kalerkantho


সড়ক ডুবছে, খানাখন্দে যানবাহন স্থবির

পার্থ সারথি দাস ও তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

২০ জুন, ২০১৭ ০০:০০



সড়ক ডুবছে, খানাখন্দে যানবাহন স্থবির

থইথই পানিতে মহাসড়কের অর্ধেকটাতেই যানবাহন চলতে পারছে না। ফলে বাস-ট্রাকের সারি হচ্ছে দীর্ঘ। গতকাল ঢাকা-জয়দেবপুর সড়কে যানজট ১০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। গাজীপুরের ভোগড়া এলাকার দৃশ্য। ছবি : কালের কণ্ঠ

আগাম ভারি বর্ষণে রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বেশির ভাগ জেলায় যেন হঠাৎ দুর্যোগ নেমে এসেছে। সড়ক-মহাসড়কে দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। খানাখন্দময় সড়ক ও মহাসড়কে পানি জমে থেকে বিটুমিন উঠে যাচ্ছে। গাড়ি চলতে গিয়ে কোথাও বিকল হচ্ছে, কোথাও উল্টে পড়ছে। প্রাণ যাচ্ছে মানুষের।

ছয় জেলায় পাহাড়ধসে গতকাল সোমবার পর্যন্ত প্রাণ গেছে ১৬০ জনের। বর্ষণের সঙ্গে হচ্ছে বজ্রপাত। এতেও ঘটছে প্রাণহানি। গতকালও বজ্রপাতে সারা দেশে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে সিলেটে এরই মধ্যে তিনজন মারা গেছে।

প্রাণহানি ছাড়াও আছে দুর্ভোগ।

ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এখন ঘরমুখী মানুষ। বর্ষণের কারণে খানাখন্দে ভরা সড়ক-মহাসড়কে লেগে আছে চরম ভোগান্তির যানজট। ঈদের কেনাকাটা ও ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে পড়েছে। যানবাহন ও মানুষের চলাফেরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ায় ওই সব এলাকার ব্যবসায়ীরাও লোকসানের মধ্যে পড়েছে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসারে, বর্ষণ আরো দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে। বর্ষণ অব্যাহত থাকলে আরো পাহাড়ধস ও অকাল বন্যার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই আশঙ্কার মধ্যেই গতকাল ভারি বর্ষণে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়ায় পাহাড়ধসে রেলপথ বন্ধ হয়ে যায়। এতে সারা দেশের সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল প্রায় চার ঘণ্টা। ঢাকা-সিলেট পুরনো মহাসড়কের চণ্ডিপুল সেতু ভেসে গেছে পাহাড়ি ঢলে। এর আগে থেকেই চট্টগ্রাম-রাঙামাটি যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেটসহ বিভিন্ন মহাসড়কে পানি জমে পিচ উঠতে শুরু করেছে।

আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুসারে, অন্যান্য বছরের চেয়ে জুনে বৃষ্টিপাত হচ্ছে বেশি। গত এপ্রিলে তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে। সাধারণত ভারি বর্ষণ জুলাই থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে হয়ে থাকে। জুলাই ও আগস্টে অপেক্ষাকৃত বেশি বৃষ্টিপাত হয়। ১৮ জুন পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৯ শতাংশ বেশি।

এবার অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত : আবহাওয়াবিদ আরিফ হোসেন গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, এবার জুনের প্রথম ১৮ দিনেই ২৯ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। গত বছর পুরো জুন মাসে ২৫ শতাংশ বেশি, ২০১৪ সালের পুরো জুনে ১৮ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল। গত বছর ১৭ জুন মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ শুরু হয়েছিল, এবার শুরু হয়েছে ১২ জুন থেকে। আরো দুই-একদিন ভারি বা অতি ভারি বৃষ্টিপাত থাকবে চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ বিভাগে। রাজশাহীতে কম বৃষ্টিপাত হবে। অতিবর্ষণের ফলে চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।

