kalerkantho


বিএনপিতে মতবিরোধ কমেছে

লন্ডনে মা-ছেলে ঐকমত্য!

এনাম আবেদীন   

১৯ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



লন্ডনে মা-ছেলে ঐকমত্য!

বেশ অনেক বছর পর বিএনপিতে নেতায় নেতায় মতবিরোধ কমতে শুরু করেছে। এখন তাঁদের একে অন্যের বিরুদ্ধে তেমন আর সরব দেখা যাচ্ছে না।

সংগঠন পরিচালনা ও পদ-পদবির পাশাপাশি বিদেশনীতির প্রশ্নে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে উঠেছে বলে লন্ডন থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে। বিভিন্ন প্রশ্নে মা ও ছেলের মধ্যে মতভেদের বিষয়টি দলের মধ্যে অনেক দিন ধরেই আলোচনায় আছে।

অনেকের মতে, চিকিৎসার জন্য গত ১৫ জুলাই খালেদা জিয়া লন্ডন গেলেও বস্তুত ছেলের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে বিদেশনীতি ও জামায়াত প্রশ্নে একমত হওয়া এ সফরের আরেকটি লক্ষ্য। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব আছে—এমন একটি দেশের সঙ্গে সমঝোতা প্রশ্নে আগে তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলা দরকার বলে বিএনপিপন্থী সুধীসমাজের মধ্যে আলোচনা আছে।

শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ মনে করেন, মধ্যম বা তৃণমূলে এক-আধটু বিরোধ থাকলেও দলটির কেন্দ্রে এখন আর তা নেই। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় নেতারা এখন উপলব্ধি করেছেন, নিজেরা একাট্টা না হলে টিকে থাকা যাবে না। কারণ তাঁদের শত্রু (সরকার) কঠোর ও ভয়ংকর। কোনো কিছুতেই তারা ছাড় দেবে না। ফলে তাঁরা একসঙ্গে থাকার তাগিদ অনুভব করছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সম্ভবত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মধ্যে বিরোধ মিটে গেছে। যে কারণে প্রভাবশালী দেশটির সঙ্গে সমঝোতাও এখন আর কঠিন নয়।

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অবশ্য মনে করেন, বিএনপির এখন যেহেতু কোনো কর্মসূচি নেই, তাই বিরোধও নেই। তিনি জানান, লন্ডনে কী হচ্ছে এ বিষয়ে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। কারণ লন্ডনে যত সমঝোতাই হোক; মাঠে না নামলে ক্ষমতায় আসা সম্ভব নয়।  

বিরোধ কমেছে কেন্দ্রীয় বিএনপিতে পদ-পদবির লড়াই কিংবা দলে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নেতায় নেতায় বিরোধই ছিল গত কয়েক বছরে বিএনপির দৃশ্যমান চিত্র। এক-এগারো থেকে ওই বিরোধ শুরু হয়ে গত কাউন্সিল পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সামনে নির্বাচন তথা সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় নেতারা নিজেরাই ওই পথ থেকে সরে এসেছেন। তা ছাড়া জাতীয় কাউন্সিলের পর কেন্দ্রসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি গঠন হওয়ায় দ্বন্দ্বের তেমন আর কোনো ইস্যুও নেই।

সূত্র মতে, সংস্কারপন্থীদের নিয়েও আগে দলে কিছুটা বিভক্তি ছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া কিছুদিন আগে বিএনপির সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত জহিরউদ্দিন স্বপন ও নাজির হোসেইনসহ কয়েকজনকে গুলশান কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে দলের পক্ষে কাজ করতে বলেন। পর্যায়ক্রমে আরো অনেকে ডাক পাবেন বলে খালেদা জিয়া আশ্বাস দিয়েছেন। এর ফলে সংস্কারপন্থী ইস্যুতে দলের মধ্যে বিরোধ কমছে।

সূত্র মতে, লাগাতার বিরোধে জড়িয়ে যাঁরা দলের ভেতরে উত্তাপ সৃষ্টি করেছেন, বিএনপির সেই নেতারাও এখন কিছুটা ক্লান্ত ও নিরুৎসাহ হয়ে পড়েছেন। তা ছাড়া এরই মধ্যে সমঝোতা হয়ে গেছে মহাসচিব মির্জা ফখরুল

ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মধ্যে। গয়েশ্বরও মহাসচিব হতে আগ্রহী ছিলেন বলে বিএনপিতে গুঞ্জন ছিল। তাই গত বছর ১৯ মার্চ জাতীয় কাউন্সিল পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের পেছনে গয়েশ্বর ও তাঁর সমর্থকরা লেগে ছিলেন। গয়েশ্বরের সঙ্গে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ, ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভূঁইয়াসহ অনেকে ছিলেন। কিন্তু কাউন্সিলের পর গত বছরের ৩০ মার্চ ফখরুল ভারমুক্ত হয়ে পূর্ণ মহাসচিব হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলায়। দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানের মধ্যস্থতায় গত বছরের ৬ এপ্রিল নয়াপল্টন অফিসে এক বৈঠকে গয়েশ্বর-ফখরুল সমঝোতা হয়। ফখরুলও মির্জা আব্বাসসহ বিরোধী বলে পরিচিত সবার সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনেন।

সূত্র মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত আরেক ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা বিএনপির রাজনীতিতে নীরব হয়ে যাওয়ার কারণেও দলে বিরোধ কমে গেছে। যদিও প্রায় তিন বছর ধরে খোকা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও মহানগরী কমিটির নেতৃত্বে তাঁর সমর্থকরাই স্থান পেয়েছেন বেশি।

