kalerkantho


দেখি কিভাবে যান বলেই হামলা

মির্জা ফখরুলের গাড়িবহরে হামলাকারীদের মধ্যে ছিলেন ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতারাও

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও চট্টগ্রাম   

১৯ জুন, ২০১৭ ০০:০০



দেখি কিভাবে যান বলেই হামলা

রাঙামাটিতে যাওয়ার পথে রাঙ্গুনিয়ায় মির্জা ফখরুলের গাড়িবহরে হামলার পর লাঠিসোঁটা হাতে মিছিল। (ইনসেটে)। হামলার পর পর মির্জা ফখরুল। ছবি : কালের কণ্ঠ

পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন এবং ত্রাণ বিতরণ করতে রাঙামাটি যাওয়ার পথে গতকাল রবিবার সকালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় হামলার শিকার হয়েছে বিএনপি প্রতিনিধিদলের গাড়িবহর। হামলায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের পাঁচ শীর্ষ নেতা আহত হয়েছেন। ভাঙচুর করা হয়েছে পাঁচটি গাড়ি। সকাল ১০টার দিকে উপজেলার ইছাখালী এলাকায় ওই হামলা হয়। হামলাকারীদের মধ্যে উপজেলা ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরাও ছিল। পরিচয় প্রকাশ করা হবে না—এমন শর্তে উপজেলা ছাত্রলীগের এক নেতাই কালের কণ্ঠ’র কাছে হামলার কথা স্বীকার করেছেন।

ঘটনার পর হামলার নিন্দা জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া টুইট বার্তায় বলেছেন, এটা গণতন্ত্র, রাজনীতি, নাগরিক অধিকার ও পরমতসহিষ্ণুতার ওপর হামলা। এর পরিণাম শুভ হবে না। মির্জা ফখরুল বলেছেন, এ হামলা মুক্তচিন্তা ও গণতন্ত্রের ওপর আঘাত।

ঘটনার পর ওই বহরে থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অভিযোগ করেন, রাঙ্গুনিয়ার আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাছান মাহমুদের লোকজন হামলা করেছে। তবে হাছান মাহমুদ দাবি করেছেন, বিএনপি নেতাদের গাড়ির ধাক্কায় দুজন আহত হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

হামলার ঘটনার পর সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে সেখানে কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর সঙ্গে কালের কণ্ঠ’র কথা হয়। হামলায় অংশ নেওয়া স্থানীয় এক ছাত্রলীগ নেতা হামলার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। হামলার ভিডিওচিত্রেও তাঁকে ঘটনাস্থলে মিছিলে করতে দেখা গেছে। তবে তিনিসহ হামলায় জড়িত তাঁর অন্য সহযোগীদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান তিনি।

ছাত্রলীগের ওই নেতার ভাষ্যমতে, ‘আমরা সকাল থেকেই ১৫ জনের মতো নেতাকর্মী ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়েছিলাম। সামনেই ইট ও লাঠি রাখা ছিল। এমনিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অটোরিকশার জটলা থাকে। বিএনপি নেতাদের গাড়িবহর এখানে পৌঁছলে গতি শ্লথ হবে ভেবেই সেখানে অবস্থান নিই আমরা। সকাল সোয়া ১০টার পর দেখি ১৫-১৬টি গাড়ির বহর নিয়ে মির্জা ফখরুল কাপ্তাইয়ের দিকে যাচ্ছেন। গাড়ির বহর অটোরিকশার জটলায় পড়ে শ্লথ হয়ে যায়। প্রথম গাড়িটি ছিল একটি মাইক্রোবাস। তাতে বসা ছিলেন কাপ্তাই উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা দিলদার হোসেনসহ কয়েকজন। তাঁদের দেখেই আমরা চিনতে পারি। তাঁদের অনুরোধ করি, সামনে না গিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে। প্রথম রাজি হননি তাঁরা। পরে ধমক দিতে হয়েছে। ওই গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়ার পর মির্জা ফখরুলকে বহনকারী কালো রঙের পাজেরো গাড়িটি সামনে পড়ে। গাড়ির কাচ নামিয়ে কথা বলতে চান মির্জা ফখরুল। আমরা তাঁকে অনুরোধ করি ফিরে যেতে। কিন্তু তিনি কড়া ভাষায় বলেন, ‘আমি যাব, আমাকে ফিরিয়ে দেবে তোমরা কারা?’ আমরা আবারও অনুরোধ করি, রাঙামাটি বা কাপ্তাই নয়, চট্টগ্রামে ফিরে যান। কিন্তু তিনি গো ধরে বলেন, ‘আমি যাবই যাব, দেখি আমাকে কে বাধা দেয়। ’ এ কথা শুনেই মাথা গরম হয়ে যায়। কিভাবে যান দেখি—বলেই নেতাকর্মীরা ইট ও লাঠি নিয়ে গাড়ি ভাঙচুর শুরু করে। আমরা ১৫ জনেই কাজ শেষ করে দিয়েছি। সামনের দিকের গাড়িগুলোতে ভাঙচুর শুরুর পর পেছনের গাড়িগুলোর আরোহীরা ভয়ে নিজ থেকেই উল্টোপথে চট্টগ্রামমুখী পথ ধরে। গাড়িগুলো চলে যাওয়ার পর আমরা মিছিল করি। এই সময় পুলিশের একটি গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছে। ততক্ষণে কাজ শেষ। ’

