kalerkantho


রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিকতার প্রশংসা শেখ হাসিনাকে

পাশে থাকার আশ্বাস বিশ্বনেতাদের

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



পাশে থাকার আশ্বাস বিশ্বনেতাদের

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে এসডিজি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন। ছবি : পিআইডি

নৃশংস দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমারের ওপর দ্রুত চাপ তৈরি করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো অব্যাহত রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সংস্থাটির ৭২তম সাধারণ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষমতাধর বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে যেসব বৈঠক ও সেমিনারে অংশ নিচ্ছেন, সবখানেই তিনি রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরছেন।

মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসার পাশাপাশি সহযোগিতার আশ্বাসও মিলছে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে। স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় (বাংলাদেশ সময় আজ শুক্রবার ভোরে) জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার কথা শেখ হাসিনার। তাঁর এই ভাষণেও রোহিঙ্গা ইস্যুটিই প্রাধান্য পাবে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ও বুধবার বিভিন্ন সময় আলাদা আলাদাভাবে যুক্তরাজ্য ও নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী, তুরস্ক ও এস্তোনিয়ার প্রেসিডেন্ট, নেদারল্যান্ডসের রানি ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মহাপরিচালকের সঙ্গে শেখ হাসিনার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কথা হয়েছে বলে পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক জানিয়েছেন।

এর আগে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কথা হয়। এ ছাড়া মুসলিম দেশগুলোর জোট ওআইসিসহ বেশ কিছু সেমিনারে অংশ নিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগস্ট কয়েকটি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে হামলার পর দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নতুন করে দমন অভিযানে নামে। সেনাবাহিনীর চলমান অভিযানে গত প্রায় এক মাসে চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তারা বলছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছে।

রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ এবং গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

রাখাইনে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ চলছে জানিয়ে জাতিসংঘ এরই মধ্যে মিয়ানমারকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বলছে, রাখাইনে ‘গণহত্যা’ চলছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে ‘বলিষ্ঠ ও দ্রুত’ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের বরাত দিয়ে বুধবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এ তথ্য জানিয়েছেন। এর আগের দিনই জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে শেখ হাসিনার কথা হয়।

স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে সংস্থাটির মহাপরিচালক উইলিয়াম ল্যাসি সুইং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফিরে যেতে হবে। ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে আপনারা আন্তর্জাতিক প্রেসার তৈরি করুন। ’

বাংলাদেশে ত্রাণ তৎপরতায় অংশ নেওয়া জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যে আইওএম শীর্ষে রয়েছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়ে আইওএমের মহাপরিচালক জানান, আগামী ৫ ও ৬ অক্টোবর তিনি বাংলাদেশ সফর করবেন।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘উনি (উইলিয়াম) এটাও বলেছেন, সবাই এখন চেষ্টা করছে অং সান সু চির ওখানে গিয়ে তাঁকে বলতে যে এটা (দমন-পীড়ন) বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে যেতে। ’

এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে ওআইসির কোর কমিটির বৈঠকের পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠক হয়। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুট ক্যাভুফোগলুও উপস্থিত ছিলেন। এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক জানান, বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান ও প্রশংসা করেন। এরদোয়ান বলেছেন, ‘তুর্কি জনগণ বাংলাদেশের দুঃখকষ্টে সব সময় পাশে থাকবে। রোহিঙ্গাদের জন্য তুরস্ক সাধ্যমতো সহায়তা করে যাবে। ’

ওই দিন সন্ধ্যায় কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেন শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে টেরেসা মের সঙ্গে শেখ হাসিনার রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয় বলে বাংলানিউজের খবরে বলা হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে জাতিসংঘ মহাসচিবের দেওয়া মধ্যাহ্নভোজের পর নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইরানা সোলবার্গ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন। পররাষ্ট্রসচিব জানান, বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। মানবিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে সহায়তা দেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী ইরানা।

বুধবার সকালে এস্তোনিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্টসি কালজুলাইদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে আইসিটি খাতে সহযোগিতা জোরদারের ব্যাপারে আলোচনার পাশাপাশি অন্যান্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন।

ওই দিন বিকেলে নেদারল্যান্ডসের রানি ও জাতিসংঘের অর্থায়নবিষয়ক বিশেষ দূত ম্যাক্সিমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পররাষ্ট্রসচিব জানান, রানি ম্যাক্সিমা ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন ম্যাক্সিমা। প্রধানমন্ত্রীর আইসিটিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব আহমেদ ওয়াজেদ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এসডিজির জন্য বেসরকারি খাতের অর্থায়ন জরুরি এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন তার জোগান দেওয়া সরকারগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চাহিদা ও সামর্থ্যের এই ব্যবধান ঘোচাতে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে গত বুধবার ‘ক্রিয়েটিং অ্যা পলিসি ভিশন ফর এসডিজি ফিন্যান্স : ফ্যাসিলিটেটিং প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট ইন দ্য এসডিজিস’ শীর্ষক এক বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপির সহযোগিতায় বাংলাদেশ ও কানাডার যৌথ আয়োজনে উচ্চপর্যায়ের এ বৈঠক হয়।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আংকটাডের তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবছর বিশ্বের ৩ দশমিক ৩ থেকে ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার দরকার হবে। এই অর্থ সংগ্রহ করা সরকারগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। অর্থায়নের এই ঘাটতি পূরণে বেসরকারি খাতকে লাগবে।

শেখ হাসিনা বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জিডিপির ৬০ শতাংশ, পুঁজিপ্রবাহের ৮০ শতাংশ ও কর্মসংস্থানের ৯০ শতাংশ এরই মধ্যে বেসরকারি খাতের দখলে। তাই এসডিজির অর্থায়নের জন্য বেসরকারি খাতের অংশীদারি জরুরি।

এ বৈঠকের পাশাপাশি এদিন ‘এসডিজি ইমপ্লিমেন্টেশন, ফিন্যান্সিং অ্যান্ড মনিটরিং : শেয়ারিং ইনোভেশনস থু্র সাউথ-সাউথ অ্যান্ড ট্রায়াঙ্গুলার কো-অপারেশন’ শিরোনামে একটি বৈঠকে যোগ দেন শেখ হাসিনা।


মন্তব্য