মহাসড়ক বিভাগের সব কর্মচারীর ছুটি বাতিল : বর্ষা মৌসুম ও আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের মহাসড়কে যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সব কর্মচারীর ছুটি গতকাল থেকে ঈদুল ফিতরের পরবর্তী তিন দিন পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। গতকাল সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে এ আদেশ জারি করা হয়েছে।

ভূমিধসের শঙ্কা : কদিন পরেই ঈদুল ফিতর। ঈদ যাত্রার প্রস্তুতি চলছে ঘরে ঘরে। রাজধানীতে চলছে কেনাকাটার শেষ পর্যায়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানী আসা মানুষের ভিড়ও যোগ হয়েছে বিভিন্ন বিপণিবিতান ও ফুটপাতে। সামান্য বর্ষণেই তাদের কেনাকাটার আনন্দ ম্লান হয়ে যাচ্ছে অসহনীয় জলজট ও যানজটে। গতকাল সকালে ভারি বর্ষণে রাজধানীর অনেক এলাকা তলিয়ে যায়। প্রায় দুই ঘণ্টার ভারি বর্ষণে সড়ক, বিপণিবিতানের সামনের সড়ক, ফুটপাত তলিয়ে যাওয়ায় ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা দিনের শুরুতেই মন খারাপ করে ঘরে ফেরেন। অবশ্য অনেকেই আকাশের অবস্থা বুঝতে পেরে দেরিতে ঘর থেকে বের হন। কিন্তু দুঃসহ দুর্ভোগ তাদের পিছু ছাড়েনি। জলজটের কারণে যানজটের তীব্রতা ছিল বেশির ভাগ সড়কে। রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার জন্য বের হওয়া মানুষও রাস্তায় জলে-কাদায় আর যানজটে আটকা পড়ে।

হবিগঞ্জে ভেসে ও দেবে গেছে দুই সেতু : গতকাল ভোরে ঢাকা-সিলেট পুরনো মহাসড়কের হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চণ্ডিছড়া সেতু ভেঙে গেছে। দুদিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সেতুটি ভেসে যায়। ফলে শায়েস্তাগঞ্জ-চুনারুঘাট-মাধবপুর সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। আমু চা বাগান থেকে আমুরোড হয়ে বিকল্প সড়কও পানিতে তলিয়ে গেছে। হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, উপজেলার তিনটি চা বাগানসহ এলাকার হাজার হাজার মানুষ যাতায়াতে চরম ভোগান্তির শিকার হয়। এ ছাড়া দেবে গেছে সুতাং ব্রিজ। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শায়েস্তাগঞ্জ-জগদিশপুর পুরাতন সড়কের সুতাং নদীর ওপরের এ ব্রিজটির এক পাশ দেবে যায়। দুর্ঘটনা এড়াতে পুলিশ প্রশাসন ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ব্রিজের ওপর দিয়ে সকল প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সিলেট থেকে ট্রেন বন্ধ : গত রবিবার ও গতকাল সকালে ভারি বর্ষণে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর মাগুরছড়া পাহাড়ি এলাকায় রেলওয়ের ২৯৮-এর ১/২ নম্বর খুঁটির কাছে পাহাড় ধসে রেলপথের ওপর পড়ে।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার জানান, পাহাড়ধসের কারণে সকাল সোয়া ৮টা থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্ত নগর কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনটি ভানুগাছ স্টেশনে আটকা পড়ে। খবর পেয়ে রেলওয়ের কর্মীরা সকাল ৯টা থেকে রেললাইন থেকে মাটি সরানোর কাজ শুরু করেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর রেললাইনের ওপর থেকে মাটি সরিয়ে ট্রেন লাইন চলাচলের উপযোগী করা হয়।

ভানুগাছ স্টেশন মাস্টার শাহাবুদ্দীন ফকির বলেন, মাটি সরানোর কাজ শেষ হয় সাড়ে ১১টার দিকে। এরপর দুপুর প্রায় ১২টায় কালনী ট্রেন ভানুগাছ স্টেশন থেকে ঢাকার পথে রওনা হয়।

শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার জাফর আলম বলেন, লাইন স্বাভাবিক হওয়ার পর শ্রীমঙ্গল স্টেশনে আটকা পড়া জালালাবাদ এক্সপ্রেস সিলেটের পথে ছেড়ে গেছে।

পানি বাড়ছে নদ-নদীতে : খোয়াই নদীর পানি দ্রুতগতিতে বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড আশঙ্কা করছে, নদীর ১৬০ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এম এল সৈকত জানান, গতকাল সকালে ভারতের খোয়াই মহকুমায় অবস্থিত খোয়াই ব্যারাজ খুলে দেওয়ায় নদীতে পানি বাড়ছে। বিকেল নাগাদ নদীর বাল্লা সীমান্তে পানির প্রবাহ ছিল ২৪ মিটার, যা বিপদসীমার ২৩০ সেন্টিমিটার ওপরে। হবিগঞ্জ শহরে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল ১০ দশমিক ৭০ মিটার দিয়ে, যা বিপদসীমার ১২০ সেন্টিমিটার ওপরে।

হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক সাবিনা আলম জানান, খোয়াই নদীর পানি বাড়ায় শহরবাসীকে সতর্ক করতে মাইকিং করা হয়েছে।

এদিকে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার দীঘলবাক ইউনিয়নের ১০টি গ্রাম আবারও প্লাবিত হয়েছে। কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদী তীর উপচে গ্রামগুলোতে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করে। এতে সহস্রাধিক বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, স্কুল, মাদ্রাসা, দোকান, আউশ ধান ও বিভিন্ন জাতের সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে পুকুর ও মাছের ঘের।

মহাসড়কে বিপর্যয় : ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানজট লেগেই আছে। গতকাল ভোর থেকে সৃষ্ট যানজট বেলা বাড়ার সঙ্গে দীর্ঘ হয় ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল, টঙ্গী-ঘোড়াশাল-সিলেট মহাসড়ক ও ঢাকা বাইপাস সড়কে। টঙ্গী থেকে চান্দনা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার পথ যেতে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা লেগেছে জানিয়ে ঢাকা পরিবহনের চালক বাবুল হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতার জন্য রুট পরিবর্তন করে গাড়ি চালাতে হচ্ছে।

গাজীপুর থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, টানা ভারি বর্ষণে গাজীপুরের চার সড়ক-মহাসড়কে পানি জমে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় গতকাল। যানজটে আটকে পড়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়ে যাত্রী ও পরিবহন চালক-শ্রমিকরা। সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক, টঙ্গী-ঘোড়াশাল-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ঢাকা বাইপাস সড়কের কয়েকটি স্থান ঘুরে দেখা গেছে, সড়ক-মহাসড়কে থমকে আছে বাস, ট্রাক, যানবাহন, কাভার্ড ভ্যান, ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহন।

চালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ভোগড়া বাইপাস মোড় পর্যন্ত গিয়ে দেখা গেছে পুরো সড়ক পানিতে তলিয়ে আছে। সড়কের কোথাও হাঁটুপানি কোথাও বা কোমর পানি। পানির কারণে চলতে না পেরে যানবাহন ঢাকা ও ময়মনসিংহ উভয় দিকগামী যানবাহনগুলো অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে।   ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোনাবাড়ী এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে সারি সারি বিভিন্ন প্রকার যানবাহন আটকে আছে। যানজটের প্রভাব পড়ে ঢাকা বাইপাস ও টঙ্গী-ঘোড়াশাল-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে।

রাজধানীতে সীমাহীন দুর্ভোগ : গতকাল বৃষ্টির পর ডুবে যায় রাজধানীর নিম্নাঞ্চল। বেশির ভাগ এলাকায় রাস্তাও ডুবে যায়। মৌচাক-মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী থেকে কুতুবখালী, মেয়র হানিফ উড়াল সেতুর নিচের রাস্তা, হাতিরঝিল, রামপুরা, বনশ্রী, আগারগাঁওয়ে আইডিবি ভবনের সামনের অংশ, মিরপুর-১২ নম্বর, কারওয়ান বাজারের মূল সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় এসব এলাকায় যানবাহন চলে ধীরগতিতে। এতে সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।

