kalerkantho


গ্রেনেড হামলা মামলায় এ বছরই রায়ের আশা

আসামির মুখেও তারেকের নাম

আশরাফ-উল-আলম   

২১ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



আসামির মুখেও তারেকের নাম

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় বিএনপি নেতা তারেক রহমান ও হাওয়া ভবনের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে আসামিদের জবানবন্দিতেও। বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সংঘটিত ওই হামলার বিষয়ে জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, শেখ হাসিনাকে হত্যা করার পরিকল্পনা হয় হাওয়া ভবনে এবং জঙ্গিদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তারেক রহমান।

মুফতি হান্নানের দেওয়া ওই তথ্য মিলে যায় কয়েকজন সাক্ষীর দেওয়া তথ্যের সঙ্গে।

ভয়াবহ ওই গ্রেনেড হামলায় হাওয়া ভবন ও তারেক রহমানসহ বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য সঠিক কি না তা প্রমাণ হবে এ বছরই। কারণ গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে দায়ের হওয়া দুই মামলারই রায় হবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে।

উভয় মামলায় আসামিদের মধ্যে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাড়াও আছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ও খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউক। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ও চারদলীয় জোট আমলের সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদও আসামি ছিলেন। তবে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এরই মধ্যে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। হরকাতুল জিহাদ-আল-ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানেরও ফাঁসি কার্যকর হয়েছে অন্য এক মামলায়।

১৩ বছর আগের ওই গ্রেনেড হামলার বিচার শেষ পর্যায়ে। প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, এ-সংক্রান্ত দুই মামলায় আসামিপক্ষে ১৩ জনের সাফাই সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

আসামিপক্ষের আরো আট থেকে ১০ জনের সাফাই সাক্ষ্য নেওয়া হবে। এর পরই হবে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি। ওই শুনানি শেষে রায়ের দিন ধার্য করবেন বিচারক।

ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারাধীন ওই দুটি মামলায় প্রসিকিউশন তথা রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তির সঠিক দিন-তারিখ বলা যাবে না। তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হচ্ছে এটা নিশ্চিত। ’ তিনি জানান, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। আসামিপক্ষের কয়েকজন সাফাই সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। অল্প দিনের মধ্যেই মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হবে। এর পরই রায় দেবেন ট্রাইব্যুনাল।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিশেষ পিপি আবু আবদুল্লাহ ভূঁইয়াও কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণের পরই যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হবে। আশা করা যায়, এ বছরই মামলার বিচারকাজ শেষ করে রায় ঘোষণা করবেন ট্রাইব্যুনাল। ’ তিনি বলেন, ছয় বছর ধরে নতুন করে মামলার কার্যক্রম শুরু তাঁরা করেছেন। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিচারকাজ চলছে। সতর্কতার সঙ্গে এই মামলার বিচার করা হচ্ছে। এই মামলায় ২২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ওই সাক্ষীদের জেরা করেছেন ৫০ জন আসামির আইনজীবী। এ কারণে মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লাগছে। এ ছাড়া বিচার বিলম্বিত করার জন্য আসামিরা বারবার উচ্চ আদালতে বিভিন্ন আবেদন করেন। এ কারণে প্রায় তিন শ কার্যদিবস নষ্ট হয়েছে। এখন মামলা দ্রুতই নিষ্পত্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

মামলা নিষ্পত্তির দিকে এগোলেও চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, কায়কোবাদ, মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি খান সাইদ হাসান, সাবেক পুলিশ সুপার ওবায়দুর রহমান, মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ১৮ জন এখনো দেশ-বিদেশে পালিয়ে আছেন। তাঁদের ধরতে ইন্টারপোল রেড নোটিশও জারি করেছে।

২১ আগস্টের ওই সমাবেশে চালানো ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ও মহিলা আওয়ামী লীগের তখনকার সভানেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। গ্রেনেডের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হন তৎকালীন ঢাকার মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। কয়েক বছর ধুঁকে ধুঁকে পরে তিনি মারা যান।

