kalerkantho


আ. লীগ-বিএনপির পুরনোরাই মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে

সীমান্ত সাথী, দিনাজপুর থেকে ফিরে   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আ. লীগ-বিএনপির পুরনোরাই মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে

উত্তর জনপদের সীমান্তঘেঁষা উপজেলা চিরিরবন্দর-খানসামা নিয়ে দিনাজপুর-৪ আসন। আগামী সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি প্রার্থীদের নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা চলছে।

কারণ যাঁরা মনোনয়ন পাওয়ার আশা করছেন এলাকায় তাঁদের যাতায়াত বেড়েছে। তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়, ছবি দিয়ে পোস্টার ও ব্যানার করে এলাকায় এলাকায় লাগানো, জ্যেষ্ঠ নেতাদের আনুকূল্য লাভের চেষ্টা—সম্ভাব্য প্রার্থীদের এসব তত্পরতা চোখে পড়ছে।

জাতীয় সংসদের ৯ নম্বর আসনটিতে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। তাঁর বাড়ি খানসামায়। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সরকারি বা জাতীয় অনুষ্ঠানে এলাকায় আসেন। ব্যস্ততার কারণে তাঁর এলাকায় যাতায়াত কম বলে দলে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আছে। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় আছেন সংসদে আওয়ামী লীগের সাবেক হুইপ ও কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মানু। তাঁরা ছাড়াও আছেন নতুন মুখ চিকিত্সক আমজাদ হোসেন।

অন্যদিকে সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান মিয়া ও হাফিজুর রহমান হাফিজ আছেন বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকার শীর্ষে। বিএনপি জোটের মনোনয়নের অন্যতম দাবিদার হয়ে উঠতে পারেন জামায়াত নেতা মো. আফতাব উদ্দিন মোল্লা ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) নেতা আশরাফ আলী খান।

অবশ্য জাতীয় পার্টির কারো নাম এখনো আলোচনায় আসেনি।

উল্লেখ্য, চিরিরবন্দর ও খানসামা উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের মধ্যে বেশির ভাগ এলাকাই একসময় জামায়াত-বিএনপির দুর্গ ছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পরেই জামায়াতের ঘাঁটি ছিল চিরিরবন্দর-খানসামা। জামায়াত-শিবির চিরিরবন্দর-খানসামাকে সন্ত্রাস আর তাণ্ডবের রাজত্বে পরিণত করেছিল। ওই সময় পুলিশের গুলিতে জামায়াতের এক নেতার মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে চিরিরবন্দরে। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চিরিরবন্দরে জামায়াতের আমির মো. আফতাব উদ্দিন মোল্লা বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করেন।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সংসদ সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী আবার মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তাঁর পক্ষে নেতাকর্মীরা নিয়মিত দলীয় কর্মসূচি ছাড়াও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করায় সাধারণ জনগণ ও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা তাঁর প্রতি বেশ দুর্বল। তিনি মনোনয়ন পেলে দল আবার জিতবে—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের কয়েকজন।

চিরিরবন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহসানুল হক মুকুল ও খানসামা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সফিকুল ইসলাম লায়ন চৌধুরীসহ নেতাকর্মীরা নিজ নিজ উপজেলার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে ঘুরে আবুল হাসান মাহমুদ আলীর পক্ষে কাজ শুরু করেছে।

অন্যদিকে সাবেক হুইপ ও কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান মানু নির্বাচন করার আশায় মাঠে আছেন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিতর্কের জন্ম দেন এ নেতা। ওই নির্বাচনে মাত্র সাড়ে চার হাজার ভোট পান তিনি। জয়লাভ করেন নৌকা প্রতীকের আবুল হাসান মাহমুদ আলী। সংস্কারপন্থী হিসেবে সে সময় দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়ার কারণে নেতাকর্মীরা মানুর প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল। তবে এসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠে তিনি মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে শামিল হয়েছেন।

জানতে চাইলে মিজানুর রহমান মানু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান এমপি তো এলাকায় যান না। তিনি কোনো নেতাকর্মীকেও তেমনভাবে চেনেন না। চিরিরবন্দর-খানসামার মানুষের হূদয়ে আমার নাম আছে। আগামী নির্বাচনে নৌকার মাঝি বদল না করলে বিজয় সম্ভব নয়। কারণ মানুষের সুখে-দুঃখে সব সময় পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। যতটুকু পারি সাহায্য-সহযোগিতা করি। তাই আগামী দিনে নৌকার মাঝি হয়ে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে চাই। ’