এদিকে ফখরুলের ঘনিষ্ঠরা মনে করেন, মির্জা ফখরুল ও রুহুল কবীর রিজভী আহমেদের মধ্যে বেশ দূরত্ব ছিল। কারণ মহাসচিব হওয়ার আগ্রহ তাঁরও ছিল। কিন্তু সম্প্রতি তিনি ফখরুলকে মেনে নিয়েছেন এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে গিয়ে তাঁর প্রশংসা করছেন।

কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে একাধিক কর্মসূচিতে সম্প্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাশে রিজভীকেও দেখা গেছে। দলের অনেকের মতে, এ ঘটনা আগে বিরল ছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রিজভী আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপির মতো একটি বড় দলে ছোটখাটো বিরোধকে সব সময় বাড়িয়ে বলা হয়। বাস্তবে আগে কোনো কোনো বিষয়ে কিছু মতপার্থক্য থাকলেও এখন একেবারেই তা নেই। আমরা একই আদর্শ ও একই দলের নেতা। যে কারণে সবাই পাশাপাশি আছি। বিরোধের প্রশ্নই ওঠে না। ’

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকায় দলে বিরোধ একেবারেই কমে গেছে—এটি বলা যায়। তবে কর্মসূচি মাঠে এলে কী হবে বলা যায় না। তিনি বলেন, ‘আমি কারো পেছনে না লাগতে পারি। কিন্তু আমার পেছনে কে লেগে আছে তা তো জানি না। ’ তাঁর মতে, বিএনপিতে যে দ্বন্দ্ব তা ব্যক্তিস্বার্থে, আদর্শিক নয়। আদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকলে তাকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বলা যায়।

লন্ডনে সমঝোতা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো খবর রাখি না। চেয়ারপারসন লন্ডনে গেছেন এটুকুই জানি। যেদিন তিনি আসবেন, সেদিন আবার জানব। মাঝখানে কী হচ্ছে না হচ্ছে তাতে আমার কোনো আগ্রহ নেই। ’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের মতে, সারা বিশ্বে নির্যাতিত মানুষ বিপদে বা বিশেষ সময়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। বিএনপির নির্যাতিত নেতাকর্মীরাও এখন অস্তিত্বের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য হয়েছে। আর এ পরিস্থিতিতে দলের নেতাদের মধ্যকার ছোটখাটো বিরোধ বা মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব দূর হয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

মা-ছেলে সমঝোতা?

জানা গেছে, এবারই প্রথম লন্ডনে বিএনপির প্রধান নেতা খালেদা জিয়া ও দ্বিতীয় প্রধান তারেক রহমানের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে সমঝোতা হয়েছে। বিএনপি নেতারা মনে করেন, দুই নেতার মধ্যে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ তথা প্রধান ইস্যু হলো বিদেশনীতি, আর দ্বিতীয় ইস্যু জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা।

দলটির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, জামায়াত প্রশ্নে বিএনপি অনেক আগে থেকেই কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছাড়া ওই দলটির নেতাদের সঙ্গে বিএনপির হাইকমান্ডের সম্পর্ক নেই। বরং জামায়াতকে এড়িয়ে চলছে তারা—এমন বার্তাই প্রভাবশালী দেশটিকে দিতে চায় বিএনপি। তা ছাড়া প্রভাবশালী দেশটি জামায়াত ইস্যুতে প্রশ্ন তুললে বিএনপি তাদেরও জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দেয় বলে জানা যায়।

বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে প্রভাবশালী একটি দেশের বিরোধী হিসেবে পরিচিত আরেকটি দেশের সঙ্গে তারেক সহযোগীদের ঘনিষ্ঠ মেলামেশা রয়েছে বলে ঢাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি কূটনৈতিক মহলেও আলোচনা আছে। বলা হচ্ছে, বিএনপিকে ক্ষমতায় যেতে হলে বিপরীত মেরুতে থাকা দেশটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ছাড়তে হবে। তা ছাড়া তারেকের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নিয়েও বিএনপির পাশাপাশি বিভিন্ন মহলে নেতিবাচক আলোচনা রয়েছে। এমনকি খালেদা জিয়াও তাঁদের পছন্দ করেন না। সূত্র মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে; ক্ষমতায় গেলে প্রভাবশালী ওই দেশটির স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ না করার বিষয়ে দুই নেতাকে একমত হতে হবে; এমনটি মনে করেন বিএনপির সিনিয়র নেতাদের পাশাপাশি দলটির সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও। প্রভাবশালী দেশটির ক্ষমতাসীন দলের পাশাপাশি দেশটির ‘ক্ষমতার বিকল্প বিভিন্ন কেন্দ্রে’র সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠক হতে পারে বলে বাংলাদেশ ও লন্ডনের বিএনপি নেতাদের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে।

তবে যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কয়সর আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, এ ধরনের কোনো বৈঠক হবে কি না তা তাঁর জানা নেই। আর মা ও ছেলের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই বলেও তিনি দাবি করেন।        

খালেদা জিয়া বর্তমানে লন্ডনের কিংস্টনে তারেক রহমানের বাসায়ই আছেন। দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে করণীয় নির্ধারণে তারেকের সঙ্গে আলোচনার জন্য এবার আর তিনি আলাদা বাসা ভাড়া নেননি।    

২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনে গিয়ে কিংস্টনে একটি পৃথক বাসায় ছিলেন খালেদা।


মন্তব্য