kalerkantho


বন্যার অজুহাতে বাজারে আগুন

পাইকারি থেকে খুচরায় দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি

শওকত আলী   

১৮ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



বন্যার অজুহাতে বাজারে আগুন

চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে বছরের শুরু থেকেই। এখনো চাল কিনতে মাথায় বাড়ি পড়ার জোগাড় সাধারণ মানুষের।

এ বছরই দুই ধাপে বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম। আর অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে গত মাসের মাঝামাঝি থেকেই বাড়তে শুরু করেছে সব ধরনের সবজি ও কাঁচা খাদ্যপণ্যের দাম। পাইকারি ও খুচরা—দুই বাজারের ব্যবসায়ীরাই বন্যার অজুহাত দেখিয়ে, উত্পাদন কম হওয়া এবং বন্যায় রাস্তাঘাট ভেঙেচুরে ডুবে যাওয়ায় ট্রাকের সময় ও ভাড়া বৃদ্ধির কথা বলে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার যুক্তি দেখাচ্ছে। কিন্তু আড়তদারদের কাছ থেকে জানা গেছে, বাজারে সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমেনি। আবার ট্রাক ভাড়া যতটা বেড়েছে, তার তুলনায় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক

 বৃদ্ধির হিসাব মেলে না। তা ছাড়া পাইকারি বাজারে খাদ্যপণ্যের যে মূল্য দেখা গেছে, খুচরা বাজারে গিয়ে তা বেড়ে যাচ্ছে অস্বাভাবিক মাত্রায়। এসব অনুসন্ধানে এটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বৃষ্টি-বন্যার অজুহাতে খাদ্যপণ্যের বাজারে আগুন লেগেছে মূলত অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার প্রবণতায়।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, ৪৫ টাকার নিচে কোনো মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে না। একটু ভালো মানের চাল কিনতে হলে কেজিতে গুনতে হচ্ছে ৫৫-৬০ টাকা।

অতিবৃষ্টিতে ফসলহানি ও ব্লাস্ট রোগের কারণে এবার দেশে ধানের উত্পাদন কমে যায়। অন্যদিকে দুই লাখ টনের নিচে নেমে আসে সরকারি চালের মজুদ। এরপর সরকার শুল্ক ছাড় দিয়ে ভারত থেকে চাল আমদানির সুযোগ দেয়। কিন্তু তাতেও শুধু মোটা চালের কেজিতে তিন-চার টাকা কমে। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই আবারও কেজিতে এক থেকে দুই টাকা বেড়ে যায়। চালের দাম আরো কমাতে দ্বিতীয় দফায় আমদানি শুল্ক কমিয়ে ২ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

চালে বাড়তি খরচের কারণে যখন সাধারণ মানুষের কষ্ট বেড়েছে, তখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সব ধরনের কাঁচা পণ্যের বাড়তি দাম। অর্থাত্ দেশের মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান উপকরণ ভাত-তরকারি খেতেই আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় করতে হচ্ছে।

রাজধানীর পাইকারি, খুচরা ও ঢাকার বাইরের কয়েকটি অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানায়, কাঁচাবাজারে সবজির সরবরাহ কম নেই। তবে বন্যার কারণে বিভিন্ন এলাকার কৃষি জমি ডুবে যাওয়ায় উত্পাদন ধীরে ধীরে কমছে। এ জন্য সব ধরনের সবজিই অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। আগামী দুই মাস পর্যন্ত দাম কমার কোনো লক্ষণই নেই।

অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে গত মাসের মাঝামাঝি থেকেই বেড়ে চলছে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম। ৩০-৩৫ টাকা কেজির পেঁয়াজ সে সময় পাঁচ টাকা বেড়ে ৪০ টাকায় ওঠে। ভারতে দাম বৃদ্ধি এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন আড়তে বৃষ্টিতে পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে হু হু করে বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। বাড়তে বাড়তে এখন পাইকারি বাজারেই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। আর খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকায়। ভারতে পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমদানি করা পেঁয়াজও বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা কেজিতে। এক মাসের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। একইভাবে এক মাস আগে অর্থাত্ বন্যার আগে আগে যে কাঁচা মরিচ ৮০ টাকায় বিক্রি হতো তা এখন ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

