kalerkantho


লন্ডনে মুসল্লিদের ওপর গাড়ি হামলা বাংলাদেশি নিহত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২০ জুন, ২০১৭ ০০:০০



 লন্ডনে মুসল্লিদের ওপর গাড়ি হামলা বাংলাদেশি নিহত

উত্তর লন্ডনের ফিনসবেরি পার্ক মসজিদের বাইরে রবিবার রাতে নামাজ পড়ে ফেরার পথে মুসল্লিদের ওপর গাড়ি তুলে দেয় এক অজ্ঞাতনামা। এতে একজন নিহত ও ১০ জন আহত হন। ঘটনার পর সাধারণ ব্রিটিশরা ঘটনাস্থলে ফুল দিয়ে হতাহতদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে। ছবি : এএফপি

লন্ডনে একটি মসজিদের সামনে মুসল্লিদের ওপর গাড়ি উঠিয়ে দেওয়ার ঘটনায় এক বাংলাদেশি নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছে। রবিবার রাতে তারাবির নামাজ শেষে মুসল্লিরা মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে এই হামলাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে অভিহিত করেছেন। হামলার ঘটনায় লন্ডন পুলিশ ৪৮ বছর বয়সী এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করেছে। এ ঘটনায় আতঙ্কের মধ্যে থাকা ব্রিটেনে মুসলিমরা আরো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।

হামলায় নিহত বাংলাদেশির নাম মকরম আলী (৫০)। তিনি হিরন মিয়া নামে পরিচিত। বাংলাদেশে তাঁর বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায়। তিনি ব্রিটিশ নাগরিক। এ নিয়ে গত চার মাসে এটি ব্রিটেনে চতুর্থ সন্ত্রাসী হামলা। এর আগে ওয়েস্টমিনস্টার, ম্যানচেস্টার ও লন্ডন ব্রিজে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল।

উত্তর লন্ডনের সেভেন সিস্টার্স রোডের ফিন্সবেরি পার্ক মসজিদের কাছে হামলার এ ঘটনা ঘটে। এটি ব্রিটেনের অন্যতম বড় মসজিদ। ফিন্সবেরি পার্ক এলাকার মুসলিম ওয়েলফেয়ার হাউসের কাছে মসজিদটির অবস্থান। এলাকাটি বাংলাদেশি ও সোমালীয় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত।

হামলায় আহত ব্যক্তিদের পরিচয় জানাতে পারেনি পুলিশ। তবে সবাই মুসলিম।  

ঘটনার পর টেরেসা মে, লন্ডনের মেয়র সাদিক খান ও বিরোধীদলীয় নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তাঁরা স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। স্থানীয়রা জানায়, ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ব্রিটিশ নিরাপত্তামন্ত্রী বেন ওয়ালেস বলেছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মীরা সন্দেহভাজন ব্যক্তির পরিচয় জানতে পারেননি। হামলার পর প্রধানমন্ত্রী জরুরি নিরাপত্তা বিষয়ক কোবরা কমিটির সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, এক মুসল্লি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে তাঁকে ঘিরে পথচারীরা সেবা করছিল। তখনই একটি ভ্যান ওই ভিড়ের মধ্যে উঠিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় অসুস্থ হয়ে পড়া ব্যক্তিটি মারা যান। তবে তিনি গাড়ির ধাক্কার কারণেই মারা গেছেন কি না—বিষয়টি স্পষ্ট নয়। লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের উপসহকারী কমিশনার নেইল বাসু বলেন, এটা খুব তাড়াতাড়ি বলা হয়ে যাবে যে ওই লোকটি সন্ত্রাসী হামলায় মারা গেছেন।

