kalerkantho


ছোট হচ্ছে বাজেট, উঠতে পারে সংসদেও

আবুল কাশেম   

১৭ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



ছোট হচ্ছে বাজেট, উঠতে পারে সংসদেও

চলতি অর্থবছরে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার যে বাজেট পাস হয়েছে, তা কার্যকর করা খুবই কঠিন বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বড় আকারের এই বাজেট প্রণয়ন করতে গিয়ে তিনি যে নতুন মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আইনের ওপর ভর করে বাড়তি রাজস্ব আয়ের হিসাব করেছিলেন, তা এখন তাঁর কাছে ‘অযৌক্তিক’ বলে মনে হচ্ছে। বিভিন্ন পণ্য আমদানির ওপর যে হারে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর কথা ভেবেছিলেন, তা-ও কার্যকর করা যায়নি। পোশাক খাতে করপোরেট করও কমানো হয়েছে, উেস করও কমানো হচ্ছে। ফলে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমানোর সঙ্গে সঙ্গে বাজেটের আকার ছোট করতে হচ্ছে সরকারকে, কমাতে হবে বরাদ্দও। চলতি অর্থবছরের বাজেট কাটছাঁট করে তা আবারও পাস করানোর জন্য উত্থাপন করা হতে পারে জাতীয় সংসদে।

প্রতিবছরই সংসদে পাস হওয়া বাজেট বাস্তবায়নের তোড়জোড় চলে শুরুর মাসগুলোতে। তবে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় সম্ভব না হওয়ায় কাটছাঁট করতে হয় অর্থবছরের শেষ দিকে, এপ্রিল মাসে। বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ কমিয়ে এটি করতে হয়। নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করতে না পারার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের চাপ ও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিবেচনায় এ বছর প্রস্তাবিত বাজেটে যেসব খাতে শুল্ক-কর ও ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাব ছিল, তার কিছুই পাস হয়নি সংসদে। ফলে অর্থবছরের শুরুতেই এবারের বাজেট কাটছাঁট করে ছোট করার উদ্যোগ নিতে হচ্ছে সরকারকে।

এ প্রসঙ্গে গত শনিবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবারের বাজেট বাস্তবায়ন করা খুবই কঠিন হবে। কারণ, বাজেটের আকারে কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু যেসব পরিকল্পনার ওপর ভর করে বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কাজেই এটা নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। এবার চলতি অর্থবছরের বাজেট বেশ আগেই সংশোধন করব। এটি করতেই হবে। তাতে বাজেটের বিভিন্ন অঙ্কে (বাজেটের আকার, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, ঋণ, উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়) পরিবর্তন আসবে। যেমন—রাজস্ব আদায়ে ভ্যাটের ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকার যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, এটা অযৌক্তিক। এটা হবেই না। এটা পরিবর্তন হবে। এটা একটা সমস্যা। এই সমস্যা দূর করতে আমি সব কিছুই করতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। কাজেই রাজস্ব আয়ে ঘাটতি হবে। এটা আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। ’

বাজেট পাসের পরও প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে চারটি খাতের শুল্ক-করে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের উেস কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৭০ শতাংশ নির্ধারণের ফাইলে এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী স্বাক্ষর করেছেন। সিগারেটের সম্পূরক শুল্কেও পরিবর্তন আসবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে না পারার কারণ সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৮ সালে নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে খুবই আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এটি বাস্তবায়ন করা খুবই কঠিন। নতুন ভ্যাট আইন সবার ওপরে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। প্রতিটি স্তরে হিসাব রাখতে হবে ব্যবসায়ীদের। ব্যবসায়ীদের জন্যই এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর আমরা যে বাজেট প্রস্তাব করি, সংসদে তা পাস হয় না। কিছু পরিবর্তন হয়ে পাস হয়। ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে কোনো প্রতিজ্ঞা ছিল না—উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘গত অর্থবছরের বাজেট ঘোষণাতেই আমি সারা দুনিয়াকে জানিয়েছিলাম যে এবার থেকে কার্যকর করব। তবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা এই ভ্যাট আইন কার্যকরের পক্ষে ছিল না। এই আইন কার্যকর না করায় আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক বা অন্য সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। ’