পেঁয়াজের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ কাঁচা পণ্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৃষ্টিতে আমাদের অনেক পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে। আবার ভারতে বন্যার কারণে আমদানি মূল্য বেড়েছে। তাই দাম না বাড়িয়ে উপায় নেই। ঢাকার কারওয়ান বাজারের পাইকারি বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন জানান, দু-এক দিনের মধ্যে পেঁয়াজের পাল্লা (পাঁচ কেজি) ২৫০ থেকে আরো ১০-১৫ টাকা বেড়ে যেতে পারে। আর ঈদের আগে দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই।

কাঁচা মরিচের দাম পাইকারি যেখানে ৮০-১০০ টাকা কেজি, সেখানে খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৩০-১৫০ টাকায়। বন্যা শুরুর আগে কাঁচা মরিচ খুচরা বিক্রি হয়েছে ৯০-১০০ টাকা কেজি দরে।

বাজারের তথ্য মতে, পেঁয়াজ ও মরিচের মতোই দ্বিগুণ হয়েছে সব ধরনের সবজির দাম। আবার ঢাকার পাইকারি বাজারে যে দাম, খুচরা বাজারে তার চেয়ে ১৫-২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের সবজিই। খুচরা বাজারে ৬০ টাকার কমে পাওয়া যাচ্ছে না কোনো সবজি। বেগুন পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা কেজি দরে। আর খুচরা বাজারে বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়, যা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১০০-১২০ টাকায়, যার পাইকারি মূল্য ৮০ টাকা। আবার প্রতি কেজি বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকায়, যা বৃষ্টি-বন্যা শুরুর আগে ছিল ৪০-৪৫ টাকা। অথচ এর পাইকারি মূল্য ৪০-৪৫ টাকা। একইভাবে কেজিতে ১৫-২০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে করল্লা, কচুর লতি ও চিচিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকায়, ঝিঙা ৬৫-৭০ টাকা, পটোল ৫৫-৬০ টাকায় এবং পেঁপে ৪৫ টাকায় এবং কচুর মুখী ৪৫-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে কম দামের সবজি বলতে বাজারে রয়েছে শুধু আলু, ২৫-২৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর এক মাস আগে ফার্মের মুরগির যে ডিম বিক্রি হতো ডজনপ্রতি ৮০ টাকায় তা এখন বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা পর্যন্ত।

ঢাকার শুক্রাবাদে বাজার করতে আসা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যা হচ্ছে, ঠিক আছে। একটু দাম বাড়তে পারে। তাই বলে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়াটা মানা যায় না। ১০০ টাকা দিয়ে দুই কেজি সবজিও কিনতে পারছি না। এখন তো মনে হচ্ছে, খাওয়াই কমিয়ে দিতে হবে। ’

হাতিরপুল বাজারের সবজি বিক্রেতা মাসুদ মিয়া বলেন, ‘আমরা বেশি দামে সবজি কিনি, তাই বিক্রিও করতে হয় বেশি দামে। আর সারা দেশে বন্যা হচ্ছে, ক্ষেতখামার তলিয়ে গেছে। তাই সবজির উত্পাদন কম। আমরা পাচ্ছিও কম। এ কারণে দামও বেড়ে গেছে। ’ শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার ও বাড্ডার কয়েকজন সবজি বিক্রেতাও দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে একই ধরনের যুক্তি তুলে ধরেন।

তবে সরবরাহে কোনো প্রকার ঘাটতি নেই বলে জানালেন কারওয়ান বাজারের আড়তদাররা। গাউছিয়া সবজি ভাণ্ডারের আড়তদার কামাল মিয়া জানান, বন্যায় কিছু জমি তলিয়ে গেলেও সরবরাহে কোনো ধরনের ঘাটতি নেই। প্রচুর সবজি আসছে। কিন্তু দাম একটু বেশি। কারণ সবজির একটি মৌসুম প্রায় শেষ দিকে। এখন নতুন সবজি লাগানো শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু বন্যার কারণে সেটা হচ্ছে না। তবে নতুন করে বাজারে সবজি আসা ও দাম কমার জন্য আরো অন্তত দুই মাস অপেক্ষা করতে হবে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, বন্যায় রাস্তাঘাট ডুবে ও ভেঙে যাওয়ায় পণ্যবাহী ট্রাক আসতে সময় লাগছে বেশি। অনেকে ভেজা সবজি ট্রাকে ভরছে বলে বেশি সময় লাগায় পচে যাচ্ছে। ভোরে যে ট্রাক এসে পৌঁছার কথা সেটা আসছে দুপুরের পর। এতে বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে। অনেক খুচরা বিক্রেতা ঠিকমতো সবজি পাচ্ছে না। আবার অতিরিক্ত ভাড়াও গুনতে হচ্ছে। আগে যেখানে ট্রাকপ্রতি ২৭-২৮ হাজার টাকা ভাড়া পড়ত, এখন সেটা পড়ছে ৩২-৩৩ হাজার টাকা। এসব কারণেই সবজির দাম বেশি।