বিএনপি নেতারা জানান, ঘটনার পর আহত নেতারা গাড়ি ঘুরিয়ে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে শান্তিরহাটের খাঁ মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানে নেতারা নিজেদের জখম পরীক্ষা করেন। মির্জা ফখরুল ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী হাতে এবং ভাইস চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) রুহুল আলম চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম মাথায় আঘাত পেয়েছেন। স্থানীয় ফার্মেসি থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর তাঁরা ভাঙা গাড়িগুলো নিয়ে চট্টগ্রাম যান।  

মাহবুবুর রহমান শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সকালে ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে বিএনপির প্রতিনিধিদল। মহাসচিব ও আমি ছাড়াও দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. ফাওয়াজ হোসেন শুভ, চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর। সকাল সাড়ে ৮টায় বিমানবন্দর থেকে সড়ক পথে রাঙামাটির উদ্দেশে যাত্রা করি আমরা। প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল রাউজান-ঘাগড়া হয়ে রাঙামাটি যাওয়া হবে। কিন্তু রাঙামাটির সাপছড়ি এলাকায় সড়ক সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হওয়ায় আমরা রুট পরিবর্তন করে রাঙ্গুনিয়া-কাপ্তাই হয়ে নৌপথে রাঙামাটি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। পথে সকাল ১০টার দিকে উপজেলা সদরের ইছাখালী এলাকায় হামলা হয়। আমাদের বহরে ১০টি জিপ ছিল। ’

হামলার পর প্রতিনিধিদলটি রাঙামাটি সফর বাতিল করে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রামে ফিরে যায়। সেখানে মির্জা ফখরুলসহ কেন্দ্রীয় নেতারা চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইছাখালী বাজার পৌঁছার পর ৩০ থেকে ৪০ জন যুবক লোহার রড, লাঠি, হকিস্টিক নিয়ে আমাদের গাড়িতে আক্রমণ করে। আমীর খসরু, রুহুল আলম চৌধুরী, ডা. শুভ ও শামীম আহত হয়েছেন। আমি নিজেও আহত হয়েছি। আমাদের ওপর আঘাত বড় কথা নয়, এ আঘাত মুক্ত চিন্তা ও গণতন্ত্রের ওপর। এ হামলা প্রমাণ করে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়। আমরা রাঙামাটিতে জনসভা করতে যাচ্ছিলাম না, দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে যাচ্ছিলাম। আমাদের ওপর যদি এভাবে হামলা হয় তাহলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা?’

নিরাপত্তা না থাকায় ফিরে এসেছেন জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা রাঙামাটির নেতাদের বিষয়টি জানিয়েছি। দুর্গত মানুষের জন্য যে ত্রাণসামগ্রীর ব্যবস্থা করেছিলাম তা তাঁরা বিতরণ করবেন। ’

সংবাদ সম্মেলনে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রুহুল আলম চৌধুরী, মাহবুবুর রহমান শামীম, ডা. ফাওয়াজ হোসেন শুভ, আবুল হাশেম বক্কর, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হামলার ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। হামলাকারীরা পুলিশের সামনেই মিছিল করে। হামলার ঘণ্টাখানেক পরও হামলাকারীরা ঘটনাস্থলেই ছিল।