মালিবাগ-মৌচাক-রাজারবাগ-শান্তিনগর অংশে উড়াল সেতুর কাজের কারণে আগে থেকেই এখানে চলাচলের রাস্তা অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় রাস্তাঘাট। গতকাল এসব এলাকার রাস্তায় রিকশাও ডুবে গেছে।

মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা ছন্দা চৌধুরী বলেন, ‘বাসায় একপ্রস্ত ও ব্যাংকে আরেক প্রস্ত পোশাক রাখতে হয়, রাস্তায় হাঁটতে হয় হাঁটুপানিতে। ’

খিলক্ষেত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সব রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে। দোকানপাটে ঢুকেছে পানি। স্থানীয় লোকজন ভ্যান ও রিকশা ছাড়া অন্য কোনো বাহন পাচ্ছে না। ঈদ সামনে রেখে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পসরা সাজিয়েছিল। কিন্তু জলাবদ্ধতার জন্য তাদের বিপদে পড়তে হয়। পানি জমে থাকায় এসব ব্যবসায়ীর কেনাবেচায় ধস নামে। স্থানীয় ব্যবসায়ী কেরামত আলী বলেন, আকাশে মেঘ দেখলেই আর দোকান নিয়ে বসি না।

দুপুরে খিলক্ষেত বটতলা এলাকায় ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাশেদুল ইসলাম কিরণ বলেন, ‘আমাদের অফিসের নিচতলায়ও পানি ঢুকেছে। পার্টিক্যাল বোর্ড ও বস্তা দিয়ে কোনো রকমে পানি আটকানো হয়েছে। জলাবদ্ধতা শুরু হয়েছে প্রথম রমজান থেকে। জলাবদ্ধতার জন্য ১৫-২০ দিন ধরে আমরা যেমন ভুগছি, তেমনি ব্যাংকে সেবা নিতে আসা গ্রাহকরাও ভয়াবহ ভোগান্তিতে পড়ছে। ’

খিলক্ষেত এলাকার বটতলা ছাড়াও স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে এলাকার মান্নান প্লাজা, টাঙ্গাইল প্লাজা, ভাই ভাই প্লাজাসহ বেশ কিছু বহুতল ভবনের গ্যারেজে।

এ ছাড়া মৌচাক, মালিবাগ, রাজারবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, কারওয়ান বাজার, বেগুনবাড়ী, পান্থপথের বিভিন্ন অংশ, মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কালশী, পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোড, যাত্রাবাড়ী মোড়সহ বেশি কিছু এলাকার রাস্তা তলিয়ে যায়। মিরপুর ১০ নম্বর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়ায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। গত কয়েক দিনে সামান্য বৃষ্টি হলেই কারওয়ান বাজরের টিসিবি ভবনের সামনে পানি জমে থাকে। বিজিএমইএ ভবনের সামনে ও সোনারগাঁও হোটেলের সামনের সড়ক গতকালও পানিতে তলিয়ে ছিল। যানবাহন চলাচল করতে পারছিল না। অটোরিকশাসহ ছোট যানবাহনের ইঞ্জিনে পানি ঢুকে বিকল হয়ে পড়ছিল।

দুপুরে টিসিবি ভবনের সামনে পানিতে বিকল অটোরিকশা টেনে নিয়ে যেতে যেতে সরোয়ার আলী বললেন, ‘বিষ্টি হইলেই গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। ’