চিরিরবন্দরে নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমেনা বাকী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও ঢাকা ল্যাবএইড হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম আমজাদ হোসেনও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে তদবির শুরু করেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছেন তিনি।

মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. এম আমজাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শ বুকে লালন করি। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে আহত হয়েছিলাম। এত দিন এলাকার মানুষ প্রার্থী হওয়ার জন্য অনুরোধ করছিল। তাদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য প্রাণপ্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন চাইব। যদি আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাই তাহলে এলাকার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চেষ্টা থাকবে সবার আগে। বিগত দিনে এখানে যারাই ক্ষমতায় ছিল তারাই আমাকে হেয় করার চেষ্টা করেছে। এখন সাধারণ মানুষের দাবি, আমি প্রার্থী হলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে এমপি নির্বাচিত হব। এ কারণে জনগণের সঙ্গে আছি। ’ মনোনয়ন না পেলেও তাদের সঙ্গে থাকবেন বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে ২০০১ সালে নির্বাচিত বিএনপি-জামায়াত জোটের সংসদ সদস্য মো. আখতারুজ্জামান মিয়া আছেন দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায়। বিএনপির এ নেতাও ২০০৬ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ডাব প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। দলীয় নেতাকর্মীরা তাঁর সঙ্গ না ছেড়ে তাঁকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেওয়ায় ২০০৮ সালে দল তাঁকে পুনরায় মনোনয়ন দেয়।

আবারও মনোনয়ন পাওয়ার আশায় আখতারুজ্জামান নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে এলাকায় এলাকায় মতবিনিময় করে যাচ্ছেন। দুই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিন সভা-সমাবেশ করছেন তিনি।

আখতারুজ্জামান মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দল বিবেচনা করলে প্রার্থী হব। এখন দলের নীতিনির্ধারকরা যদি আমাকে মনোনয়ন না দেয় তাহলে কী করার আছে। তবে আশা করছি আমি মনোনয়ন পাব। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের দলন-নিপীড়ন সহ্য করে সাধারণ নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে আছি। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকি। এখন হঠাত্ করে অন্য কেউ এসে যদি মনোনয়ন প্রত্যাশা করে তাহলে তা হবে দলের জন্য ক্ষতি। কারণ অনেকেই আছে লোক নিয়োগ করে নিজেদের পক্ষে প্রচার চালাবে। দল ও মানুষের প্রতি তাদের কোনো কমিটমেন্ট নেই। ’

শিল্পপতি মো. হাফিজুর রহমান ২০০৬ সালে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। ২০০৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন তিনি। আগামী নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন পেতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন।

এদিকে জামায়াত প্রকাশ্যে রাজনীতিতে নামতে না পারলেও তাদের প্রথম সারির কয়েকজন নেতা জানান, জোটের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা মোটেও কমেনি। বরং বেড়েছে। চিরিরবন্দরে ভোটের বৈতরণী পার হতে হলে তাদেরকে প্রয়োজন আছে বিএনপির। ২০১৪ সালের আগে-পরে হামলা-মামলার ধকল তাদের ওপর দিয়ে গেছে। এ জন্য চিরিরবন্দর উপজেলা পরিষদের দুইবারের চেয়ারম্যান জামায়াতের সাবেক জেলা আমির আফতাব উদ্দিন মোল্লা প্রার্থী হিসেবে গোপনে প্রচার চালাচ্ছেন।

আফতাব উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে থাকলেও আমি একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা। এখন দেশ-জাতির প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ২০ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত হলে নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। ’ তবে একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, প্রতীক বড় নয়। কর্মী-সমর্থকদের ধরে রাখতে যেকোনো প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে থাকতে প্রস্তুত আছে জামায়াত।

এ আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জাগপার কেন্দ্রীয় নেতা মো. আশরাফ আলী খান মনোনয়ন পাবেন বলে আশায় আছেন। তিনি জাগপার একক সম্ভাব্য প্রার্থী এবং আগামী সংসদ নির্বাচনের নতুন মুখ হিসেবে জনসমর্থন তৈরি করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন। এলাকায় এলাকায় গণসংযোগও করছেন তিনি।


মন্তব্য