কিন্তু হিসাব বলে, বন্যার কারণে ট্রাক ভাড়া পাঁচ হাজার টাকা বাড়লেও পাঁচ টন পণ্যবাহী একটি ট্রাকের পণ্য কেজিতে এক টাকার বেশি দাম বাড়ার কথা নয়। আবার বাস্তবে দেশের সব ট্রাকই পাঁচ টনের বেশি পণ্য বহন করে।

ঢাকার বাইরের কয়েকটি অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানেও সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। কালের কণ্ঠ’র দিনাজপুর প্রতিনিধির দেওয়া তথ্য মতে, সেখানকার বিভিন্ন বাজারে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম বেড়েছে। খুচরা বাজারে বিভিন্ন সবজির কেজি গড়ে ৫০ টাকার কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে। বন্যার আগে যে পুঁইশাক পাঁচ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন কিনতে হচ্ছে ৩০ টাকায়। কারণ হিসেবে সবজির উত্পাদন কমে যাওয়াকে তুলে ধরছেন বিক্রেতারা।

একইভাবে বগুড়া ও রংপুরের নিজস্ব প্রতিবেদকরা জানিয়েছেন, সে অঞ্চলগুলোতে পাইকারি বাজারে কম মূল্যে কৃষকরা সবজি বিক্রি করলেও খুচরা বাজারে অস্বাভাবিক দাম দিয়েই তা কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। বগুড়ার মহাস্থানগড় হাটের তথ্যানুযায়ী, প্রতি কেজি ঢেঁড়স ৫৫ টাকা ও কচুর লতি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়, যা বন্যা শুরুর আগে ছিল ৩০ টাকা।

খুচরা বাজারে সবজির মূল্য আকাশ ছোঁয়া হলেও বগুড়ার অন্যতম বৃহত্ সবজির মোকাম মহাস্থান হাটে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে দাম বেড়েছে ঠিকই তবে আকাশ ছোঁয়া নয়। হাটে সবজি আমদানি কিছুটা কম। আড়তদাররা বলছেন, দাম বাড়বে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই। হাটে কাঁচা মরিচ, বেগুন, ঢেঁড়স, মুলা, পেঁপে, কচুর লতি, পটোল, কচুরমুখী ও করলার দাম আগের চেয়ে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি ছিল। এই সবজিই খুচরা বাজারে গিয়ে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ দামে বিক্রি হচ্ছে।

পাইকারি মোকাম থেকে এক হাত বদল হয়ে খুচরা বাজারে যেতেই সবজির দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। যেমন মহাস্থান হাটে গতকাল দেশি এক কেজি শসা বিক্রি করে কৃষক যেখানে ৩০ টাকা পেয়েছে, সেখানে বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারে তা খুচরা ক্রেতাদের কিনতে হয়েছে ৬০ টাকায়। একইভাবে মহাস্থান হাটে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৬০ টাকা দামে কিনে নিয়ে খুচরা বিক্রেতারা তা ফতেহ আলী বাজারে ১০০ টাকায় বিক্রি করেছে।

পাইকারি মোকাম মহাস্থান হাট থেকে ফতেহ আলী বাজারের দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। যেখানে প্রতি কেজি পণ্য পরিবহনে মাত্র ৫০ পয়সা লাগে। অথচ পণ্য বিক্রি হয় কয়েক গুণ বেশি দামে।

বগুড়ায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জেলা বিপণন কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায়ী পর্যায়ে কোনো কৃষিপণ্য ২৫ শতাংশের বেশি লাভে বিক্রির সুযোগ নেই। কিন্তু ব্যবসায়ীরা যুক্তি দেখাচ্ছে, কৃষকদের কাছ থেকে ভালো পণ্যগুলো বেশি দামে কিনছে তারা, যে কারণে দাম বাড়ালেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।


মন্তব্য