kalerkantho


বৃষ্টিতে ভাসল ঢাকা দিনভর যানজট

পার্থ সারথি দাস   

২৭ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



বৃষ্টিতে ভাসল ঢাকা দিনভর যানজট

ঢাকার অন্য সড়কগুলোর মতো বৃষ্টিতে দিনভর ডুবে ছিল ধানমণ্ডির মিরপুর সড়কও। এ সময় তীব্র যানজটে প্রায় স্থবির ছিল গোটা এলাকা। ছবি : শেখ হাসান

চারদিকে থইথই পানি। কোথাও হাঁটু সমান, কোথাও কোমর অবধি।

রাস্তার ওপর জলের ধারা দেখে খাল বা নদী বলে ভুল হয়। তার ভেতর দিয়ে পানি ঠেলে, জল-কাদা ছিটিয়ে চলতে হচ্ছিল বাস ও প্রাইভেট কারগুলোকে। তাতে পথচারী, রিকশাযাত্রী কিংবা মোটরসাইকেল চালক ও তার সহযাত্রীরা ভিজে যাচ্ছিল। মোটরসাইকেলে চলতে গিয়ে প্রায়ই তাল সামলে রাখা যাচ্ছিল না। পানির নিচে ছোট-বড় গর্তগুলো মারাত্মকভাবে তাদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল। তাতে কখনো মোটরসাইকেলের চাকা আটকে যায়, স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়। গর্তে আটকে ইঞ্জিনে পানি ঢুকে বিকল হয়ে পড়ে ছিল অটোরিকশাগুলো। বিকল হয়ে পড়া ব্যক্তিগত গাড়িগুলো ঠেলে সরিয়ে নিচ্ছিলেন মালিক-চালকরা। দেখে মনে হচ্ছিল—রাস্তার বদলে নদীতে ভাসছে সেগুলো।

মঙ্গলবার শেষ রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণে গতকাল বুধবার রাজধানী ঢাকার বেশির ভাগ এলাকা ডুবে যায়। দিনভর জনজীবন ছিল বিপর্যন্ত। বৃষ্টি, নোংরা পানি ও জলাবদ্ধতার ভোগান্তির সঙ্গে ছিল তীব্র যানজট। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি সর্বত্র আটকে ছিল গাড়ির দীর্ঘ সারি। বিভিন্ন সড়কে যান চলাচলই বন্ধ ছিল। বিমানবন্দর-শাহবাগ, গাবতলী-নিউ মার্কেট, কুড়িল-প্রগতি সরণি-মালিবাগ, মিরপুর-মতিঝিল সড়কের মতো প্রধান সড়কগুলোতে স্থির হয়ে ছিল গাড়ির সারি। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, নগরীতে গণপরিবহন প্রায় ৪০ শতাংশ বন্ধ ছিল। রাজধানীবাসীর একটি বড় অংশই গতকাল ঘর থেকে বের হয়নি। যারা ঘর ছেড়েছিল তাদের দিনভর প্রচণ্ড ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি কর্মজীবী, ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে রাস্তায় বের হওয়া সবাই যানজটে আটকে ছিল। সকালে শুরু হওয়া যাত্রা যানজটে থেমে থেমে দুপুর পর্যন্ত চলে। বৃষ্টি পড়ছিল, তার পরও রাস্তায় গাড়িতে আটকে থেকে ঘামছিল যাত্রীরা। ভুক্তভোগীদের মতে, সাম্প্রতিককালে এমন দীর্ঘ যানজটে তারা পড়েনি। অনেকে মন্তব্য করেছে, ‘সাঁতরাইতে সাঁতরাইতে অফিসে আইছি। ’ গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ট্রাফিক পুলিশও দেখা যায়নি। এ কারণে যান চলাচলের পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল।

ধানমণ্ডি থেকে সকাল সাড়ে ৮টায় রওনা দিয়ে বিজয় সরণি, মহাখালী, বনানী, কাকলীসহ বিভিন্ন স্থানে আটকে থেকে সাড়ে ১২টায় খিলক্ষেত পৌঁছান ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম। অন্যান্য দিন ব্যক্তিগত গাড়িতে করে কর্মস্থলে আসতে তাঁর সাধারণত এক ঘণ্টা লাগে। শুধু সিরাজুল ইসলাম নন, গতকাল তাঁর মতো শত শত কর্মজীবীর কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে।