রাঙ্গুনিয়া সংসদীয় আসনটি আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের নিজ এলাকা। হামলার ঘটনার পর তিনি দুপুরে ঘটনাস্থলের কাছে লক্ষ্মীরখিল এলাকায় পাহাড়ধস ও পানির ঢলে ভেঙে যাওয়া রাস্তা স্বেচ্ছায় মেরামত কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি হামলার ঘটনাকে অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ভাঙচুরের পর হামলাকারীরা তাত্ক্ষণিক একটি মিছিল করে। মিছিল থেকে জয়বাংলা স্লোগান দেওয়া হয়—এ ধরনের ভিডিও চিত্র টেলিভিশন চ্যানেলে সম্প্রচারিত হওয়ার পর এলাকায় খোঁজ নিয়ে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে হামলায় জড়িতদের মধ্যে কয়েকজনের নাম জানা গেছে। সে অনুযায়ী হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ রাসু। তাঁর সঙ্গে ছিলেন উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠিক সম্পাদক সারেক, স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত পাভেল বড়ুয়া, রাসেল, পৌর ছাত্রলীগের নেতা নঈমুল হুদা, চন্দ্রঘোনা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইকবাল হোসেন বাবলু, উপজেলা যুবলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত সরওয়ার।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় ওষুধের দোকানি পারভেজ হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, ‘আমি দোকানেই বসেছিলাম। হঠাৎ দেখি ১৫-২৫ জন লোক কিছু গাড়ি থামিয়ে দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই তারা হৈচৈ শুরু করে গাড়িগুলো ভাঙচুর শুরু করে। পরে তারা মিছিল নিয়ে চলে যায়। ’ আরেক প্রত্যক্ষদর্শী হাবিব উল্লাহ জানান, ‘কালো রঙের একটি পাজেরো গাড়ির গ্লাস ভাঙা যাচ্ছিল না। হামলাকারীরা কয়েক দফা চেষ্টায় সেটি ভেঙে ফেলে। এ সময় বিকট শব্দ হয়। ’

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ওষুধ ব্যবসায়ী লিটন দে জানান, ‘আমি দোকানের ভেতর ছিলাম। হঠাৎ দেখি কিছু ছেলে এসে কয়েকটি গাড়ির গতিরোধ করে এবং ভাঙচুর শুরু করে। পরে তারা মিছিল করতে করতে চলে যায়। ’

হামলার শিকার চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি আনছুর উদ্দীনের ভাষ্য মতে, বহরে ১০টির মতো পাজেরো, পাঁচটি প্রাইভেট ও মাইক্রোবাস ছিল। আমাদের গাড়িটিই আগে ছিল। মির্জা ফখরুল ও আমীর খসরু মাহমুদ পৃথক গাড়িতে ছিলেন। সব শীর্ষ নেতার গাড়িতেই হামলা হয়। হামলাকারী শুধু ইটপাটকেল নয়, আমাদের গাড়ির টায়ার লক্ষ্য করে গুলিও করেছে। ’ গুলি করলে আপনারা গাড়ি নিয়ে কিভাবে গেলেন—প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রথমে প্রাণরক্ষায় গাড়ি ঘুরিয়ে কিছু সামনে চলে আসি। তখন দেখি গাড়ির চাকার হাওয়া নেই। তখনই বুঝি গুলি করেছে টায়ারে। ’

হামলার শিকার কাপ্তাই উপজেলা চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, ‘উনি (ফখরুল) একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা। তাই তাঁকে এগিয়ে আনতে গিয়েছিলাম। তিনি এলাকায় এলে দুর্গত মানুষ কিছু সহযোগিতা পেত। হামলার কারণে দুর্গত মানুষেরা কিছু পেল না। উল্টো তাঁকে হামলার শিকার হতে হয়েছে। ’

গাড়িবহরে হামলার ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত বলে দাবি করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরতে পারব, সেটা ভাবিনি। জীবনের নিরাপত্তা না থাকায় আমরা রাঙামাটি যেতে পারিনি। আমরা কল্পনাও করতে পারিনি এমন হামলা হবে। দেশের মানুষ এখন অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। এখন সময় এসেছে অধিকার রক্ষার আন্দোলন গড়ে তোলার। দেশের মানুষ মুক্তি চাইলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ’

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ‘আমাদের রাঙামাটি যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক পথে। সেখানে রানীরহাটে সরকারি দলের কর্মীরা জড়ো হচ্ছে জেনে সংঘাত এড়াতে আমরা কাপ্তাই সড়কপথে গাড়ি ঘুরিয়ে দিই। তারপরও তারা হামলা চালিয়েছে। ’

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির গাড়িবহরকে জুতা, পচা ডিম, ঝাড়ু ও কালো পতাকা দেখাতে রাউজানে বৃষ্টির মধ্যেও প্রস্তুত ছিল বিপুলসংখ্যক নারী। বীর রাউজানের সচেতন নাগরিক কমিটির ব্যানারে গতকাল সকাল ৯টা থেকে রাউজান পৌরসভা সদরের মুন্সিরঘাটা এলাকায় উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের নিচে এসব নিয়ে অবস্থান নিয়েছিল তারা। রাউজানের ওপর দিয়ে রাঙামাটিতে যাওয়ার সময় বিএনপি নেতাদের সেগুলো দেখানো হতো। ওই নারীদের হাতে ধরা ব্যানারে লেখা ছিল ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তার নামে রাঙামাটিতে বিএনপির পিকনিক পার্টি বন্ধ করো। ’

রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার ওসি ইমতিয়াজ মো. আহসানুল কাদের ভূঞা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি মহাসচিবের রানীরহাট সড়ক ধরে যাওয়ার কথা ছিল। এ কারণে পুলিশ এই সড়কে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছিল। কিন্তু তিনি গাড়িবহর নিয়ে কাপ্তাই সড়ক ধরে চলে যান। সেখানে পুলিশের প্রস্তুতি ছিল না। এ কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেছে। ’ হামলার ঘটনায় কেউ আটক হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খবর পেয়েই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। কিন্তু কাউকে আটক করা যায়নি। বিএনপির পক্ষ থেকেও কেউ থানায় অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

হামলার সঙ্গে কারা জড়িত তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের এসপি নূরে আলম মিনা। ঘটনার পর পুলিশের মহাপরিদর্শক টেলিফোন করে ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন জানিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আক্রান্ত বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়া হলে কিংবা মামলা করা হলে পুলিশ তা গ্রহণ করবে বলেও জানান তিনি। এসপি বলেন, ‘বিএনপির ভেতরকার কেউ এ কাজ করেছে কি না সেটাও খতিয়ে দেখছি। আবার এর বাইরে কেউ এই কাজ করেছে কি না সেটাও আমরা তদন্ত করে দেখছি। ’

তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ রাসু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ঘটনার সঙ্গে জড়িত না। দূর থেকে দেখেছি অপরিচিত লোকজন ভাঙচুর করছিল। ’

আরেক ছাত্রলীগ নেতা সারেক বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি অন্য জায়গায় ছিলাম। পরে এসে জেনেছি যে হামলা হয়েছে। ’ ঘটনার পর সেখানকার ভিডিও চিত্রে আপনাকে দেখো গেছে—এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি ছিলামই না। কিভাবে দেখা যাবে?’  

‘সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করতেই হামলা’ : বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ অভিযোগ করেছেন, ‘সরকারি দলের সমর্থকরা সশস্ত্র অবস্থায় এ হামলা চালিয়েছে। দুর্গত এলাকায় সরকারের ব্যর্থতা বিরোধী দলের নেতাদের কাছ থেকে আড়াল করার জন্যই বিএনপির টিমের ওপর হামলা করা হয়েছে। এই ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। হামলায় দায়ীদের অবিলম্বে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় জনগণ তার বিচার করবে। ’ গতকাল কুমিল্লা জেলা বিএনপি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন এ প্রতিক্রিয়া জানান তিনি। বাস পোড়ানো মামলায় কুমিল্লায় আদালতে হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন তিনি।

পরে তিনি হামলার প্রতিবাদে সোমবার (আজ) সারা দেশের জেলা সদর, মহানগর এবং ঢাকা মহানগরের প্রতিটি থানায় বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

দলের মহাসচিবের গাড়িবহরে হামলার প্রতিবাদে গতকাল ঢাকায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপি। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেলের নেতৃত্বে মিছিলে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের ভুইয়া জুয়েল, যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি মোরতাজুল করিম বাদরুসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেয়।  

‘ঘটনা নিজেরা তৈরি করেছে কি না তা এখন জনমনে প্রশ্ন’ : রাঙ্গুনিয়ার আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘এই ঘটনা নিজেরা (বিএনপি) তৈরি করেছে কি না তা এখন জনমনে প্রশ্ন। তারা কি আসলে ত্রাণ দিতে যাচ্ছিল, নাকি নিজেরা ঘটনা ঘটিয়ে সংবাদ তৈরি করেছে?’ বিএনপির গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আমি যেটা শুনেছি, তা হলো তাঁরা (বিএনপি নেতারা) রাঙ্গুনিয়ার ইছাখালীর ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁদের গাড়ির ধাক্কায় স্থানীয় দুজন মানুষ আহত হয়েছেন। আহত দুজন এখন স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। তারপর উত্তেজিত সাধারণ জনতা যে ঘটনাটি ঘটিয়েছে তা অনভিপ্রেত। এই ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কেউ জড়িত নয়। উনারা দুর্যোগের ছয় দিন পর এলেন, যখন উদ্ধার ও ত্রাণ তত্পরতা শেষ। এর পরও অনভিপ্রেত ঘটনার পর পুলিশ তাদের বলেছে, পুলিশ প্রহরা দিয়ে রাঙামাটি পৌঁছে দেবে। কিন্তু বিএনপি নেতারা ত্রাণ দিতে রাঙামাটি না গিয়ে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে গিয়ে নানা অভিযোগ তুলেছেন। এখন জনগণের প্রশ্ন, তাঁরা কি ত্রাণ দিতে এসেছিলেন, নাকি খবর সৃষ্টি করতে এসেছিলেন?’

(প্রতিবেদনে আরো তথ্য দিয়েছেন কুমিল্লার নিজস্ব প্রতিবেদক ও রাউজান প্রতিনিধ


মন্তব্য