঙ্গে সেই নীরবতা আমি ভাঙছি। ’

৮৫ বছর বয়সী টুটু সু চিকে ছোট বোন সম্বোধন করে বলেন, ‘আমার হূদয়ে তুমি অত্যন্ত প্রিয় ছোট বোন। কয়েক বছর ধরেই তোমার একটি ছবি আমার টেবিলে আছে। এই ছবি আমাকে ন্যায়বিচার এবং মিয়ানমারের মানুষের প্রতিশ্রুতি ও ভালোবাসার জন্য তোমার নিজেকে উৎসর্গ করার কথা মনে করিয়ে দেয়। ’ শান্তিতে নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাইও টুইটারে এক বিবৃতিতে বলেন, মিয়ানমারের ঘটনায় তাঁর ‘হূদয় ভেঙে যাচ্ছে’। তিনি এ বিষয়ে সু চির দ্রুত পদক্ষেপ চান।

এদিকে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধের জন্য মুসলিম দেশগুলোর জোট ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) মহাসচিব ড. এ আল-ওথাইনমিন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। চিঠিতে দাবি ছিল কফি আনানের নেতৃত্বে মিয়ানমারের রাখাইনবিষয়ক কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নেরও। আন্তর্জাতিক ত্রাণের অভাবে দুর্দশা বাড়ছিল আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদেরও। রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে আসছিল নৃশংসতার অবিশ্বাস্য খবর। তারা বলছিল, রাখাইন রাজ্যের বাতাসে এখন লাশের গন্ধ। গ্রামের পর গ্রাম জ্বলছে। নারীদের ওপর চালানো হচ্ছে ধর্ষণের মতো গর্হিত অপরাধ। সীমান্ত ঘেঁষে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মাইন পোঁতার মতো গা শিউরে ওঠার খবরও আসে। মাইনের ওপর জুসের প্যাকেট, কম দামি মোবাইল ফোনের সেটের মতো জিনিস রেখে ফাঁদ পাতা হচ্ছিল। মাইন বিস্ফোরণে এক সপ্তাহেই মারা গেছে ছয় রোহিঙ্গা। এদিকে মিয়ানমারে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার (বিশেষ দূত) রাখাইনে এক হাজারের বেশি মানুষ হত্যার শিকার হয়েছে বলে আশঙ্কা করেন। আমস্টারডাম ভিত্তিক ইউরোপিয়ান রোহিঙ্গা কাউন্সিল বলে, ‘গণহত্যা নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের মধ্যেও মিয়ানমার হত্যাযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগ অব্যাহত রেখেছে। ’ ৯ সেপ্টেম্বর রাখাইনের পরিস্থিতি এবং ‘শরণার্থী’র ঢলে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয় ভারত।

১০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ রোহিঙ্গাদের নিজ আবাসভূমিতে ফেরা নিশ্চিত করতে মুসলিম বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সম্প্র্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ সংগঠন ওআইসির প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে। একই দিন ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মিয়ানমারের লাখ লাখ রোহিঙ্গার চাপ সামলাতে বাংলাদেশকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দেবে ভারত।

১১ সেপ্টেম্বর সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেন, ‘মানবিক কারণে আমরা অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দিয়েছি। তবে এই সমস্যা সৃষ্টির জন্য দায়ী মিয়ানমার সরকারকেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। ’

এই দিনই সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৩৬তম অধিবেশনের শুরুতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার জায়িদ রা’দ আল হুসেইন বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ চলছে, কোনো জাতিকে নির্মূলের আক্ষরিক উদাহরণ (‘টেক্সটবুক এক্সামপল’)।

১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণকালে বলেন, সন্ত্রাসী হামলার অজুহাতে রাখাইনে লাখ লাখ নিরীহ রোহিঙ্গার ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন চালানো হচ্ছে। নিপীড়নের শিকার হয়ে এখন দেশটির লাখ লাখ নাগরিক বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। মিয়ানমারের এই আচরণ মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

এদিকে আরো বাড়ছিল বৈশ্বিক নিন্দা। খবর আসে মহাত্মা গান্ধীর নাতি ইলা গান্ধী এবং ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির নিন্দা জ্ঞাপনের। খামেনি বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের মধ্য দিয়ে নোবেল পুরস্কারের মৃত্যু উদ্যাপন করা হচ্ছে। তিনি মিয়ানমারের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে মুসলিম দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।

১৩ সেপ্টেম্বর চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ ৪২ দেশ ও মিশনের ৬৩ জন কূটনীতিক ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখতে কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে বিবৃতিতে মিয়ানমারে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের সময় অতিরিক্ত মাত্রায় সংঘাত-সহিংসতা হয়েছে উল্লেখ করে এখনই তা বন্ধ করার আহ্বান জানায়। রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের সহায়তা দেওয়ার প্রচেষ্টা এবং জাতিসংঘ ও অন্য সংস্থাগুলোর তত্পরতাকেও নিরাপত্তা পরিষদ স্বাগত জানিয়েছে।