তবে লন্ডনে বসবাসরত এক বাংলাদেশি কালের কণ্ঠকে ফোনে জানান, ফিন্সবেরি পার্ক মসজিদের কাছে একটি বাসস্ট্যান্ড আছে। বাংলাদেশি ব্রিটিশ হিরন মিয়া মসজিদ থেকে বের হয়ে রাস্তায় বাসস্ট্যান্ডের কাছে আসার পরই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি আগে থেকেই হৃদরোগী ছিলেন। এ ছাড়া তাঁর পায়েও সমস্যা রয়েছে। হিরন মিয়া পড়ে যাওয়ার পর তাঁর সেবায় মুসল্লিরা এগিয়ে আসে। তখন সেখানে জটলার সৃষ্টি হয়। ওই সময় সাদা রঙের একটি ভ্যান জটলার ওপর তুলে দেওয়া হয়। তিনি জানান, সেখান সোমালিয়ার এক নাগরিক মারা গেছেন বলেও তিনি শুনেছেন। তবে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পুলিশ জানিয়েছে, ফিন্সবেরি পার্ক মসজিদের কাছে আহত ব্যক্তিরা সবাই মুসলিম। তারা নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হচ্ছিল। লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি সহকারী কমিশনার নেইল বাসু বলেন, যখন অসুস্থ ব্যক্তিকে রাস্তায় প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল, তখনই ভ্যানটি ওই ব্যক্তির ওপর দিয়ে চালিয়ে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, হামলায় আহত আটজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

আবদুল রহমান নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “হামলার পর এক ব্যক্তি গাড়িটি থেকে বের হয়ে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করে। এ সময় সে বলছিল, ‘আমি সব মুসলমানকে হত্যা করতে চাই, আমি সব মুসলমানকে হত্যা করতে চাই। ’ আমি তখন তার পেটে আঘাত করি। আমার পর অন্যরাও তাকে ধরে মাটিতে ফেলে পেটাতে থাকে। পুলিশ আসার আগ পর্যন্ত আমরা তাকে আটকে রাখি। ” তিনি বলেন, লোকটি চেয়েছিল ওখানকার সব মুসলমানকে মেরে ফেলতে। এ সময় হামলাকারী চিৎকার করে বলছিল, ‘আমাকে মেরে ফেলো। আমি আমার কাজ করে ফেলেছি। ’

আদিল রানা নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, মুসল্লিরা হামলাকারীকে ধরে মাটিতে ফেলে প্রহার করতে থাকে। এ সময় মসজিদ থেকে ইমাম এসে সবাইকে থামান এবং লোকটিকে মারতে নিষেধ করেন।

হামলার পর মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন লন্ডনের মেয়র সাদিক খান। মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন (এমসিবি) বলছে, পরিকল্পিতভাবে ওই ভ্যানটি মুসল্লিদের ওপর তুলে দেওয়া হয়। সে সময় নামাজ শেষে অনেকে মসজিদ থেকে বের হচ্ছিল। এ ঘটনাকে ‘ইসলামভীতির সহিংস প্রকাশ’ হিসেবে বর্ণনা করে যুক্তরাজ্যের মসজিদগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছে কাউন্সিল।

পুলিশ বলছে, হামলাকারী একজনই ছিল। তবে অনেক প্রত্যক্ষদর্শী শুরুতে বলেছিল, হামলাকারী একাধিক ছিল। মুসলিম ওয়েলফার হাউসের সিইও তৌফিক কাসিমি বলেন, হামলার ঘটনায় জরুরি কোবরা কমিটির সঙ্গে বৈঠক শেষে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে ঘটনাটিকে ‘ভয়ংকর’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘হতাহতদের পরিবার ও ঘটনাস্থলে থাকা জরুরি বিভাগের সবার পাশে আছি আমি। ’

আতঙ্কিত বাংলাদেশিরা : হামলার পর ঢাকায় কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদক যোগাযোগ করেন লন্ডনে অবস্থানরত সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হকের সঙ্গে। তিনি বর্তমানে লন্ডনের এসওএস ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি ডিগ্রি করছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, রবিবার রাতে মসজিদের সামনে হামলার পর থেকে ব্রিটেনে মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে গেছে। কয়েক মাস আগে লন্ডন ব্রিজ ও পার্লামেন্ট ভবনের সামনে হামলার পর থেকে এই আতঙ্ক দেখা দেয়। তিনি বলেন, ‘পার্লামেন্ট ভবনে হামলার আগে বহু সংস্কৃতির এ দেশটিকে খুবই নিরাপদ মনে হতো। কিন্তু এখন আমরা একা বের হতে নিরাপদ বোধ করি না। রাতে একা বের হই না। দিনেরবেলায়ও সাবধানে থাকি।

 


মন্তব্য