দেশের প্রধান বিরোধী দলের জনসমাবেশে এত বড় ও ভয়াবহ হামলার পর স্বাভাবিকভাবেই তখন যারা ক্ষমতায় ছিলেন তাদের ভূমিকা নিয়ে জনমনে সন্দেহ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় শুরু থেকেই নানা চেষ্টা করা হয় নৃশংস ওই হত্যাযজ্ঞের তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে। সাজানো হয়েছিল জজ মিয়া নাটক। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে নতুন করে শুরু করা হয় তদন্ত। তাতে বেরিয়ে আসে অনেক অজানা তথ্য। ২০০৮ সালের জুনে বিএনপি-জামায়াত জোট আমলের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তাঁর ভাই তাজউদ্দিন, হুজি-বি নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্তে বেরিয়ে আসে তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হয়েছিল। হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড এসেছিল পাকিস্তান থেকে।

আসামির জবানবন্দিতেও তারেক ও হাওয়া ভবন : তারেক রহমান ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন—আসামির জবানবন্দিতে জোরালোভাবেই এ তথ্য এসেছে। মামলার মূল আসামি হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানের আদালতে দাখিল করা জবানবন্দিতে আরো বলেছেন, শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্যই গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। এই গ্রেনেড হামলা চালাতে সহযোগিতার জন্য মুফতি হান্নান অন্য জঙ্গি নেতাদের নিয়ে জোট সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসভবনে কয়েকবার বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরও অংশ নেন। হামলার পরিকল্পনার পর্বে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের সঙ্গে মুফতি হান্নানের দেখা হয়েছিল হাওয়া ভবনে।

মুফতি হান্নান তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, ২০০৪ সালের প্রথম দিকে মোহাম্মদপুরের দারুল আরকান মাদরাসায় (হরকাতের অফিস) হরকাতুল জিহাদের নেতাদের নিয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে মাওলানা আবদুস সালাম, মাওলানা শেখ ফরিদ, হাফেজ জাহাঙ্গীর বদর (জান্দাল), আবু বকর, ইয়াহিয়াসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকেই তারেক রহমান, লুত্ফুজ্জামান বাবরের সঙ্গে কী কথা বলা যায় তা নিয়ে আলোচনা হয়। পরে মোহাম্মদপুর সাতমসজিদে জঙ্গি নেতারা একত্রে পরামর্শ করে এবং শেখ হাসিনাকে হত্যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সঙ্গে এই জঙ্গি নেতাদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। পিন্টুর বাসায় পিন্টু ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরের সঙ্গে বৈঠকও হয়। এই দুই মন্ত্রীই জানান, তাঁরা মুফতি হান্নানদের এই পরিকল্পনায় সাহায্য করবেন। ওই দিনই তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের সিদ্ধান্ত হয়। এই সূত্রেই হারিছ চৌধুরী ও তারেক রহমানের সঙ্গে মুফতি হান্নানের পরিচয় হয়। হাওয়া ভবনেই সাক্ষাৎ হয়। হরকাতুল জিহাদের কাজকর্মে তারেক রহমান সহযোগিতা করবেন বলে সেই সাক্ষাতে আশ্বাস দেন। এরপর হরকাতুল জিহাদের নেতারা আরো কয়েক স্থানে বৈঠক করেন।

মুফতি হান্নান জবানবন্দিতে আরো বলেন, ২০০৪ সালের আগস্টে সিলেটে গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে ঢাকার মুক্তাঙ্গনে (পরে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে) আওয়ামী লীগ সমাবেশ করবে বলে তাঁরা জানতে পারেন। এরপর তাঁরা একটি বৈঠক করেন এবং তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নেন। পরে মুফতি হান্নানসহ অন্য নেতারা আল মারকাজুলের গাড়িতে করে মারকাজুলের কর্মকর্তা আবদুর রশিদকে নিয়ে হাওয়া ভবনে যান। হাওয়া ভবনে হারিছ চৌধুরী, তখনকার মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ (অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর), ব্রিগেডিয়ার রেজ্জাকুল হায়দার ও ব্রিগেডিয়ার আবদুর রহিমকে উপস্থিত পান। কিছুক্ষণ পর তারেক রহমান আসেন। তখন মুফতি হান্নানসহ জঙ্গিরা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর হামলা করার জন্য প্রতিশ্রুত সহায়তা চান। তখন উপস্থিত ব্যক্তিরা প্রশাসনের মাধ্যমে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন। মুফতি হান্নান জবানবন্দিতে বলেন, ‘তারেক সাহেব বলেন যে, আপনাদের আর এখানে আসার দরকার নেই। বাবর সাহেব ও আবদুস সালাম পিন্টুর সাথে যোগাযোগ করে কাজ করবেন। তাঁরা আপনাদের সকল প্রকার সহযোগিতা করবেন। ’ এরপর তাঁরা ১৮ আগস্ট আবদুস সালাম পিন্টুর ধানমণ্ডির সরকারি বাসায় যান। সেখানে পিন্টু, বাবর, মাওলানা তাজউদ্দিন, কমিশনার আরিফ, হানিফ পরিবহনের হানিফ উপস্থিত ছিলেন।   সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, ২০ আগস্ট জঙ্গি মুফতি মঈন ও আহসান উল্লাহ কাজল পিন্টুর বাসা থেকে ১৫টি গ্রেনেড নিয়ে যাবে। আর হামলা করার জন্য সব ধরনের নিরাপত্তা থাকবে।

