kalerkantho


আনান কমিশনেই সংকটমুক্তি

সমর্থন আছে বড় শক্তিগুলোর

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আনান কমিশনেই  সংকটমুক্তি

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়ে যে গভীর সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তার নিরসন হতে পারে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই। বাংলাদেশ জোর দিয়ে বলছে, সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

তা ছাড়া অনেক আগে থেকেই ঢাকা রাখাইন রাজ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য অনুকূল ও স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে এখনো রোহিঙ্গা সমস্যার পুরোপুরি সমাধান সম্ভব। বাংলাদেশ ওই সুপারিশগুলোকে পুরোপুরি সমর্থন করে। গত জানুয়ারি মাসে আনান কমিশনের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সফরের সময় সরকারি, বেসরকারি ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তিরা এ দেশের উদ্বেগগুলো তুলে ধরেছিল। ওই কমিশন অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল মার্চ মাসে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতায় চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কিছু গুণগত পরিবর্তন এসেছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মিয়ানমার ও বাংলাদেশ মিলে যৌথ যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের নিরাপদে প্রত্যাবাসনের সুপারিশ করা হয়েছে।

আনান কমিশনের প্রতিবেদনে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে যেমন ‘রোহিঙ্গা’ বলা হয়নি, তেমনি মিয়ানমার সরকারের ভাষ্য ‘বেঙ্গলি’ও বলা হয়নি। সেখানে রোহিঙ্গাদের ‘রাখাইনের মুসলমান সম্প্রদায়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রশ্নে আনান কমিশনের সুপারিশে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিতকরণ এবং ইতিমধ্যে নাগরিক হিসেবে যাচাই হওয়া ব্যক্তিদের সব ধরনের অধিকার ও স্বাধীনতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া নাগরিকত্ব আইনটি আন্তর্জাতিক রীতিনীতি, নাগরিকত্ব ও জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুপারিশ রয়েছে। যারা মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি, তাদের ওই দেশটিতে অবস্থানের বিষয়টি হালনাগাদ করে ওই সমাজের অংশ করে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

রাখাইন রাজ্যে রাখাইন ও রোহিঙ্গা দুই জাতিগোষ্ঠীরই অবাধ চলাচলের ওপর বিধি নিষেধ আছে এবং রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপরই এটি বেশি—এমনটি উল্লেখ করেছে আনান কমিশন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার অবাধ চলাচলের সুযোগ দিতে মিয়ানমার সরকারকে আনান কমিশন সুপারিশ করেছে। রাখাইন রাজ্যে উন্নয়ন ও বিনিয়োগ থেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলো উপকৃত হবে বলেও মনে করে আনান কমিশন।

মিয়ানমারের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সব গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সদস্যদের সম্পৃক্ত করার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতদের শিবিরগুলো বন্ধ করে সমাজেই তাদের সম্পৃক্ত করার নীতি করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আন্তঃসম্প্রদায় সুসম্পর্ক সৃষ্টি এবং সমাজের সব সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

আনান কমিশনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সুসম্পর্ক এবং অভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই কমিশন তার ৮৮ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমারে কাঠামো সৃষ্টি এবং মন্ত্রী পর্যায়ের কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলেছে। বৈশ্বিক সমালোচনার মুখে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতির উন্নয়নে কফি আনানের নেতৃত্বে ৯ সদস্যবিশিষ্ট কমিশন গঠন করেছিলেন। ওই কমিশনের ছয়জন সদস্যই মিয়ানমারের নাগরিক।

মিয়ানমারের পার্লামেন্টে ওই কমিশন গঠনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনা হলেও তা গৃহীত হয়নি। তবে রাখাইন রাজ্যের পার্লামেন্টে কফি আনান কমিশন গঠনের বিরুদ্ধে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আনান কমিশনের প্রতিনিধিদের তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জন করেছে। একই সঙ্গে ওই সুপারিশগুলোও।

মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার ওই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নকে কঠিন বললেও এর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। গত ২৫ আগস্ট নতুন করে সহিংসতা শুরুর আগে কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলোকে সমর্থন জানিয়েছিলেন নেপিডোর বৌদ্ধ ভিক্ষু নেতারাও।


মন্তব্য