অর্থমন্ত্রী জানান, প্রতিবছরই বাজেটের পর আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক লিখিতভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া জানায়, তাদের আশা পূরণ হয়েছে কি হয়নি। এবার বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া পেয়েছি, আইএমএফের কাছ থেকে এখনো পাইনি।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে এনবিআর দুই লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে, তাতে ভ্যাট থেকে সর্বোচ্চ ৩৬.৮ শতাংশ বা ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি, আয়কর থেকে ৩৪.৩ শতাংশ বা ৮৫ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আমদানি শুল্ক ৩০ হাজার ২৩ কোটি বা ১২.১ শতাংশ এবং সম্পূরক শুল্ক থেকে ৩৮ হাজার ৪০১ কোটি বা ১৫.৫ শতাংশ আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।  

কিন্তু অর্থবিল পাস হওয়ার সময় নতুন ভ্যাট আইন দুই বছরের জন্য স্থগিত করার কারণে ভ্যাট থেকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। এর আগে অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, ভ্যাট আইন কার্যকর করতে না পারায় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হবে। এ কারণে ভ্যাট থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা অর্জন সম্ভব হবে না। এ কারণে আয়কর থেকেই সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা ধরে বাজেট সংশোধন করা হবে। এ ছাড়া সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব কার্যকর না হওয়ায় এ খাত থেকেই রাজস্ব আদায় কমে যাবে।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের রাজস্ব আয়ের উেস কিছু পরিবর্তন করা হবে। অর্থাৎ বিভিন্ন উৎস থেকে রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে পরিবর্তন আসবে। আমি খুবই খুশি হয়েছি এ জন্য যে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আসবে আয়কর ও করপোরেট কর থেকে। ’

চলতি অর্থবছর আয়কর থেকে রাজস্ব যতটা বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টা থাকবে এনবিআরের। বর্তমানে ২৯ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) রয়েছে। এর মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করে ১৪ লাখ। রিটার্ন দাখিলকারীদের সবাই আবার কর দেয় না। এদের মধ্যে কী পরিমাণ টিআইএনধারী কর দেয় না, তা খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেবে এনবিআর। চলতি অর্থবছর করদাতার সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অর্থবছরের বাজেট সংশোধনের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদন নিতে হয়। এটি সাধারণত এপ্রিল মাসে হয়ে থাকে। পরে জুন মাসের শেষে পরের অর্থবছরের বাজেট পাস হওয়ার সময় আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট সংসদে পাস হয়। পরে রাষ্ট্রপতি তাতে অনুমোদন দেন। কিন্তু এবার প্রচলিত নিয়ম ভেঙে আগেই বাজেট সংশোধনের প্রস্তাব জাতীয় সংসদে উত্থাপন করতে পারে অর্থ মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বর্তমান পরিকল্পনা হলো এবার আমি যে বাজেট সংশোধন করব, সেই সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করতে পারি। তবে এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। এটি না করলেও সমস্যা নেই। তবে সংশোধিত বিষয়গুলোতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিলেও হয়। ’

এদিকে বাজেটে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রভাব পড়বে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে। চলতি অর্থবছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এক লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাজস্ব আয় কমে গেলে এত অর্থ এডিবিতে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হবে না। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের অর্থবছরে এডিপিতে কাটছাঁট নিয়ে এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আয় সম্ভব না হলে আমাদের হয় এডিপি কমাতে হবে, না হয় ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে আরো বেশি ঋণ নিতে হবে।  

তবে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এডিপিতে বরাদ্দ কমানোর বিপক্ষে। তিনি বলেছেন, এডিপির জন্য টাকার কোনো সংকট হবে না। প্রয়োজনে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি পরিমাণ ঋণ নেওয়া হবে।


মন্তব্য