গাড়ি নিয়ে হাওয়া ভবনে যাওয়ার যে বক্তব্য মুফতি হান্নান দিয়েছেন তা মিলে যায় এই মামলার সাক্ষী আল মারকাজুল ইসলামের কর্মকর্তা মাওলানা আবদুর রশিদের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতেও। তিনি জানান, মুফতি হান্নান ও অন্যরা তাঁর পরিচিত ছিলেন। তিনি জানতেন না এঁরা জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত। ইসলামী বুজুর্গ হিসেবেই এঁদের জানতেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার কয়েক দিন আগে মুফতি হান্নান আল মারকাজুলের অফিসে এসে একটি গাড়ি চান এবং গুলশানের হাওয়া ভবনে এঁদের নিয়ে যেতে বলেন। আবদুর রশিদ তাঁদের নিয়ে হাওয়া ভবনে যান। জঙ্গিরা সবাই হাওয়া ভবনের ভেতরে যান। আবদুর রশিদ নিচেই ছিলেন। কিছুক্ষণ পর সবাই নেমে আসেন। তাঁদের সঙ্গে এ সময় তারেক রহমান ও বাবরকেও দেখা গিয়েছিল।

একইভাবে মামলার সাক্ষী মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আকন্দ আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেন, ‘মামলার তদন্তে হাওয়া ভবনে বসে তারেক রহমান ও অন্য মন্ত্রীসহ এনএসআইয়ের কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা করতে পরিকল্পনা করেন তাঁর প্রমাণ পেয়েছি। ’ সাক্ষীদের জবানবন্দি ও দালিলিক কাগজপত্রে তিনি এই প্রমাণ পান। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার পর মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরের নির্দেশে তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তারা এই কাজ করেন। মুফতি হান্নান ও সাক্ষী আবদুর রশিদের জবানবন্দি ও অন্য আসামিদের জবানবন্দিতে জানা যায়, হাওয়া ভবনে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা হয় এবং জঙ্গিদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তারেক রহমান।

এই মামলার সাক্ষী সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাবেক মন্ত্রী হাসান মাহমুদসহ অনেক সাক্ষীই সাক্ষ্য প্রদানের সময় হাওয়া ভবনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন।

তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) মো. সাদিক হাসান রুমিও সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বলেন, তিনি ডিজিএফআইয়ের ডিজি ছিলেন। মুফতি হান্নান আটক হওয়ার পর তিনি হান্নানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। মুফতি হান্নান তাঁকে বলেছিলেন, ২১ আগস্টের ঘটনায় জঙ্গি মাওলানা তাজউদ্দিনের বড় ভাই আবদুস সালাম পিন্টু, লুত্ফুজ্জামান বাবর ও তারেক রহমান জড়িত ছিলেন। ঘটনার আগে কয়েকবার এঁদের সঙ্গে বৈঠক হয় ও প্রশাসনিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয় জঙ্গিদের।

বিএনপি সরকারের সাজানো তদন্ত : গ্রেনেড হামলার দিনই পুলিশ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করেছিল। পরদিন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলা দিতে গেলে পুলিশ তা নেয়নি। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। শুরু থেকেই তদন্তের গতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে তৎকালীন সরকার। শৈবাল সাহা পার্থ নামের এক তরুণকে আটক করে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়। তদন্তের নামে পুরো ঘটনাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হয় সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। ঘটনার গুরুত্ব খাটো করতে হামলার শিকার আওয়ামী লীগের দিকেই সন্দেহের আঙুল তুলেছিল বিএনপি। ওই সময় একাধিক মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা তাঁদের বক্তব্যে আওয়ামী লীগ নিজেরাই ওই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে প্রচার চালান।