দুপুরে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের সামনের সড়কে থইথই পানি দেখা গেল। পাশের রেল ভবনের সামনের সড়কও ছিল পানিতে টুইটুম্বুর। স্রোত ঠেলে সামনে এগোতে রীতিমতো লড়াই করতে হচ্ছিল যানবাহনগুলোকে। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের কাছের এ রাস্তায় গাড়ি চলছিল স্রোতের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে। সচিবালয়ের ভেতর জলাদ্ধতায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে পানি সরাতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সহায়তা নেওয়া হয়। প্রায় ১৩ বছর পর সচিবালয়ে এমন জলাবদ্ধতার দৃশ্য দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়।

স্টাফ পরিবহন মালিক সমিতির হিসাবে, ঢাকায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে বিআরটিসির ২০০টিসহ সব মিলে ৬০০ বাস চলাচল করে। এর মধ্যে বিআরটিসি কল্যাণপুর ডিপো থেকে চলাচল করে ১২৪টি। জানা গেছে, গতকাল সেগুলো সকালে বের হলেও দ্বিতীয়বার যাত্রী টানতে পারেনি সময়মতো। বিআরটিসির কল্যাণপুর বাস ডিপোর ব্যবস্থাপক মো. নুর ই আলম গতকাল বিকেলে কল্যাণপুর থেকে মোহাম্মদপুরে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছিলেন। পরিস্থিতি তুলে ধরে বললেন, কল্যাণপুর থেকে গণভবনের সামনে আসতেই ঘণ্টা পার হয়ে যাচ্ছে। সকালে তাঁর ডিপো থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেই বাসগুলোর দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বেশি সময় লেগেছে। সকালে বাংলাদেশ ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বিসিআইসি, বিএডিসি ও সচিবালয়ের কর্মচারীদের বহনকারী গাড়িগুলো যানজটে আটকে থাকায় কর্মচারীদের বড় অংশ সময়মতো অফিসে হাজির হতে পারেননি।

বৃষ্টিতে ধানমণ্ডির মূল সড়কের অবস্থা ছিল সবচেয়ে সঙ্গিন। বিশেষ করে ধানমণ্ডি-২৭ ও এর আশপাশের এলাকায় হঠাৎ করেই পানি বেড়ে যায়। রাস্তার এ অবস্থা দেখে স্থানীয়দের অনেকেই বাসা থেকে বের হয়নি। যারা বের হয়েছিল তাদের আটকে থাকতে হয়েছে পথে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোনারগাঁও হোটেলের পেছনে ওয়াসার পাম্প দিয়ে ধানমণ্ডির পানি সরানোর কথা থাকলেও তা করা হয়নি। এ কারণে ধানমণ্ডি ডুবে যায়। দুপুর আড়াইটায় বেশির ভাগ স্থানে কোমর সমান পানি ছিল। মিরপুর-নিউ মার্কেট সড়কের বেশির ভাগ অংশ ডুবে ছিল। ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরের প্রান্তমুখে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছিল। শংকর ও জিগাতলা থেকে গাড়িগুলো মিরপুর-নিউ মার্কেট সড়কে চলাচল করতে পারেনি।

রাজধানীর বেশির ভাগ মূল রাস্তা ও অলিগলিতে দুই পাশের অর্ধেক করে অংশে চলাচল করা যাচ্ছে না বহুদিন ধরে। ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের নামে কেটে রাখা হয়েছে রাস্তাগুলোর অংশ। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মূল রাস্তায় গাড়ি চলতে পারে ৪০ শতাংশেরও কম অংশ দিয়ে। এর ওপর ফুটপাতও কেটে রাখা হয়েছে। সড়কে গাড়ির ফাঁকে ফাঁকে তাই পথচারীদেরও চলাচল করতে হয় প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে। সকালে মালিবাগ, মৌচাক, রামপুরা, রাজারবাগেও যত দূরে চোখ গেছে তত দূর পর্যন্ত পানি দেখা গেছে। গণপরিবহন কম থাকায় অনেকে রিকশায় যাতায়াত করেছে। তবে পানি কেটে চলতে গিয়ে রিকশাও কাত হয়ে পড়ছিল।  

লঘুচাপের ফলে ঢাকাসহ দেশজুড়ে বর্ষণ হচ্ছে গত রবিবার থেকে। গতকাল সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকায় ৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছিল ২৮ মিলিমিটার। মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছিল ৪৯ মিলিমিটার।  

