kalerkantho


মজুদে টান ভিজিএফে চালের বদলে গম

আশরাফুল হক রাজীব   

২০ জুন, ২০১৭ ০০:০০



মজুদে টান ভিজিএফে চালের বদলে গম

পর্যাপ্ত চাল না থাকায় এবার ঈদে অতি দরিদ্রদের জন্য ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচিতে চালের বদলে গম দেওয়া হচ্ছে। প্রতি কেজি চালের দর অনুযায়ী সমমূল্যের গম দেওয়া হবে।

এতে এক লাখ টন চালের বিপরীতে এক লাখ ৩২ হাজার টন গম লাগবে। গতকাল সোমবার খাদ্য অধিদপ্তর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বদরুল হাসান কালের কণ্ঠ বলেন, ‘চালের পরিবর্তে গম দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঈদের আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে তা পৌঁছে যাবে। ’

ঈদে সাধারণত ভিজিএফ কর্মসূচিতে চাল দেওয়া হয়। এতে দরিদ্র পরিবারের মধ্যে একটি আনন্দের আবহ তৈরি করা হয়। এবার কেন গম দেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারের খাদ্য মজুদ সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। আপৎকালীন মজুদ ১০ লাখ টন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে সরকারের গুদামে চাল ও গম আছে মাত্র চার লাখ ৯৫ হাজার ৭০ টন। এর মধ্যে চালের মজুদ মাত্র এক লাখ ৮৯ হাজার টন।

হাওরে বন্যা, বোরো ধানে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ, সারা দেশে অতিবৃষ্টি—সব কিছু মিলে বোরো মৌসুমের শুরুতেই ধান-চালের মজুদ কমে যায়। এ ছাড়া ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিক্রি কর্মসূচিতে সাড়ে সাত লাখ টন চাল সরবরাহ করার কারণেই মূলত মজুদে টান পড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, ওই কর্মসূচি নেওয়ার আগে তেমন কোনো প্রস্তুতি অথবা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। এ কারণেই মজুদ কমার সঙ্গে সঙ্গে সেটি পূরণ করাও সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড় ধস, ঘূর্ণিঝড় মোরা, হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যাও খাদ্য মজুদ কমে যাওয়ার কারণ বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, এসব দুর্যোগের বিষয়টি তাঁদের ধারণার মধ্যেই ছিল না।

খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, গুটি ও স্বর্ণার মতো মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা দরে। কিন্তু বাজারে ৫০ টাকা কেজির নিচে কোনো চাল পাওয়া যাচ্ছে না।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদেশ থেকে ছয় লাখ টন চাল আমদানি করতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ভিয়েতনাম থেকে সরকার টু সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে আড়াই লাখ টন চাল আমদানির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে আরো দেড় লাখ টন চাল আমদানি করা হচ্ছে। শিগগিরই আরো ৫০ হাজার টন চালের জন্য টেন্ডার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। ২০ থেকে ২২ দিনের মধ্যে ভিয়েতনামের চাল দেশে এসে পৌঁছবে। আন্তর্জাতিক টেন্ডারের চালও এর কাছাকাছি সময়ে পৌঁছবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চাল সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়ার পর সরকার বিদেশে হাত বাড়িয়েছে। গত ২ মে থেকে সারা দেশে বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। দেশের বাজার থেকে চাল সংগ্রহের এ অভিযান চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে ৩২ হাজার ২৯৬ টন সিদ্ধ ও আতপ চাল। গত ১৫ জুন পর্যন্ত সাত হাজার ২৬২টি মিল মালিকের সঙ্গে দুই লাখ ১০ হাজার টন বোরো চাল সরবরাহের চুক্তি হয়েছে। সরকারের তালিকাভুক্ত মিল মালিকের সংখ্যা ২২ হাজার ৬৫৪ জন। যেসব মিল মালিক সরকারের সঙ্গে এবার চুক্তি করেননি তাঁদের রেজিস্ট্রেশন নবায়ন না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারের ধারণা, বাজারে দাম বেশি হলেও বেসরকারি পর্যায়ে চালের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া মিল মালিকদের কাছেও বাড়তি চাল থাকতে পারে। এ ধারণা থেকেই খাদ্য অধিদপ্তর মিল মালিকদের মজুদ জানানোর নির্দেশ দিয়েছে। বেশির ভাগ চালকল মালিক এসংক্রান্ত চিঠি পেয়েছেন।

সরকারের সঙ্গে চুক্তি করার অনীহার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান বাজারে মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা কেজিতে। আর সরকার চালের দাম নির্ধারণ করেছে ৩৪ টাকা। সরকারি দামে কোথাও চাল পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষক ওই দামে আমাদের চাল দিচ্ছে না। ’

খাদ্য মজুদ ঝুঁকির বিষয়ে সাবেক সচিব আবদুল লতিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মজুদ যত কম হবে ততই দাম হু হু করে বাড়বে। ব্যবসায়ীরা যখন জানতে পারে সরকারি মজুদ কম, তখন তারা ইচ্ছামতো দাম বাড়াবেই। আগাম বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা যদি থাকে, তাহলে তো দাম ও মজুদ দুটোই বাড়াবে তারা। কারণ তারা জানে, মজুদ পর্যাপ্ত না থাকায় ইচ্ছা করলেই সরকার ওএমএস বা অন্য কোনো কর্মসূচি চালু করতে পারবে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গরিব ও সাধারণ মানুষ। বিপদের কথা চিন্তা করেই আপৎকালীন মজুদ রাখা হয়। চালের সরকারি মজুদ দুই লাখ টনের নিচে নেমে আসাটা ভালো খবর নয়। সরকারের উচিত, যেকোনো মূল্যে মজুদ ও বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো। কারণ একদিকে সরকারি গুদামে চাল নেই; অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছে, তাদের কাছেও চাল নেই। ’

চাল আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার কোনো মহলের কারসাজি কি না জানতে চাইলে সাবেক এই খাদ্যসচিব বলেন, ‘আমদানি না করলে চালের দাম বাড়তেই থাকবে। আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক রাখা প্রয়োজন। একেবারে তুলে দিলে আবার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চালের মজুদ পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলে হাওর অঞ্চলসহ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় আরো বেশি খাদ্য সহায়তা দিতে পারত সরকার। ’


মন্তব্য