ঘটনা তদন্তে ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল চারদলীয় জোট সরকার। সেই কমিশনও জোট সরকারের অপপ্রচারের পথ ধরেই চলেছিল। এক মাস ১০ দিনের মাথায় কমিশন সরকারের কাছে ১৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দিয়ে বলেছিল, কমিশনের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে ইঙ্গিত করে, এই হামলার পেছনে একটি শক্তিশালী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত।

সত্য উদ্ঘাটন শুরু : ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে এ মামলা তদন্তের উদ্যোগ নেয়। এতে বেরিয়ে আসে বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সহযোগিতায় গোপন জঙ্গি সংগঠন হুজি-বি জঙ্গিরা শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালিয়েছিল।

তদন্ত শেষে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আদালতে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেন। তাতে ২২ জনকে আসামি করা হয়। সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ছাড়া বাকি আসামিদের সবাই হুজি-বির জঙ্গি।

অধিকতর তদন্ত : ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সিআইডি এ মামলার অধিকতর তদন্ত করে এবং ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়। তাতে আরো ৩০ জনকে আসামি করা হয়। তাঁরা হলেন তারেক রহমান, লুত্ফুজ্জামান বাবর, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোহাম্মদ কায়কোবাদ, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউক, এনএসআইয়ের সাবেক দুই মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুর রহিম ও মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার, ডিজিএফআইয়ের মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, পুলিশের সাবেক তিন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদা বকশ চৌধুরী, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি খান সাঈদ হাসান ও সাবেক এসপি মো. ওবায়দুর রহমান, জোট সরকারের আমলে মামলার তিন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান ও এএসপি আবদুর রশিদ, হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফ এবং হুজি-বির ১০ নেতা।

আসামিদের মধ্যে পুলিশের সাবেক ছয় কর্মকর্তা, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুর রহমান জামিনে আছেন। বাবর, পিন্টুসহ ২৬ জন আছেন কারাগারে। পলাতক রয়েছেন ১৮ জন। মুজাহিদ ও মুফতি হান্নানের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে অন্য অপরাধের দায়ে।

এখনো পলাতক ১৮ আসামি : আসামিদের মধ্যে ১৮ জন এখনো দেশ-বিদেশে আত্মগোপন করে আছেন। পলাতক আসামিদের ধরার অগ্রগতি সম্পর্কে গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তরে একটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত থাকা পুলিশের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পলাতক আসামিদের ধরতে কিছু কৌশল নেওয়া হয়েছে। আমাদের কাছে তথ্য এসেছে আসামিদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশেই আছেন। তাঁরা এখন কোথায় অবস্থান করছেন সেই তথ্য জানা গেছে। ধরার স্বার্থে তা বলা যাচ্ছে না। ইন্টারপোলের রেড নোটিশ যাতে বাস্তবায়ন করা হয় সে জন্য ইন্টারপোলের সদর দপ্তরের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করছি। তারাও আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, পলাতকদের ধরার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ’

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, এ টি এম আমিন, সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, খান সাঈদ হাসান, ওবায়দুর রহমান, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, রাতুল বাবু, মোহাম্মদ হানিফ, আবদুল মালেক, শওকত হোসেন, মাওলানা তাজউদ্দিন, ইকবাল হোসেন, মাওলানা আবু বকর, খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম পালিয়ে আছেন। তাঁদের মধ্যে তারেক রহমান লন্ডনে, মোহাম্মদ হানিফ কলকাতায়, হারিছ চৌধুরী লন্ডনে, এ টি এম আমিন ও সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার কানাডায়, রাতুল বাবু ও মাওলানা তাজউদ্দিন দক্ষিণ আফ্রিকায়, খান সাঈদ হাসান ও ওবায়দুর রহমান মালয়েশিয়ায় এবং বাকি আসামিরা ব্যাংকক ও ভারতে অবস্থান করছেন বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে।


মন্তব্য