১৪ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট (ইপি) মিয়ানমার পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানায় এবং অবিলম্বে রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন ও বাড়িঘরে আগুন দেওয়া বন্ধ করতে বলে। পার্লামেন্ট সদস্যরা সু চির নোবেল শান্তি পুরস্কার ও শাখারভ পুরস্কারের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং তাঁর নীরব ভূমিকার সমালোচনা করেন।

১৫ সেপ্টেম্বর মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্যাটেলাইটে পাওয়া কিছু ছবি প্রকাশ করে বলে, তিন সপ্তাহ ধরে রাখাইনে গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো এই সহিংসতা চালাচ্ছে—তথ্য দিয়ে সংস্থাটি বলেছে, ওখানে যা চলছে, তা নিশ্চিতভাবেই ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। ’ এদিন বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা নিধনে সু চির দল সেনা ও রাখাইন একাট্টা হয়েই এসব অপকর্ম করছে।

১৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৭২তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র নজরুল ইসলাম এএফপিকে জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যু তুলে ধরবেন, তিনি রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলকে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টিরও আহ্বান জানাবেন। এই দিন ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকীয়তে রোহিঙ্গা সমস্যাকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ব্যাপক ও নিষ্ঠুর জাতিগত নিধনের ঘটনা বলা হয়। মিয়ানমারের পোড়ামাটি নীতির কারণে উত্তর রাখাইনের ৪৭১টি গ্রামের মধ্যে ১৭৬টি পুরোপুরি খালি করে দেওয়ার কথা দেশটির সরকারি ভাষ্যেই স্বীকার করা হয়।

১৭ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের সেনাপ্রধান রোহিঙ্গাদের তাদের দেশ থেকে উত্খাতের উদ্দেশ্যে পরিচালিত সশস্ত্র আক্রমণকে তাদের ‘শুদ্ধিকরণ অভিযান’ বলে উল্লেখ করেন। এদিকে বহির্বিশ্বের চাপ আরো বেড়ে চলছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সামনে রেখে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে চাপে ফেলতে তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি না করা এবং সেনা মালিকানার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করতে এদিন দাবি জানায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ)। সংগঠনটি মিয়ানমার ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতেও সব দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলে, রাখাইনে নিধনযজ্ঞের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তোলার কৌশল নিয়েও নিরাপত্তা পরিষদকে আলোচনা করতে হবে। একই অবস্থান থেকে নিউ ইয়র্ক টাইমস ‘স্কুইজ মিয়ানমারস মিলিটারি’ শিরোনামে সম্পাদকীয় ছাপে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও মিয়ানমারের অবরোধ আরোপের আহ্বান জানায়।

১৮ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জাতিগত নিধনযজ্ঞ নিয়ে দেশটিকে কঠোর বার্তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা। একই দিন রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে কোনো প্রত্যাশা নেই বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে; কিন্তু এ বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করছেন না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ ধনী দেশ নয়। তবে যদি আমরা ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারি, আরো পাঁচ অথবা সাত লাখ মানুষকে খাওয়াতে পারব। ’ নিউ ইয়র্কে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন।

১৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে সু চি সেনাবাহিনীকে সমর্থন করে বক্তব্য দেন, তিনি রোহিঙ্গা নামটিও মুখে আনেননি। ওই দিনই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের বৈঠকে বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ চলছে। সমাধানে প্রধানমন্ত্রী কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নসহ ছয়টি প্রস্তাব তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। ’

সু চির নোবেল পুরস্কার কেড়ে নেওয়ার বিশ্বজোড়া দাবির মধ্যেই ২০ সেপ্টেম্বর খবর আসে যুক্তরাজ্যের ট্রেড ইউনিয়ন সু চিকে দেওয়া সম্মানসূচক সদস্য পদ বাতিল করেছে। অক্সফোর্ড শহর থেকে দেওয়া ‘ফ্রিডম অব দ্য সিটি’ খেতাব স্থগিত করা হবে জানিয়ে তাঁকে চিঠি দেওয়া হয়। জানা যায়, সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি স্থগিতের চিন্তা করছে ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ও।

২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের দেওয়া ভাষণে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি মিয়ানমারের ওপর দ্রুত চাপ তৈরি করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।

২২ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা গণহত্যা, ধর্ষণ, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে মিয়ানমার সরকার তথা দেশটির স্টেট কাউন্সেলর ও সেনাপ্রধানকে দোষী সাব্যস্ত করেন মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক গণ-আদালত। ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গাদের জরুরি ভিত্তিতে ফিরিয়ে নিতে রাজি হয় মিয়ানমার, তবে শর্ত দেয় ১৯৯৩ সালের চুক্তি অনুসরণের। রাজধানী নেপিডোয় সু চির সঙ্গে আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। সর্বশেষ ২৪ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গাদের এক লাখ ঘর গড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয় তুরস্ক সরকার এবং জাতিসংঘ জানায় এক মাসে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা চার লাখ ৩৬ হাজার।


মন্তব্য