কলাবাগান থেকে অন্যান্য দিন এক ঘণ্টার মধ্যেই কর্মস্থল মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে যেতে পারেন প্রিসিলা রাজ। গতকাল কলাবাগানের বাসা থেকে বের হয়ে অটোরিকশা পাননি। রাস্তায় স্যুয়ারেজের ময়লা পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে স্কয়ার হাসপাতালের সামনে আসেন। সেখান থেকে অটোরিকশা পেয়ে রাজাবাজার হয়ে ইন্দিরা রোডের আগেই দেখেন তীব্র যানজট লেগে আছে। সংসদ ভবনের পাশের সড়কে যেতেই অটোরিকশা বিকল হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর সচল হলে যানজট দেখে মনিপুরীপাড়ার ভেতরের গাড়িজট ঠেলে বিজয় সরণি মোড়ে আসেন তিনি। সামনের পথ ধরে মহাখালী যাওয়া সম্ভব নয় দেখে বিজয় সরণি-তেজগাঁও উড়াল সেতুর ওপর দিয়ে মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে দিয়ে ব্র্যাক সেন্টারে পৌঁছান প্রিসিলা। গতকাল কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে প্রিসিলা বলেন, সাঁতরাতে সাঁতরাতে আজ অফিসে এসেছি।

ভারি বর্ষণে সংসদ ভবনের পাশের উড়োজাহাজ মোড়, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার অংশ পার হতেই শিখর পরিবহনের বাসযাত্রী ইন্তাজ আলীর দেড় ঘণ্টা লেগেছে। সামনের অবস্থা খারাপ দেখে তিনি বাস থেকে কারওয়ান বাজারে নেমে যান। বললেন, এত জ্যাম এই বছর আর দেখিনি। কারওয়ান বাজারের রাস্তাগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে চলছিল জলের ধারা। তার আগে ফার্মগেট ও আশপাশে বৃষ্টিভেজা যাত্রীরা অপেক্ষায় ছিল যানবাহনের। ঢাকার প্রবেশপথগুলো যানজটে স্থবির ছিল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত। তার মধ্যে আব্দুল্লাহপুর থেকে বিমানবন্দর সড়কের পুরোটাই ছিল গাড়িতে ঠাসা। তার মধ্যে বিমানবন্দর থেকে মহাখালী অংশেও ছিল তীব্র যানজট। সকাল পৌনে ১০টা থেকে যেন অচল ছিল বিজয় সরণি অংশও। কর্মস্থলমুখো মানুষেরা সময় পার হওয়ার পরও ছিলেন যানজটে।

রাস্তায় গাড়ি কম ছিল। বাস, অটোরিকশা, হিউম্যান হলার কিছুই না পেয়ে অনেকেই অপেক্ষায় ছিলেন বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, ফার্মগেট, শাহবাগ, মিরপুর-১০ ও পুরবী সিনেমা হলের সামনে। দুপুরে স্কুল ছুটির পর বাসের জন্য বৃষ্টি মাথায় নিয়েও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিভিন্ন স্থানে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। বাস কম থাকায় ভিআইপি সড়কেও সকাল ও দুপুরে চলছিল রিকশা। রাস্তার এ পার থেকে ওপারে চলাচলের জন্য রিকশাচালকরা মালিবাগ, রামপুরাসহ বিভিন্ন স্থানে যাত্রীপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা ভাড়া নেয় বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছে।  

বাড্ডা থেকে নয়াপল্টনে বাসে যেতে স্বাভাবিক দিনে আধঘণ্টা লাগে রাশেদুল ইসলামের। সরকারি এ কর্মচারীর গতকাল বাসা থেকে সচিবালয়ে যেতে লেগেছে তিন ঘণ্টা। সচিবালয়ে গিয়েও তিনি জলজটে পড়েন। রাশেদ জানান, রাস্তা নয় যেন নদীর ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে নৌকায় করে পল্টনে এসেছি। তারপর পল্টন থেকে যানজটের ভেতর দিয়ে হাঁটু সমান পানি ভেঙে সচিবালয়ে ঢুকি।

মগবাজারের বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, ঢাকার খালগুলো হারিয়ে গেছে। তবে রাস্তাগুলোই এখন খাল-নদী হয়ে গেছে।

 


মন্তব্য