ঢাকার বিভিন্ন পরিবহন মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, বর্ষণের কারণে বিকেল পর্যন্ত বেশির ভাগ বাস ও মিনিবাস গ্যারেজে ও রাস্তায় আটকা ছিল। এতে করে যাত্রীরা পরিবহনসংকটে ছিল। বিকেলে পরিবহন সংকটের সঙ্গে যোগ হয় অতিরিক্ত ভাড়ার ভোগান্তি।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে যাওয়ার জন্য মিরপুর ১০ নম্বর থেকে শিকড় পরিবহনের বাসে উঠে তিন ঘণ্টায় মৎস্য ভবন পর্যন্ত আসতে পারেন সেলিম আউয়াল।

রাজধানীর মাণ্ডা, জুরাইন, মীরহাজীরবাগ, কদমতলী, ইসলামবাগ, পাটেরবাগ, পোস্তগোলা, মুগদা, নন্দীপাড়া, শ্যামপুর, কুতুবখালী, ডিএনডি বাঁধ, মাতুয়াইল, ডেমরা, মিরপুরের বেড়িবাঁধ, মোহাম্মদপুরের বসিলা, খিলগাঁও নবীনবাগ এলাকায় জলাবদ্ধতায় রাস্তাঘাট ও বাসাবাড়িতে মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। পানির সঙ্গে পয়োবর্জ্য মিলে বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা পানির জন্য সিটি করপোরেশনের লোকজনও সংগ্রহ করছে না। ফলে এসব ময়লা পানি ভেসে ভয়াবহ দুর্গন্ধের সৃষ্টি হচ্ছে। হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে নিজেদের রান্নার কাজও করা হচ্ছে চৌকির ওপর চুলা বসিয়ে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বাড়তি ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করছে।

পূর্ব জুরাইনে হাজী খোরশেদ সরদার সড়কের আশপাশের বাসিন্দারা পানিবন্দি হয়ে আছে। এই এলাকার বহুতল ভবনগুলোর নিচতলায় পানি ঢুকেছে। বস্তিবাসী ও নিম্নবিত্ত বাসিন্দাদের ঘরবাড়িতে ছিল হাঁটুপানি। চৌকির ওপর চুলা রেখে রান্নাবান্না করছে তারা। আশপাশের সব দোকানপাট বন্ধ।

আলী সরদার রোডের বাসিন্দা মো. সালাউদ্দিন বলেন, ‘গত ২০-২৫ বছর ধরে এই এলাকায় বাস করছি। একটু বৃষ্টি হলেই প্রতিটি বাসাবাড়ির নিচতলা পানির নিচে ডুবে যায়। রাস্তার ওপর হাঁটুপানি ওঠে। রিকশা-সিএনজি কিছুই চলে না। এই এলাকার জনপ্রতিনিধিরা সব সময় প্রতিশ্রুতি দেন জলাবদ্ধতা নিরসনের। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। ’

জুরাইন আশরাফ মাস্টার উচ্চ বিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকারও একই অবস্থা। পূর্ব জুরাইন কমিশনার গলিতে হাঁটুপানি জমে আছে দীর্ঘ সময় ধরে। এই এলাকার খোরশেদ আলী সরণি থেকে চেয়ারম্যানবাড়ী পর্যন্ত পুরো এলাকায় হাঁটুপানি। অনেক এলাকায় নৌকা দিয়ে চলাচল করছে সাধারণ মানুষ।

কদমতলী এলাকার জলাবদ্ধতা আরো প্রকট। কদমতলী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী জলাবদ্ধতার একাধিক ছবি তাঁর ফেসবুক পেজে পোস্ট করে বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে যেন সাগরের বুকে চারদিকে পানির মধ্যে জেগে ওঠা কোনো দ্বীপ। পানির তীব্র স্রোত খরস্রোতা নদীকেও হার মানায়। চলাচলরত যানবাহনগুলো দেখলে মনে হয় নদীর বুক চিরে প্রচণ্ড গতিতে ধেয়ে আসা কোনো স্পিডবোট, যার গতির কারণে সৃষ্ট উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে তীরে। ’

দ্রুত পানি অপসারণের জন্য রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। প্রতিটি টিমে ১০ জনের বেশি সদস্য রয়েছে বলে জানান সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

 


মন্তব্য